শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২০, ১১:৪৯ পিএম

বারবার সিদ্ধান্ত বদলে বিশৃঙ্খল ঘরে ফেরা

প্রতিদিনের কাগজ ডেস্ক:
প্রকাশিত: ৯:১৯ পূর্বাহ্ন, ২৩ মে ২০২০, শনিবার


বারবার সিদ্ধান্ত বদলে বিশৃঙ্খল ঘরেফেরা

ছবি : সংগৃহীত ।

ঈদে ঘরেফেরা নিয়ে রীতিমতো হ-য-ব-র-ল অবস্থা। এর মূল কারণ প্রশাসনের নানা দোদুল্যমানতা। সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে দূরদর্শিতা ও বিচক্ষণতার অভাব। একবার বলা হয়, ঘরে ফেরায় মানা। কিন্তু যারা বের হয়, তাদের ঠেকানো হয় না। আবার ঠেকানো হলো তো মাঝপথে গিয়ে, ফেরিতে। বলা হলো, কোনো যানবাহন চলবে না। কিন্তু চলাচলে কাউকে বাধাও দেয়া হয়নি। কাউকে কাউকে বাধা দেয়া হলো অনেকদূর চলে যাওয়ার পর। পরে আবার বলা হলো গণপরিবহন ছাড়া বাকি সব যানবাহন চলতে পারে। এই জগাখিচুড়ি অবস্থায় শুধু দুর্ভোগই বেড়েছে। আর বেড়েছে করোনা মহামারি আরো ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা।

ঈদ মানে ইসলাম ধর্মালম্বীদের কাছে উৎসব আর খুশির জোয়ার। যে যেখানেই থাকুক পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে মুখিয়ে থাকে সবাই। প্রতিবছর ঈদের কয়েকদিন আগেই শুরু হয় বাড়ি ফেরার ধুম। নাড়ির টানে শত বাধা উপেক্ষা করে বাড়ি যেন ফিরতেই হবে। কিন্তু করোনা ভাইরাসের প্রভাবে এবার ঈদ কেমন হবে? সবাইকে বাড়ি ফিরতে দেয়া হবে কিনা এ নিয়ে ছিল নানা রকম শঙ্কা। কারণ পুলিশ প্রথমে বাড়ি ফেরার বিষয়ে কড়াকড়ি আরোপ করে। ফেরি ঘাট থেকে ফিরিয়ে আনা হয় যাত্রীদের। এরপর মুভমেন্ট পাস আরোপ করার চিন্তা করা করা হয়। ঠিক এর পরেই নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থায় বাড়ি ফেরার অনুমতি দিয়ে শিথিল করা হয় নিষেধাজ্ঞা। কিন্তু শত বাধা উপেক্ষা করে প্রথম থেকেই যে যার মতো নিজ গন্তব্যে ছুটতে থাকে মানুষ। যা চরম সমন্বয়হীনতা ফল বলে মত বিশেষজ্ঞদের।

যদিও র‌্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) চৌধুরী আবদুল্লা আল মামুন বলেছেন, সরকার মানুষের সুবিধার কথা বিবেচনা করেনই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাছাড়া করোনা পরিস্থিতিতে দেশে কারফিউ জারি করার মতো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি।

সরেজমিনে গতকাল শুক্রবার রাজধানীর মিরপুর, গাবতলী, পোস্তগোলা, ধোলাইপাড়, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, কমলাপুর, মালিবাগ, রামপুরা ও বাড্ডা এলাকা ঘুরে দেখা যায়, চেকপোস্ট থাকলেও সেখানে নেই কোনো পুলিশ সদস্য। দু-একটি চেকপোস্টে পুলিশ দেখা গেলেও তারা বসে আছেন নির্বিকার হয়ে। আর এই সুযোগে শুধু গণপরিবহন বাদে স্বাভাবিক দিনের মতোই রাস্তায় চলাচল করছে বিভিন্ন যানবাহন ও রিকশা। রাজধানীর ফার্মগেট থেকে সাভার যাওয়া ওলিউল্লাহ রহমান সোহেল জানান, ভাড়ার মোটরসাইকেলে গতকাল সকালে তিনি সাভার যান। রাস্তায় কোনো চেকপোস্টেই ছিল না পুলিশের তৎপরতা। খিলগাঁও ও যাত্রাবাড়ী চেকপোস্টে দায়িত্বরত দুজন পুলিশ সদস্য জানান, প্রতিদিন আশঙ্কাজনক হারে পুলিশ সদস্যরা করোনায় আক্রান্ত হওয়ায় তারা মানুষের কাছে তেমন যান না।

