সোমবার, ৬ জুলাই ২০২০, ৫:১৫ এএম

শ্রমিক পাঠানোর আড়ালে মানবপাচার করতেন হাজী কামাল

নিজস্ব প্রতিবেদক:
প্রকাশিত: ১০:০৪ অপরাহ্ন, ১ জুন ২০২০, সোমবার


শ্রমিক পাঠানোর আড়ালে মানবপাচার করতেন হাজী কামাল

ছবি : সংগৃহীত

টাইলস শ্রমিক পাঠানোর আড়ালে মানবপাচার করতেন কামাল উদ্দিন ওরফে হাজী কামাল (৫৫)। গত ১০ বছর ধরে তিনি অবৈধভাবে মানবপাচার করে আসছেন। এ পর্যন্ত ৪শ বাংলাদেশি নাগরিককে লিবিয়ায় পাচার করেছেন তিনি। টাইলসের শ্রমিকের অধিক চাহিদা আর দিনে ৫/৬ হাজার করে টাকা আয়ের প্রলোভন দেখিয়ে মানবপাচার করতেন হাজী কামাল।

কৌশল হিসাবে লিবিয়াতে যাওয়ার আগে মাত্র এক লাখ টাকা নিতেন। লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে নিতেন বাকি ৪ লাখ টাকা। টাকা না দিলে লিবিয়ায় শ্রমিকদের নির্যাতন করে সেই রেকর্ড শোনাতেন পরিবারের সদস্যদের।

লিবিয়ার মিজদাহ শহরে গত ২৮ মে নৃশংসভাবে ২৬ বাংলাদেশিকে হত্যার ঘটনায় সোমবার (১ জুন) ভোরে গুলশানের শাহজাদপুর থেকে হাজী কামালকে গ্রেফতার করে র‌্যাব-৩। সোমবার দুপুরে রাজধানীর টিকাটুলি র‌্যাব-৩ কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান অধিনায়ক (সিও) লে. কর্নেল রকিবুল হাসান।

তিনি বলেন, লিবিয়াতে ২৬ বাংলাদেশি নাগরিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় র‌্যাব-৩ ছায়া তদন্ত শুরু করে। এই ঘটনার রহস্য উদঘাটন করতে গিয়ে হাজী কামালের নাম আসে। পরে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করা হয়। লিবিয়ায় হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মাদারীপুর রাজৈর থানা ও কিশোরগঞ্জের ভৈরব থানায় দুটি মানবপাচার বিরোধী আইনে মামলা হয়েছে। তাকে রিমান্ডে নিয়ে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

র‌্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, অবৈধভাবে ইউরোপে যাওয়ার জন্য বিভিন্ন দালাল চক্র ইউরোপে উন্নত জীবনের মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে প্রতিনিয়ত অসহায় বাংলাদেশিদের অবৈধভাবে নৌ-পথ এবং দুর্গম মরুপথ দিয়ে পাচার করছে। এই অবৈধ অভিবাসীদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে নির্যাতন ও জিম্মি করে মুক্তিপণও আদায় করা হচ্ছে।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, হাজী কামাল মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে বিদেশে কর্মসংস্থানের প্রলোভন দেখিয়ে দীর্ঘ প্রায় ১০ বছর ধরে এই অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তারা বিদেশি চক্রের যোগসাজশে অবৈধভাবে বাংলাদেশি নাগরিকদের বিভিন্ন দেশে পাঠায়। চক্রটি তিন ধাপে এই কাজ করতো।

প্রথমে বিদেশ গমনেচ্ছুদের নির্বাচন করতো। চক্রের দেশীয় এজেন্টরা বিভিন্ন এলাকার স্বল্প আয়ের মানুষকে উন্নত দেশে অনেক টাকা আয়ের লোভ দেখাত। তারপর তাদের পাসপোর্ট, ভিসা সংগ্রহের নামে এক লাখ টাকা নিত। বাকি টাকা ইউরোপে গিয়ে পরিশোধ করতে হবে বলে জানাতো। একারণে সাধারণ মানুষ তাদের ফাঁদে সহজেই পা দিতো। লিবিয়ায় নিয়ে শ্রমিকদের ওপর শুরু হতো নির্যাতন। নির্যাতনের রেকর্ড শুনিয়ে পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে আদায় করা হতো আরও টাকা। যারা টাকা দিতে পারতো তাদের অবৈধভাবে বিভিন্ন রুটে ইউরোপে পাঠানোর চেষ্টা করতো চক্রটি।

র‌্যাব সূত্র জানায়, প্রথম ধাপে লিবিয়ায় পাঠানোর ক্ষেত্রে তারা ঢাকা থেকে কোলকাতা বা মুম্বাই হয়ে দুবাই নিয়ে যেত। সেখান থেকে মিশর হয়ে লিবিয়াতে নিয়ে যেত। দুবাইয়ে গিয়ে চক্রের বিদেশি সদস্যদের মাধ্যমে ৭-৮ দিন নিজেদের হেফাজতে রেখে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে লিবিয়াতে পাঠায়। ভিকটিমরা লিবিয়াতে পৌঁছানোর পর সেখানে অবস্থানরত চক্রের সদস্যরা তাদের নিজেদের হেফাজতে নেয়। লিবিয়াতে আটকে রেখে স্বজনদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা হয়।

র‌্যাব কর্মকর্তারা বলেন, লিবিয়া থেকে চক্রের সদস্যরা ইউরোপে পাচারের উদ্দেশে তাদের আরেকটি গ্রুপের কাছে হস্তান্তর করে। ওই চক্রের সদস্যরা সমুদ্রপথে অতিক্রম করার জন্য নৌ-যান চালনা এবং দিক নির্ণয়যন্ত্র পরিচালনাসহ নানা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়। তারপর একসঙ্গে একাধিক নৌযান লিবিয়া থেকে তিউনিশিয়া উপকূলীয় চ্যানেল হয়ে ইউরোপের পথে রওনা দেয়। এভাবে ঝুঁকিপূর্ণ পথে ইউরোপ যেতে গিয়ে ভূমধ্যসাগরের মাঝে মধ্যেই দুর্ঘটনার শিকার হয়ে শ্রমিকরা মারা যায়।

র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, গ্রেফতারকৃত কামাল এই চক্রের মূল হোতা। লিবিয়া ছাড়াও সে মধ্যপ্রাচের বিভিন্ন দেশে অবৈধভাবে মানবপাচার করে আসছিল। তিনি নিজে পেশায় একজন টাইলস ব্যবসায়ী। তার বাড়ি কুষ্টিয়া জেলা সদরে।

মন্তব্য করুন

সর্বশেষ নিউজ

আরো পড়ুন