শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ৮:২৬ পিএম

অবৈধ বাধের জন্য ধ্বংস হচ্ছে প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন সৃষ্টি হচ্ছে কৃত্রিম জলাবদ্ধতা

নূরুজ্জামান সরকার নীহার বকুল:
প্রকাশিত: ৬:৫১ অপরাহ্ন, ১৩ জুন ২০২০, শনিবার


ময়মনসিংহ জেলার তারাকান্দা উপজেলার কামারগাঁও ইউনিয়নের নাকিজানি গ্রামের পাশে দিয়ে একেবেঁকে যে নদীটি বেয়ে চলেছে অনাধিকাল হতে তার নাম গজারিয়া।এক সময়ের খর  স্রোত প্রমত্তা এ নদীটি আজ মানুষ্যরূপী নদীখেকু কিছু মানবের লালসার স্বীকার হয়ে আজ মৃতপ্রায়। অল্প দূরত্বে বেশ ক’টি বাধ দিয়ে যেমনি ফসলের মাঠের ক্ষতি করছে তদ্রুপ নদীর সকল প্রকার পোনা ও ডিমওয়ালা মাছ রাক্ষুসে জাল ও অবৈধ কারেন্টজাল পেতে মেরে ধ্বংস করে দিচ্ছে।
এলাকার কিছু প্রভাবশালী লোকের জন্য হারিয়ে যেতে বসেছে প্রকৃতির দেওয়া এ মৎস্য আধাঁরটি। তাদের বিরুদ্ধে মুখ খুলে কেউ কিছু বলতে পারে না। অসহায় হয়ে দেখা ছাড়া আর কোন গত্যান্তর নেই বলে জানান। গজারিয়া নদীর উপর বাঁধ সৃষ্টি করে বর্তমানে মাছের প্রজনন নষ্ট করছে এবং এ কারণেই নদীর আশে পাশের নিচু ফসলের জমি পানির নিচে জলাবদ্ধতায় পরে বিনষ্ট হচ্ছে। এ বাঁধের কারণে নদীর তীর ভেঙ্গে আজ বসতভিটা হারিয়েছে অনেকেই। ফি-বছরে ফসলের ভীষণ ক্ষতি হচ্ছে যা কয়েক লক্ষ টাকার উপরে। গ্রামের বেশ ক’জন মুরুব্বীদের সাথে কথা বলে জানা যায় যে, আগে এ নদীতে ৫০ প্রজাতির মৎস্য এলাকাবাসী ও জেলেরা আহরণ করে নিজেরা খেতো অতিরিক্ত মাছ তারাকান্দা, ভেরুয়া, হুগলা, রাজদারিকেল, চংনাপাড়া, চাড়িয়াসহ বাড়িতে বাড়িতে বিক্রী করে রোজগার করে সংসারের খরচ মিটাতো কৈবর্ত শ্রেণীর লোকজন। এখন মাছ না পাওয়ায় এবং নদীতে বাঁধ দিয়ে তা বেদখল হয়ে যাওয়ার কারণে অনেকেই পেশা বদলাতে বাধ্য হয়েছে। বাঁধের কারণে সামান্য বৃষ্টিতে দু’কূল উপচে পড়ে বিস্তর ফসলের মাঠ তলিয়ে যায়,যার কারণে অনাবাদী থাকে যাচ্ছে কয়েকশ হেক্টর জমি।
গোপনে প্রতিবেদকের সাথে নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক বেশকিছু মানুষ অভিযোগ করেন যে এলাকার বেশ ক’জন ধনিক শ্রেণীর মানুষের দ্ধারা এ অপকর্মগুলো হচ্ছে।যারা এ কাজের সাথে জড়িত তারা হল আহাদুল ইসলাম সাং রাজদারিকেল, আলাল উদ্দিন,তুরাফ আলী, আশ্রব আলী, হেলাল উদ্দিন সর্বসাং ক্ষুদ্র নাকিজানি, আর সুরুজ আলী, রফিকুল ইসলাম, আতিকুল ইসলাম, আশরাফ মীর সাং ভেরুয়া।
অভিযুক্তদের দুএকজনের সাথে কথা বললে তারা বলেন, পৈতৃকসূত্রেই যুগ যুগ ধরে নদীতে তাদের দখল আছে। তাদের বিরোদ্ধে আনিত এই অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেন।বাঁধ দেওয়ার ব্যাপারে ও রাক্ষুসে জালের ব্যাপারে জানতে চাইলে কোন কথা বলেনি। বাঁধের কারণে বিস্তীর্ণ ফসলের জমিতে আজ কৃষক কোন কিছুই করতে পারছে না।তাদের বিরুদ্ধে এলাকায় কেউ কোন কিছু বলতে সাহস পায় না। তাতে নাকি প্রাণনাশের সম্ভবনা আছে। এ বিষয়ে সবাই উপজেলা নির্বাহী অফিসার, এসিল্যান্ড ও উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তাকে সরে জমিনে পরিদর্শন করে আশু ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন।
