বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২০, ১:১৪ এএম

গণপরিবহনে সামাজিক দূরত্ব মানাই কঠিন চ্যালেঞ্জ

প্রতিদিনের কাগজ ডেস্ক:
প্রকাশিত: ৭:৫৬ পূর্বাহ্ন, ৩০ মে ২০২০, শনিবার


গণপরিবহনে সামাজিক দূরত্ব মানাই কঠিন চ্যালেঞ্জ

ছবি : কালের কণ্ঠ ।

রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশনে গতকাল শুক্রবার সকাল থেকে দিনভর টিকিট কাউন্টারের সামনে তিন ফুট দূরে দূরে লাল বর্গাকার চিহ্ন দেওয়া হচ্ছিল। কমলাপুর, মালিবাগ বা মিরপুরের সড়কগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সারি সারি বাসে ধুলাবালি জমে থাকতে দেখা গেল। সায়েদাবাদ, মহাখালী বা গাবতলী বাস টার্মিনালে দেখা গেল বাস শ্রমিকদের মন বেজায় ভারি।

টানা প্রায় দুই মাস যাত্রীবাহী পরিবহনের চাকা বন্ধ ছিল। আগামীকাল রবিবার থেকে সীমিত পরিসরে গণপরিবহন চালুর প্রস্তুতি চলছে। এর মধ্যে লঞ্চ ও ট্রেন চলবে রবিবার থেকে। আর বাস সোমবার থেকে। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে তিন পরিবহনেই অর্ধেক যাত্রী তোলা হবে। এ ছাড়া অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে গণপরিবহন পরিচালনা করাই বড় চ্যালেঞ্জ। সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ প্রণয়ন করার পরও সরকার সড়কে তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। পরিবহন খাতের শীর্ষ নেতাদের বড় অংশই সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় বাধা তৈরি করে আসছে। স্বাভাবিক সময়েই অতিরিক্ত যাত্রী পরিববহন করে শ্রমিকরা মালিককে নির্ধারিত আয় তুলে দেন। এ অবস্থায় রাস্তায় বাস নামালে তাঁরা যে অতিরিক্ত যাত্রী তুলবেন না তার নিশ্চয়তা কে দেবে?

ঢাকা-বগুড়া রুটের একতা পরিবহনের সুপারভাইজার মো. সেলিম বললেন, আন্ত জেলা বাস চালানো হলে অর্ধেক যাত্রী নিলে পোষাবে না। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখলে আয় অর্ধেক কমে যাবে। বাস চালিয়ে তেলের খরচই উঠবে না বলে জানালেন নগর পরিবহনের মালিক-শ্রমিকরা।

এ অবস্থায় গতকাল বিকেলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত এসংক্রান্ত বৈঠকে বাস মালিক নেতারা ভাড়া ১০০ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করেছেন। এ নিয়ে আজ শনিবার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হতে পারে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্ল্যাহ গত রাতে বলেন, আজকের (শুক্রবার) বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে যে সোমবার থেকে আন্ত জেলা ও নগর বাস চালু হবে।

এক জেলা থেকে আরেক জেলায় বাস চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও কিভাবে দূরপাল্লার বাস চলবে সে ব্যাপারে বৈঠকে উপস্থিত পরিবহন শ্রমিকদের প্রতিনিধি ওসমান আলী বলেন, এ বিষয়ে সবাই একমত হন যে দূরপাল্লার বাসগুলো পথে কোথাও যাত্রী তুলবে না। তবে কেউ নামতে চাইলে নামানো হবে।

স্বাস্থ্যবিধি মেনে ও শারীরিক দূরত্ব নিশ্চিত করে লঞ্চ পরিচালনার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডাব্লিউটিএ) থেকে। লঞ্চভাড়া বাড়ানোর বিষয়ে একটি কমিটি করা হবে বলে জানিয়েছে বিআইডাব্লিউটিএ।

জানা গেছে, রবিবার থেকে লঞ্চ চালানো হবে। বন্দরে যাত্রীদের জন্য ‘জীবাণুনাশক টানেল’ বসানো হবে। লঞ্চে ওঠার সময় যাত্রীদের তাপমাত্রা পরীক্ষা করা হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক লঞ্চ মালিক কালের কণ্ঠকে বলেন, বিধি অনুযায়ী যাত্রী পরিবহন করলে যাত্রী এক-তৃতীয়াংশে নেমে যাবে। তাতে লঞ্চের তেলের খরচ উঠবে না। সে ক্ষেত্রে তাঁরা লঞ্চের ভাড়া বাড়াতে চান। তিনি বলেন, কয়েক দিন চালানোর পর তাঁরা খরচ ও আয়ের বিষয়টি দেখে কী পরিমাণ ভাড়া বাড়ানো দরকার সেটা কমিটির সঙ্গে আলোচনা করবেন। বাংলাদেশ রেলওয়ে সীমিতভাবে ট্রেন পরিচালনা করবে যাত্রীদের মধ্যে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করার জন্য। এ জন্য ৫০ শতাংশ আসন ফাঁকা রেখে ট্রেনগুলো পরিচালনা করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. শামছুজ্জামান বলেন, ‘সীমিতভাবে শুধু আন্ত নগর ট্রেন পরিচালনা করা হবে। আজ শনিবার এ নিয়ে বৈঠক করব। তবে তাপানুকূল কোচ ট্রেনে রাখা হবে না। প্রতিটি ট্রেনের ৫০ শতাংশ টিকিট বিক্রি করা হবে।’

ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশনের ব্যবস্থাপক আমিনুল ইসলাম জুয়েল জানান, শনিবার থেকে টিকিট বিক্রির প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ঢাকা থেকে ৩১ মে আটটি ও ৩ জুন থেকে ১২টি আন্ত নগর ট্রেন পরিচালনার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

জানা গেছে, রবিবার থেকে প্রথম ধাপে ঢাকা-রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ রুটের বিরতিহীন আন্ত নগর বনলতা এক্সপ্রেস, ঢাকা-লালমনিরহাট রুটের লালমনি এক্সপ্রেস ও ঢাকা-খুলনা রুটের চিত্রা এক্সপ্রেস পরিচালনা শুরু হবে। ৩ জুন থেকে রাজশাহী-গোয়ালন্দঘাট রুটের মধুমতী এক্সপ্রেস, রাজশাহী-খুলনা রুটের কপোতাক্ষ এক্সপ্রেস, খুলনা-চিলাহাটি রুটের রূপসা, ঢাকা-চিলাহাটি রুটের নীলসাগর, ঢাকা-বেনাপোল রুটের বেনাপোল এক্সপ্রেস পরিচালনার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. শামছুজ্জামান বলেন, আগামী ১৫ জুন পর্যন্ত সীমিত আকারে ট্রেন পরিচালনা করা হবে। এরপর অভিজ্ঞতা অর্জন করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

জানা গেছে, সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন রেলস্টেশনে অস্থায়ী কোয়ারেন্টিন কক্ষ খোলা ও যাত্রীদের তাপমাত্রা পরীক্ষার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। রেলস্টেশনের প্রবেশদ্বার থেকে আসা যাত্রীদের তাপমাত্রা পরীক্ষার পরে যেসব যাত্রীর শরীরের তাপমাত্রা ৩৭.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে থাকবে তাদের অস্থায়ী কোয়ারেন্টিনে রাখা হবে। এরই মধ্যে রাজশাহী রেলস্টেশনের প্রবেশমুখ ও বহির্গমনপথে বসানো হয়েছে ‘জীবাণুমুক্তকরণ চেম্বার’। তবে রেলস্টেশনে সামাজিক দূরত্ব মানা নিশ্চিত করতে ব্যবস্থাপনা কী হবে এ নিয়ে চিন্তিত অনেকে। অভিজ্ঞ রেল কর্মকর্তারা বলছেন, বিভিন্ন রেলস্টেশনে যাত্রী সমাগম ঠেকানোই বড় চ্যালেঞ্জ।

আগামীকাল থেকে সীমিতভাবে সরকারি ও বেসরকারি দপ্তরগুলো খোলা হচ্ছে। সেই সঙ্গে যাত্রী পরিবহনের জন্য সীমিতভাবে বাস, ট্রেন ছাড়াও লঞ্চ চলাচল শুরু হবে। সব খোলার সঙ্গে তাল রেখে খুলবে পুঁজিবাজারও। বেশির ভাগ ব্যাংকে শুরু হবে স্বাভাবিক ব্যাংক সেবা। সোমবার থেকে অভ্যন্তরীণ তিনটি রুটে উড়বে উড়োজাহাজ। করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে সব বন্ধ রাখা হয়েছিল দফায় দফায় সরকারি আদেশে। তবে অর্থনীতি সচল রাখতে এবার সব খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সব যখন খুলছে তখন সামাজিক দূরত্ব মেনে গণপরিবহন পরিচালনার চ্যালেঞ্জটিই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে সরকারের সামনে। রবিবার থেকে আগামী ১৫ জুন পর্যন্ত গণপরিবহন কিভাবে পরিচালনা করা হবে সে বিষয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, রেলপথ মন্ত্রণালয়, নৌ মন্ত্রণালয়, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় নির্দেশনা জারি করবে।

এদিকে হাতিরঝিলে ওয়াটার ট্যাক্সি চলাচলেও প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। গতকাল সকালে গুলশানসংলগ্ন গুদারাঘাটে ধোয়ামোছার কাজ চলছিল। টিকিট কাউন্টার ধোয়ামোছার কাজ শেষ হয়েছে। হাতিরঝিলে ১৫টি ওয়াটার ট্যাক্সি চলাচল করত সকাল ৬টা থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত। গণপরিবহন চালুর সঙ্গে সঙ্গে ওয়াটার ট্যাক্সিও চালু হবে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. সামছুল হক বলেন, ‘নির্দেশনার পর নির্দেশনা আসছে। তবে সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য তদারকি থাকতে হবে। আইন না মানলে অভিযান চালানোর ব্যবস্থাও থাকতে হবে। সামাজিক দূরত্ব গণপরিবহনে মানা সবচেয়ে কঠিন, বিশেষ করে ঢাকা মহানগরীতে।’

