মঙ্গলবার, ২ জুন ২০২০, ৫:১৩ এএম

সংকটে ২৬ লাখ বিনিয়োগকারী

প্রতিদিনের কাগজ ডেস্ক:
প্রকাশিত: ৮:১১ পূর্বাহ্ন, ১৮ মে ২০২০, সোমবার


ছবি : সংগৃহীত ।

পুঁজিবাজারে করোনার ধাক্কা

► ২৬ মার্চ থেকে পুঁজিবাজার বন্ধ, দ্রুতই চালু হচ্ছে না
► ২৫ মার্চ পর্যন্ত ১৮ দিনে ৩০ হাজার কোটি টাকা খুইয়েছেন বিনিয়োগকারীরা
► করোনায় প্রয়োজনে মূলধন তুলতে পারছেন না

শিল্পপ্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ মেয়াদে অর্থের উৎস পুঁজিবাজার। উদ্যোক্তা পুঁজিবাজারে কম্পানির শেয়ার ছেড়ে মূলধন সংগ্রহ করেন। সাধারণ মানুষ তাঁদের জমানো মূলধন বিনিয়োগ করেন ওই শেয়ারে। বিনিময়ে মুনাফার একটি অংশ লভ্যাংশ হিসেবে পান তাঁরা। কিন্তু করোনার কারণে বিনিয়োগ করা মূলধন, কম্পানি থেকে লভ্যাংশ পাওয়া নিয়ে সংকটে ২৬ লাখ বিনিয়োগকারী।

বিনিয়োগকারীরা বলছেন, পুঁজিবাজার বন্ধ থাকায় ব্রোকারেজ হাউসে টাকা পড়ে থাকলেও তুলতে পারছেন না। করোনার কারণে অন্য সব আয় বর্তমানে বন্ধ থাকায় পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ অনেকের একমাত্র ভরসা। লোকসান হলেও কারো কারো সামান্য মূলধন রয়েছে, কেউ সব খুইয়েছেন। সামনে ঈদ। টাকার প্রয়োজন। কিন্তু যাঁদের মূলধন রয়েছে, তাঁরা চাইলেও এখন টাকা তুলতে পারছেন না।

এ পরিস্থিতিতে করোনার মধ্যেও পুঁজিবাজার চালুর জোর দাবি উঠেছে। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটির মধ্যে পুঁজিবাজার চালুর সম্ভাবনা নেই। লকডাউনে লেনদেন চালু করতে বিধি-বিধান শিথিল সংক্রান্ত নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন প্রয়োজন। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) শীর্ষ পদে নিয়োগ চূড়ান্ত হওয়ার পরও কোরাম সংকটে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। নতুন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া না হলে আগামী ৩০ মে পর্যন্ত বন্ধ থাকছে পুঁজিবাজার।

করোনার কারণে গত মার্চের ১৮ দিনে ৩০ হাজার কোটি টাকা মূলধন খুইয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। দাম কমে গেলেও আতঙ্কে শেয়ার বিক্রি করায় লোকসানে পড়েছেন তাঁরা। মুনাফার আশা বাদ দিয়ে এখন ‘পূর্ণ মূলধন’ ফিরে পেতে অপেক্ষা করতে হবে অন্তত কয়েক মাস। পুঁজিবাজার বন্ধ থাকায় আরো সংকটে পড়েছেন বিনিয়োগকারীরা। লকডাউন পরিস্থিতিতে অর্থের প্রয়োজন হলেও মূলধন তুলতে পারছেন না তাঁরা।

বছর শেষে কম্পানির লভ্যাংশ থেকে বিনিয়োগকারীর আয় হয়। কম্পানি ভালো মুনাফায় করলে বিনিয়োগকারীও ভালো লভ্যাংশ পান। করোনার কারণে এবার শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ব্যবসায় ধস নেমেছে। এ অবস্থায় কম্পানির ‘ভালো’ মুনাফা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

লভ্যাংশ ঘোষণা করতে না পারলে কোনো কম্পানির ক্যাটাগরি পরিবর্তন বা উদ্যোক্তাদের ঋণখেলাপি না করার আবেদন জানিয়েছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কম্পানিগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিক লিস্টেড কম্পানিজ (বিএপিএলসি)। আবার তারল্য প্রবাহ ঠিক ও সক্ষমতা বাড়াতে ব্যাংকের লভ্যাংশ বিতরণে লাগাম টেনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ১৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশের পাশাপাশি সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারবে ব্যাংক। অনেক ব্যাংক বেঁধে দেওয়া সীমার চেয়ে ভালো লভ্যাংশ ঘোষণা করে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্তে কার্যত ক্ষতির মুখে পড়বেন ব্যাংকের শেয়ারে বিনিয়োগকারীরা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, করোনায় বিশ্বের সব দেশের পুঁজিবাজার ক্ষতিগ্রস্ত। তবে সাময়িক বন্ধের পর সংকট কাটিয়ে ফের সচল হচ্ছে ওই সব দেশের পুঁজিবাজার। অথচ প্রযুক্তিগত সক্ষমতা না থাকায় পুঁজিবাজার খুলে দিতে ব্যর্থ হয়েছে বাংলাদেশ। ফলে দুই মাস বন্ধ দেশের পুঁজিবাজার।