উল্লেখ্য যে,সাবেক ৫ বারের এমপি ১ বারের উপজেলা চেয়ারম্যান ভাষাসৈনিক শামছুল হক সাহেব একবার রাজধারিকেল বাজারে নির্বাচনী জনসভায় যোগ দিতে যাওয়ার সময় ফেরিঘাটে ওনার গাড়িটি গজারিয়া নদীতে পড়ে ডুবে যায়, এলাকাবাসী দড়ি, কাড়া ও বাঁশ এনে তা উদ্ধার করেন সারারাতের চেষ্টায়, পরে এলাকাবাসীর দাবীর প্রেক্ষিতে হক সাহেব গজারিয়া ব্রিজটি করে দেন। সেই সাথে এই নদীটি সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেন। স্মৃতি হাতরে কথা গুলো বলেছিল একজন বৃদ্ধ। তিনি আক্ষেপ করে বলেন “উজ্জিয়ার সময় নদী ও আশপাশের ক্ষেত হতে কত মাছ মারতাম,মাছের ডিমের পিটা খাইতাম আর অহন কি জাল নামলো মাছ তো দুরের কথা বানওয়ালারা ছাড়া বাহি মাইনসে কানপনাও খাইতে পারে না।
এবিষয়ে এলাকার আপামর জনসাধারণ ১৪৭, ময়মনসিংহ-২ (ফুলপুর-তারাকান্দা) সাংসদ মাননীয় গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ, উপজেলা চেয়ারম্যান এডভোকেট ফজলুল হক, ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলামসহ উপজেলা প্রশাসনের কাছে নদীর জায়গা দখলমুক্ত করা, অবৈধ বাঁধ অপসারণ করে স্বাভাবিক গতি ফিরিয়ে আনা,দু’টি তীরের সীমানা উদ্ধারকরে বাঁধ নির্মাণ করে বন্যা ও জলাবদ্ধতা নিরশন,নদীর ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে শুকনো মৌসুমে প্রবাহ ঠিক রাখতে খনন করে পানি সংরক্ষণের জোর দাবি জানান।
রামচন্দ্রপুরের বিশিষ্ট ব্যাক্তি সাবেক ব্যাংকার, আব্দুল ওয়াহেদ প্রধান বলেন,”সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবনের জমানায় কিংবা তারো আগে গজারিয়ায় মহাজনী নৌকা, পানশিনাও রঙ বেরঙের পাল তোলে চলাচল করতো। কামরুপরাজ্যের অন্তরগত ব্রহ্মপুত্র নদের উত্তরে বড় যে দু’টি বাজার ছিল তার মধ্যে কোদালধর বাজার একটি। যাহা গজারিয়া নদীর তীরে বর্তমান। এবাজারে খরগোশ থেকে হাতী পর্যন্ত ক্রয়বিক্রয় হতো। এই বাজারে মহাজনী গদীসহ বাঈজীখানা পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল বলে মুরুব্বীদের কাছে শুনেছি। রেভিনিও মহাফেজ খানায় খুঁজ নিলে হয়ত এর সততা মিলতে পারে।শুধু এই গজারিয়া নদীটি প্রকৃতিগত ও মনুষ্যসৃষ্ট কারনে এরই মাঝে হারিয়ে যেতে বসেছে আর কোদালধর বাজারের ঐতিহাসিক ঐতিহ্যও শেষ হতে চললো।
রুহুল আমিন নামে সচেতন নাগরিক সমাজের একজন বলেন,”নদীর আড়াআড়ি বাঁধ দিয়ে মাছ চলাচল ও প্রজননের ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। ধলাই, কংশ, নেতাই এরকম আরও অনেক নদী থেকে গজারিয়া হয়ে মাছ এসে কালিয়ান রাংসা এবং নানান জলাশয়ে আশ্রয় নেয়। কিন্তু গজারিয়ার এই বাঁধ দেওয়ার ফলে মাছ চলাচল করতে পারে না। আজ পানিতে নদী থৈথৈ করছে কিন্তু মাছ নেই। অথচ এসময়ে প্রচুর ছোট বড় মাছের সমারোহ থাকার কথা। একটি জনগুরুত্বপূর্ণ পোস্ট করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

মন্তব্য করুন

সর্বশেষ নিউজ

আরো পড়ুন