শুক্রবার, ২৯ মে ২০২০, ৭:৫৬ এএম

চাকরিজীবী-শ্রমিক-গাড়িচালক, সবাই এখন ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ী

প্রতিদিনের কাগজ ডেস্ক:
প্রকাশিত: ১২:২২ পূর্বাহ্ন, ১৬ মে ২০২০, শনিবার


চাকরিজীবী-শ্রমিক-গাড়িচালক, সবাই এখন ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ী

ফাইল ছবি ।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে বাংলাদেশে যে লকডাউন পরিস্থিতি চলছে, তাতে করে শুরু থেকেই বিপাকে পড়েছেন স্বল্প আয়ের মানুষ। লকডাউনের মেয়াদ দফায় দফায় বাড়ায় এসব মানুষের খেয়ে পরে বেঁচে থাকাই তাদের জন্য এখন চ্যালেঞ্জ। তাই তো জীবিকার তাগিদে অনেকে পেশা বদলে এখন টিকে থাকার চেষ্টা করছেন।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অল্প বেতনের চাকরিজীবী, গপরিবহনের চালক, হেলপার, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কারখানার শ্রমিক, তাদের মধ্যে অনেকেই কোনো উপায় না পেয়ে পরিবার নিয়ে টিকে থাকার লড়াইয়ে এখন তারা বেছে নিয়েছেন নতুন পেশা। সবাই এখন ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ী। তাদের মধ্যে অনেকে পুরোদমে মৌসুমী ফল বিক্রেতা, সবজি বিক্রেতা, কেউ মাছ বিক্রেতা, কেউ বাচ্চাদের খেলনা বিক্রেতা, ঈদ উপলক্ষে অনেকেই নতুন কাপড়-চোপড় বিক্রেতাও হয়েছেন। রাস্তায় রাস্তায় ভ্যানগাড়ি ঠেলে, কেউ ভ্যানে বাড়ি বাড়ি গিয়ে এসব পণ্য বিক্রি করছেন। আবার অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এখন রাজধানীতে রিকশা চালাচ্ছেন। এতে স্বচ্ছন্দে জীবনধারণ করতে না পারলেও পরিবার নিয়ে কোনোরকম খেয়ে বেঁচে থাকতে পারছেন তারা।

এদিকে করোনাকালে নিজের পরিবারকে বাঁচানোর পাশাপাশি এই ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীরা সহজ করে দিয়েছেন অনেকের জীবনযাত্রা। ভাইরাস সংক্রমণের মারাত্মক ঝুঁকি নিয়ে আর বাজারে যাওয়ার দরকার পড়ছে না। ভিড় এড়িয়ে বাসার সামনেই কিনে নেওয়া যাচ্ছে প্রয়োজনীয় মাছ-সবজি-ফলসহ নানান কিছু।

বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার রাজধানীর জোয়ারসাহারা, কুড়িল চৌরাস্তাসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, রাস্তায় ও বিভিন্ন অলিগলিতে ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীর সংখ্যা ব্যাপক হাড়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। কুড়িল চৌরাস্তা এলাকার নূরানী মসজিদ রোডের গলিতে শার্ট প্যান্ট পড়ে ভ্যানে করে সবজি বিক্রি করছেন কাইয়ুম মিয়া।

জানতে চাইলে বলেন, তিনি রাজধানীর নাম করা একটি গণপরিবহনের ড্রাইভার। গাড়ি বন্ধ থাকায় বসে থাকতে থাকতে জমানো টাকাগুলো শেষ করেছি, পরে কোনো উপায় না দেখে রমজানের শুরু থেকেই হেলপার রায়হানকে নিয়ে একটি ভ্যানগাড়ি ভাড়া করে এ ব্যবসায় নেমেছি। দুটি সন্তানসহ ৪ জনের সংসার। গ্রামের বাড়িতে বাবা-মা রয়েছেন। সারাদিন সবজি বিক্রি করার পরে ভ্যান ভাড়া, সহযোগীর হেলপারকে তার খরচ দেওয়ার পরে তার ৩০০ থেকে ৪০০টাকা থাকে। এ টাকায় একটু কষ্ট হলেও পরিবার নিয়ে চলতে পারছেন তিনি।