স্টক এক্সচেঞ্জের কর্মকর্তারা বলছেন, সাধারণ ছুটিতে পুঁজিবাজার বন্ধ থাকে। এবার সংকটের কারণে সাধারণ ছুটি হলেও পুঁজিবাজারের বিষয়ে আলাদা কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকবে এমনটাও ভাবেননি তাঁরা। সাধারণ ছুটি ও লকডাউন পরিস্থিতিতে লেনদেন চালু করতে বিধি-বিধান ছাড়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন প্রয়োজন হবে।

করোনার কারণে গত ফেব্রুয়ারিতে লেনদেনে ধীরগতি দেখা দেয়। পুঁজিবাজার সক্রিয় করতে ওই সময় প্রতিটি ব্যাংককে বিনিয়োগসীমার বাইরে ২০০ কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠনের সুযোগ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।

পর্ষদে অনুমোদনের পর তহবিল গঠন করে বিনিয়োগ শুরুর প্রাক্কালে ৮ ফেব্রুয়ারি দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। করোনা শনাক্ত হওয়ার পরই টালমাটাল হয়ে ওঠে পুঁজিবাজার। শেয়ার বিক্রি করে মূলধন তুলতে হুমড়ি খেয়ে পড়েন বিনিয়োগকারীরা। ব্যাংকের বিনিয়োগ বাড়িয়েও পতন ঠেকানো সম্ভব হয়নি। এতে শেয়ারের দাম কমলেও বিক্রির চাপে প্রতিদিন বিনিয়োগকারীরা মূলধন খোয়াচ্ছিলেন। তবে বিনিয়োগকারীর কথা চিন্তা করে গত ১৯ মার্চ শেয়ারের সর্বনিম্ন দাম বেঁধে দেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা। এতে মূলধন হারানো থেকে স্বস্তি পায় বিনিয়োগকারীরা।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের তথ্যানুযায়ী, সরকারি সাধারণ ছুটি শুরু হয় ২৬ মার্চ। ওই দিন থেকে পুঁজিবাজার বন্ধ। ২৫ মার্চ সর্বশেষ লেনদেন হয়েছে। সেই হিসাবে মার্চ মাসে পুঁজিবাজার চালু ছিল ১৮ দিন। এই সময়ে বিনিয়োগকারী মূলধন হারিয়েছেন ৩০ হাজার ৭৪৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা। আর বাজার নির্দেশক সূচক কমে ৪৭২ পয়েন্ট, যা ২০১৩ সালে চালু করা প্রধান মূল্যসূচক ভিত্তি পয়েন্টের নিচে নেমে যায়।

৮ মার্চ করোনা রোগী ধরা পড়লে শেয়ার বিক্রির চাপ অস্বাভাবিক বাড়ে। এক দিনে বাজার মূলধন পাঁচ হাজার ২৩৬ কোটি ৪১ লাখ টাকা উধাও হয়ে যায়। আর সূচক কমে ৯৭ পয়েন্ট। পরদিন ৯ মার্চ সূচক আরো ১৭৯ পয়েন্ট কমে যায়। করোনা রোগী চিহ্নিত হওয়ার পর থেকে ১৫ দিনে বাজার মূলধন কমেছে ২৪ হাজার ৫১১ কোটি টাকা। অর্থাৎ বাজারে বিক্রয়যোগ্য যে শেয়ার ছিল তার দাম কমে যাওয়ায় মূলধন কমে যায়। তবে যাঁরা বিক্রি করে বেরিয়ে গেছেন তাঁরা এই মূলধন লোকসান করেছেন।

প্রায় দেড় মাস বন্ধ থাকায় পুঁজিবাজার খুলে দিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে আবেদন জানিয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। গত ১৪ মে বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদ (বিসিআইএ) দ্রুত পুঁজিবাজার খুলে দেওয়ার দাবি জানায়।

সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক কাজী আব্দুর রাজ্জাক বলেন, অর্থনীতির দ্বিতীয় চালিকাশক্তি হওয়ার পরও পুঁজিবাজার বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে দেশের লাখ লাখ বিনিয়োগকারী আর্থিক, সামাজিক, ব্যাবসায়িক ও পারিবারিকভাবে মানবেতন জীবন যাপন করছেন। অনলাইন ও মোবাইলে শেয়ার কেনাবেচার সুযোগ রয়েছে। সামনে ঈদ। ব্রোকারেজ হাউসে অনেকের টাকা আটকা পড়েছে। মূলধন তুলতে এখন পুঁজিবাজার চালু করা প্রয়োজন।’

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের পরিচালক রকিবুর রহমান বলেন, ঈদের আগে অন্তত কয়েক দিনের জন্য পুঁজিবাজার খুলে দিতে হবে। পুঁজিবাজার বন্ধ থাকায় স্টক এক্সচেঞ্জ ও ব্রোকারেজ হাউসের কার্যক্রম বন্ধ। কোনো বিনিয়োগকারী টাকা তুলতে পারছেন না। বিনিয়োগ করতে পারছে না। দৈনন্দিন জীবন-জীবিকা চালানোর জন্য শেয়ার বিক্রিও করতে পারছেন না। ব্যাংক ব্যবস্থা খোলা থাকলে পুঁজিবাজার কেন বন্ধ থাকবে? শেয়ার লেনদেনে এখন বিনিয়োগকারীকে হাউসে যেতে হয় না। সব কিছু টেলিফোন, মোবাইল অ্যাপস, এসএমএস ও ই-মেইলের মাধ্যমেও পরিচালনা করা যায়।’

মন্তব্য করুন

সর্বশেষ নিউজ

আরো পড়ুন