সোমবার, ৬ জুলাই ২০২০, ৪:৩৬ এএম

সর্বগ্রাসী মেম্বারের কবলে ময়মনসিংহের অসহায় মানুষ

প্রতিদিনের কাগজ ডেস্ক:
প্রকাশিত: ১১:৪৭ অপরাহ্ন, ৩০ মে ২০২০, শনিবার


সর্বগ্রাসী মেম্বারের কবলে ময়মনসিংহের অসহায় মানুষ

ছবি : সংগৃহীত ।

নিজের এক টুকরা ভিটের মধ্যে ভাঙা একটি ঘর। বৃষ্টি আইলে ঝরঝর আইয়া পানি পড়ে। জোরে বাতাস আইলে ওপরওয়ালার নাম নেই। একদিকে বেড়া থাকলেও আরেক দিকে নাই। এইভাবেই দিন পার করছি। পরে মেম্বার কইছে সরকারিভাবে ঘর বানাইয়া দিবো। এর লাইগ্যা কিছু টেহা লাগবো। এই আনন্দে প্রথমে পাঁচ হাজার ও পরে আরও দশ হাজার টেহা দেই। কয়েক মাস পর মেম্বর বাড়িত আইয়া কয় ঘর তো অইছে অহন মালামাল আনতে আরও পাঁচ হাজার লাগবো। এই অবস্থায় যার কাছ থেকে সুদে ১৫ হাজার আনছি হের কাছ থাইক্যা আরও পাঁচ হাজার আইনা দিছি। কিন্তু দুই বছর গেলেও ঘর নাই। উল্ডা সুদের আনা টেহার লাভ দিতে পারছি না দেইখ্যা হেই টেহা নাহি লাখ টেহা অইছে। অহন ঘর দিয়া কি অইবো। আমার ভিডাডাই (ভিটা) তো হে (সুদখোর) নিবোগা। আমি অহন কি করবাম-বিচার না পাইলে মইর‌্যা যাইয়াম।

সরকারি ঘর পাওয়ার আশায় ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার রজিবপুর ইউনিয়নের ৮ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. রইছ উদ্দিনকে টাকা দিয়ে দুই বছরেও কোনো সুবিধা না পেয়ে এভাবেই বিল খেরুয়া গ্রামের মো. কাশেমের স্ত্রী মোছাম্মৎ বেগম (৪০) কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। তাঁর মতো আরও শতশত লোকজন বিভিন্ন সরকারি সুবিধা পেতে টাকা দিয়েও দীর্ঘ দিনেও না পেয়ে টাকা উদ্ধার ও ইউপি সদস্যের বিচারের দাবি করে বিক্ষোভ করেন।

গতকাল শনিবার বেলা ১২টার দিকে আট নম্বর ওয়ার্ডের একটি চালকলের চাতালে জড়ো হন তিনটি গ্রামের নানা পেশার প্রায় শতাধিক মানুষ। গ্রাম তিনটি হচ্ছে রামগোবিন্দপুর, রাধাবল্লভপুর ও হরিপুর। এদের একজন আছিয়া (৫৫) হচ্ছেন হরিপুর গ্রামের আবদুল জলিলের স্ত্রী। আছিয়া জানান, রইছ উদ্দিন ইউপি সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর স্বামীর জন্য একটি বয়স্ক ভাতার কার্ড করে দেওয়ার জন্য ৩১০০ টাকা দেন। পরে প্রতিবন্ধী নাতনি খাদিজার জন্য প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ড করার জন্য দেন ৩৫০০ টাকা। প্রতিবার টাকা নেওয়ার সময় রইছ উদ্দিন মুঠোফোন দিয়ে একজনের সাথে কথা বলিয়ে দিতেন। কথা বলার সময় পরিচয় জানতে চাইলে ফোনের অপর প্রান্তের ব্যক্তি বড় কর্মকর্তা বলে পরিচয় দিতেন। কিন্তু সরকারি সুবিধার কোনো কার্ড দিতে পারেননি মেম্বার। সরকারি ঘর বরাদ্দ দেওয়ার কথা বলে তৃতীয়বার তাঁর কাছ থেকে ২০০০ হাজার টাকা, জমির দলিল ও জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি নেন। কিন্তু ঘরও পাননি। শেষে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির কার্ড তাঁর বাড়ি থেকে আনার সময় মেম্বার ৬০০ টাকা নিয়েছেন। ওই কার্ড দিয়ে দুই বার চাল কিনতে পেরেছেন। পরে সেই কার্ড জমা নিয়ে নেন মেম্বার।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর ২৫০০ টাকা সহায়তা পাবার ব্যবস্থা করার কথা বলে ৩০০ টাকা নেন মেম্বার। আছিয়া বলেন, সমূদয় টাকা অন্যের কাছ থেকে সুদে দাদণ এনে মেম্বারে হাতে তুলে দিয়েছেন। এখন তাঁর মেয়েরা পোশাক কারখানায় চাকুরি করে সুদ পরিশোধ করছে।