শুধু সড়ক নয়। রাজধানীর যেসব শপিংমল বা দোকান খোলা রয়েছে সেখানেও যেন স্বাভাবিক পরিস্থিতি। শপিংমলে প্রবেশ করতে সুরক্ষা ব্যবস্থা নেয়া হলেও বাইরে ক্রেতাদের লম্বা লাইন চোখে পড়ার মতো। এসব লাইনে মানা হচ্ছে না কোনো সামাজিক দূরত্ব। রাজধানীর মৌচাক মার্কেটে ঈদের কেনাকাটা করতে আসা রামীম রহমান অভি ভোরের কাগজকে বলেন, প্রতিবছর ঈদে নতুন জামা কিনি। এ বছর এখনো কেনা হয়নি। তাই ঝুঁকি থাকলেও এসেছি।

এদিকে, ব্যক্তিগত গাড়িতে বাড়িফেরা যাবে এমন ঘোষণা পাওয়ার পরেই বাড়ি ফিরতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। গতকাল সকাল থেকেই ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে বাড়তে থাকে ভিড়। মাওয়া ও পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ফেরিঘাটেও শুরু হয় দক্ষিণবঙ্গের ২১ জেলার মানুষের জনস্রোত। ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছে সবাই। এ যেন জীবনের শেষ যাত্রা। তবুও যে যেভাবে পারছে অটো, ট্রাক, মিনি ট্রাক, ভাড়ার মোটরসাইকেল, লেগুনা, প্রাইভেট কার, সিএনজি, মাইক্রোবাসে বাড়ি ফিরছে।

রাজধানীর মিরপুর থেকে গ্রামের বাড়ি যাওয়া গার্মেন্টস ব্যবসায়ী সাহাবুদ্দিন সাবু বলেন, ব্যক্তিগত গাড়িতে বাড়ি ফেরা যাবে প্রশাসনের এমন ঘোষণা শোনার পরই সিএনজি নিয়ে গাবতলী যান। সেখানে গিয়ে রীতিমতো অবাক হয়ে যান। গণপরিবহন না থাকলেও প্রাইভেট কার ও মাইক্রোবাসের ছড়াছড়ি। গণপরিবহনের মতোই বাড়িফেরা যাত্রীদের গাড়িতে তুলে আরিচা পর্যন্ত পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। বিনিময়ে প্রতিজনের কাছ থেকে নেয়া হচ্ছে ৫০০ টাকা। এরপর ফেরি পার হয়ে একই কায়দায় ইজিবাইক ও লেগুনায় কয়েকগুণ ভাড়া দিয়ে বাড়িতে ফিরেছেন। সাধারণ সময়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা লাগলেও এবার ১৫০০ টাকা খরচ করে ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে গিয়েছেন বলে জানান তিনি।

জানা গেছে, ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের খবর পেয়েই সব গাড়ি নামিয়ে দেয় রেন্ট-এ-কার কোম্পানিগুলো। স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে দ্বিগুণ ভাড়া নিয়ে যাত্রীদের নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে দিচ্ছেন তারা। রাজধানীর রামপুরা থেকে রেন্ট-এ কারে বাড়িফেরা একটি সফটওয়্যার কোম্পানির একাউন্টস বিভাগে কর্মরত সোহানুজ্জামান জয় ভোরের কাগজকে বলেন, ব্যক্তিগত গাড়ি না থাকায় সহকর্মীরা মিলে দ্বিগুণ ভাড়া দিয়ে একটি মাইক্রোবাস ভাড়া করেছি।

সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক তৌহিদুল হক  বলেন, দেশে করোনা শনাক্ত হওয়ার পর অসংখ্যবার ভুল সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। করোনা থেকে মুক্তি পেতে আসলে কি করা উচিত সেই একক সিদ্ধান্ত আমরা নিতে পারিনি। দায়িত্বশীলদের একেক জন একেক ধরনের কথা বলছেন। ফলে মানুষের মধ্যে দ্বিধা ও অস্থিরতা সৃষ্টি হচ্ছে। যেহেতু কোনো সিদ্ধান্তই কার্যকর হচ্ছে না। এ জন্য মানুষ সাহস করে গ্রামে যাওয়াসহ তার মনে যা চাচ্ছে, তাই করছে। যা করোনা পরিস্থিতিতে মারাত্মক ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে অবশ্যই একটি একক কার্যকর সিদ্ধান্ত নিয়ে কড়াকড়ি আরোপ করে বাস্তবায়ন করতে হবে। না হলে একটা সময় মানুষ আর কোনো সিদ্ধান্তই মানবে না।

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) সোহেল রানা বলেন, কোনো সিদ্ধান্তই পুলিশের নয়। পুলিশ শুধু সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে। জনস্বার্থ কথা চিন্তা করে সরকার যখন যে নির্দেশনা ও নিষেধাজ্ঞা দেয়, পুলিশ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করে।

মন্তব্য করুন

সর্বশেষ নিউজ

আরো পড়ুন