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এ আই মাহবুব উদ্দিন আহমেদ, ভাইস চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া ও নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, করোনা পরিস্থিতির অবনতি সত্ত্বেও সরকার জনজীবন ও অর্থনীতি সচল রাখার প্রয়োজনে অফিস-আদালত খোলার এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত আকারে গণপরিবহন চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু গণপরিবহন সীমিত আকারে চালু করার বিষয়টি কিভাবে কার্যকর হবে, তা পরিষ্কার নয়। সরকারের এই সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা থাকলেও এটা বাস্তবায়ন করা বিরাট চ্যালেঞ্জ। তাঁরা বলছেন, দীর্ঘ সাধারণ ছুটি শেষে বহুসংখ্যক মানুষ জীবনের তাগিদে একসঙ্গে রাস্তায় নামবে। এ অবস্থায় সড়কে গণপরিবহনের স্বল্পতা থাকলে মানুষ হুড়াহুড়ি-গাদাগাদি করে গাড়িতে উঠবে, ওঠার চেষ্ট করবে। এতে করে স্বাস্থ্যবিধি বলে কিছু থাকবে না।

করোনা মহামারির এই দুর্যোগে গণপরিবহন বিশেষ করে বাস-লঞ্চের ভাড়া বৃদ্ধি না করে জ্বালানি তেলের দাম কমানো ও পরিবহনে চাঁদাবাজি বন্ধের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। সংগঠনের মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘দীর্ঘ লকডাউনের কারণে কর্ম হারিয়ে নিদারুণ আর্থিক সংকটে থাকা জনগণের ওপর বর্ধিত ভাড়া চাপিয়ে দেওয়া হলে সেটা হবে মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা।’

সড়ক পরিবহনে ১২ নির্দেশনা : গতকাল গণপরিবহন পরিচালনা সংক্রান্ত বৈঠকে ভিডিওর মাধ্যমে যুক্ত হয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গণপরিবহন চলাচলে ১২ দফা নির্দেশনা দেন। এর মধ্যে আছে—স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। বাস টার্মিনালে কোনোভাবেই ভিড় করা যাবে না। তিন ফুট দূরত্ব বজায় রেখে যাত্রীরা গাড়ির জন্য লাইনে দাঁড়াবে এবং টিকিট কাটবে। স্টেশনে পর্যাপ্ত হাত ধোয়ার ব্যবস্থা রাখতে হবে। বাসে কোনো যাত্রী দাঁড়িয়ে যেতে পারবে না। বাসের সব সিটে যাত্রী নেওয়া যাবে না। ২৫-৩০ শতাংশ সিট খালি রাখতে হবে। পরিবারের সদস্য হলে পাশের সিটে বসানো যাবে, অন্যথায় নয়। যাত্রী, চালক, সহকারী, কাউন্টারের কর্মী—সবার জন্য মাস্ক পরিধান বাধ্যতামূলক। ট্রিপের শুরুতে এবং শেষে বাধ্যতামূলকভাবে গাড়ির অভ্যন্তরভাগসহ পুরো গাড়িতে জীবাণুনাশক ছিটাতে হবে। যাত্রী ওঠানামার সময় শারীরিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে হবে। চালক ও কন্ডাক্টরদের একটানা দায়িত্ব পালন করতে দেওয়া যাবে না। তাঁদের নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কোয়ারেন্টিন বা বিশ্রামে রাখতে হবে। মহাসড়কে চলাচলের ক্ষেত্রে পথিমধ্যে থামানো, চা বিরতি পরিহার করতে পারলে ভালো। কারণ সংক্রমণ কোথা থেকে হবে তা কেউই জানে না। যাত্রীদের হাত ব্যাগ, মালপত্র জীবাণুনাশক ছিটিয়ে জীবাণুমুক্ত করতে হবে।

সড়ক পরিবহন মন্ত্রী বলেন, ভাড়া নির্ধারণের জন্য বিআরটিএর একটি কমিটি রয়েছে। সে কমিটি সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনা করে যুক্তিসংগত ভাড়া চূড়ান্ত করবে।

সক্রিয় থাকবে ভ্রাম্যমাণ আদালত : সড়কমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বাস টার্মিনালে চালক, সহকারী ও শ্রমিকদের কাউন্সেলিং করা, গাড়ি ছাড়ার আগে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেওয়ার জন্য বাস মালিকদের নির্দেশনা দেন। তিনি বলেছেন, নিয়ম অমান্য করলে শাস্তির বিধান থাকবে জনস্বার্থে। বিআরটিএর ভ্রাম্যমাণ আদালত সক্রিয় থাকবে।

মন্তব্য করুন

সর্বশেষ নিউজ

আরো পড়ুন