রামগোবিন্দপুর গ্রামের লিয়াকত আলীর স্ত্রী শেফালি বেগম বলেন, তিনি এই গ্রামের মেয়ে। তাঁর বিয়ে হয়েছে ভাটি চরনওপাড়া গ্রামে। কয়েকমাস আগে অসুস্থভাইকে দেখার জন্য বাবার বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলাম। রইছ উদ্দিন মেম্বার তখন তাঁর অসুস্থ ভাইয়ের জন্য একটি সরকারি ঘরের ব্যবস্থা করার কথা বলে একাধিক কিস্তিতে ৪০ হাজার টাকা নেন। ঘরের ব্যবস্থা করে দিতে পারেননি। ২০ হাজার টাকা ফেরত দিলেও বাকি টাকা এখনও ফেরত দেননি।

চালকল শ্রমিক ওমর ফারুক (২২) অভিযোগ করে বলেন, সরকারি ঘর দেওয়ার কথা বলে ওই মেম্বার তাঁর কাছ থেকে ৬০০০ টাকা নিয়েছিলেন। টাকা দেওয়ার কয়েকদিন পর তাঁর বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন তিনি টাকা ফেরত চেয়েও পাননি। বাবা আবদুল কদ্দুছ মারা যান। কিছুদিন পর তাঁর দাদী সমলা খাতুনও মারা যান। সমলার বয়স্ক ভাতার কার্ডটি ফেরত নিয়ে যান মেম্বার। অথছ নিয়ম অনুযায়ী কার্ডের শেষ তিন মাসের ভাতা সমলার পরিবারের পাবার কথা। ওমর ফারুক বলেন, কয়েকদিনের ব্যবধানে আমার বাবা ও দাদী মারা যান। কিন্তু মেম্বার আমার টাকাগুলো ফেরত দেননি।

এসব তথ্য যখন এ প্রতিবেদক টুকে নিচ্ছিলেন তখন অসংখ্য মানুষ তাঁদের অভিযোগ তুলে ধরার জন্য লাইন ধরে অপেক্ষা করছিলেন। কয়েকজন গ্রামবাসী বলেন সামাজিক নিরাপত্তা খাতের ভাতা, সরকারি ঘর ও নলকুপ বরাদ্দ, প্রতিবন্ধী ভাতা, দুস্থমাতার (ভিজিডি) ইত্যাদি সরকারি সুবিধা প্রদান করছে সরকার। এ কজন ইউপি সদস্যের কাজ হচ্ছে সঠিক ব্যক্তির নাম তালিকাভুক্ত করে ইউনিয়ন পরিষদে জমা দেওয়া। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে রইছ উদ্দিন মানুষের কাছ থেকে অনেক টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এতদিন একজনের কথা আরেকজন জানতে পারেননি। এখন আলাপ করে একে অপরের কথা বলে মেম্বারের প্রতারণার কথা জানতে পেরেছেন।

এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য বাড়িতে গিয়ে ইউপি সদস্য রইছ উদ্দিনকে পাওয়া যায়নি। পরে জানা যায় তিনি এলাকায় নেই। মোবাইল ফোন সংগ্রহ করে জানতে চাইলে তাঁর বিরুদ্ধে আনা সকল ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, যারা তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে সবাই তার বিরুদ্ধে নির্বাচন করেছে। এখন মিথ্যা অপবাদ দিয়ে সামনে নির্বাচনে পারজিত করার চেষ্টা করছে। এক পর্যায়ে তিনি বলেন,আপনার সাথে দেখা করবোনে।

এ বিষয়ে রাজীবপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. মোদাব্বিরুল ইসলাম বলেন, এ বিষয়টি তাঁকে কেউ জানায়নি।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জাকির হোসেন বলেন, এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ দিলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সুত্র : কালের কণ্ঠ ।

মন্তব্য করুন

সর্বশেষ নিউজ

আরো পড়ুন