এ এলাকায় রাস্তার পাশে ভ্যানে বিভিন্ন মৌসুমী ফল সাজিয়ে বিক্রি করছেন সাদ্দাম হোসেন নামের বেসরকারি এক চাকরিজীবী। চেহারা দেখেই বুঝা যাচ্ছে তিনি প্রফেশনাল ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ী না। জানতে চাইলে বলেন, ‘জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে অর্নাস, মাস্টার্স শেষ করে গত দুই বছর আগে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেন। দেশে যখন লকডাউন শুরু হয় তখন থেকেই তার অফিস বন্ধ। অফিস বন্ধ থাকায় বেতনও ঠিক মতো দেয় না। চাকরিও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। পরে মাসখানেক স্বজনদের কাছ থেকে ধারকর্জ করে চলেছি। মা-বাবা ছোট ভাই ও বোনসহ ৫ জনের সংসার। সংসারের খরচ জোগাতেই এখন বাধ্য হয়ে ভ্যানে করে রাস্তায় রাস্তায় ফল বিক্রি করছি।

জোয়ারসাহারা বাজার এলাকায় একটি স্টিল কারখানায় কাজ করতেন খাইরুল ইসলাম। লকডাউনের কারণে কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তার পরিচিত একজনের পরামর্শে মাছ ব্যবসা শুরু করেন। তিনি বলেন, ‘বাজারে অন্য ব্যবসায়ীরা বসতে না দেওয়ায় তিনি বাড়ি বাড়ি গিয়ে মাছ বিক্রি করছেন। কারোনার কারনে অনেকে বাজারে যেতে চায় না, তাই আমার কাছ থেকে তারা মাছ কিনছেন। আমি বাজারের ব্যবসায়ীদের মতো ডাবল লাভের আশা করি না। কিছু লাভ হলেই দিয়ে দেই, তাই অনেকে আমার কাছ থেকে মাছ কেনার অপেক্ষায় থাকেন।’

তাদের মতো পেশা পরিবর্তন করে ভ্যান গাড়িতে বাচ্চাদের কাপড় ও খেলনা সাজিয়ে রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে বিক্রি করন একটি রেস্তেুারাঁর কর্মচারী সোহেল খান। তিনি বলেন, ‘একটি রেস্তোরাঁয় চাকরি করতাম করোনার কারণে রেস্তোরাঁ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রেস্তেুারাঁর মালিক আমাদের এক মাসের বেতন দিয়ে বিদায় করে দেন। পরে পরিবার নিয়ে গ্রামের বাড়ি জামালপুর চলে যায়। বাড়িতে কোনো কাজ নেই বসে থাকা ভালো লাগে না পরে বাড়িতে বউ- বাচ্চাদের রেখে আমি আবার ঢাকায় চলে আসি। পরিচিত কাপড় ব্যবসায়ীর সাথে যোগাযোগ করলে তিনি আমাকে তার দোকান থেকে বাচ্চাদের কিছু কাপড় ভ্যানে করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিক্রি করার পরামর্শ দেন। পরে আমি নিজেও কিছু বাচ্চাদের খেলনা কিনে ভ্যানে করে কাপড় ও খেলান বিক্রি করা শুরু করি। তবে রমজানের আগে বিক্রি তেমন ছিল না, এখন ভালোই বিক্রি করতে পারছি।’

সোহেল খান আরো জানান, ‘করোনায় কাজ হারিয়ে ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ী হওয়া মানুষের সংখ্যা এখন অনেক। তার পরিচিতদের মধ্যে অনেকে রাজধানীর বিভিন্ন রোডে রেস্টুরেন্টের হয়ে ইফতারি বিক্রি করছেন। অনেকে ফল বিক্রি করছেন। আবার কয়েকজন রিকশাও চালাচ্ছেন।’

পথচারীরা বলছেন, ‘আগে যারা অল্প বেতনে বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত ছিল, দীর্ঘ লকডাউনের কারণে তাদের এখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। তাই তারা অন্য কোনো উপায় না দেখে ভ্রাম্যমাণ ব্যবসা শুরু করেছে। এখন শহরে প্রত্যেক দিনই ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীদের সংখ্যা বাড়ছে।’

মন্তব্য করুন

খবর অনুসন্ধান

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১

সর্বশেষ নিউজ

আরো পড়ুন