শনিবার, ৩০ মে ২০২০, ১:৪২ এএম

রমজানে দানে রয়েছে অফুরন্ত সওয়াব

হাফেজ মো. নাসির উদ্দীন, অতিথি লেখক:
প্রকাশিত: ৪:৫৪ অপরাহ্ন, ১৫ মে ২০২০, শুক্রবার


রমজানে দানে রয়েছে অফুরন্ত সওয়াব

ছবি : সংগৃহীত ।

ইসলামী জীবন ব্যবস্থায় সাদকা বা দান একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দান করা একটি অতি মহৎ কাজ। ধনী-গরিবের ব্যবধান দূরীভূত করে ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা কায়েমে দানের রয়েছে অপরিসীম গুরুত্ব।

দান করতে বিশাল অর্থ বিত্তের মালিক হতে হয় না। অল্প পরিমাণ সম্পদের মালিক হলেও দান করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট। দানের জন্য বিত্তের চেয়ে চিত্তের ঐকান্তিক ইচ্ছা ও উদারতা বেশি প্রয়োজন। যেহেতু রমজান মাস তাক্বওয়া অবলম্বন ও অর্জনের মাস, সেহেতু এই মাসে আল্লাহর কাছ থেকে যেকোনো ইবাদতের বিনিময়ে যেমন বেশি নেকি পাওয়া যায় তেমনি দানের ফজিলত ও খুব বেশি। মাহে রমজানের এই বরকত এবং এই মাসে আল্লাহর বিশেষ রহমত মানুষকে দানশীলতা, বদান্যতা, উদারতা ও মহৎ গুণাবলীর প্রতি উদ্বুদ্ধ ও উৎসাহিত করে থাকে।

প্রতি বছর রমজান মাসে আমরা বেশি বেশি দান সদকা করি এবং জাকাত দেই। কারণ আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, দান সদকা ও সম্পদের উদ্বৃত্ত অংশ জাকাত দিলে আল্লাহ খুশি হন এবং সেই দান ও ভালো কাজের পুরস্কার আরও শতগুণ বৃদ্ধি করে তিনি আবার আমাদের ফিরিয়ে দেন।

দানকারীর মর্যাদা সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেন, শুধুমাত্র দুইজন লোকের উপর ঈর্ষা করা যায়। একজন হলেন সেই ব্যক্তি যাকে আল্লাহ তায়ালা কোরআনের জ্ঞান দিয়েছেন আর সে রাত দিন তা চর্চা করে। অপরজন হলেন যাকে আল্লাহ সম্পদ দিয়েছেন আর রাত দিন সে তা মানব কল্যাণে খরচ করে। (বুখারী)

রমাজনে আল্লাহর কাছে যেকোনো ইবাদতের বিনিময়ে বেশি নেকি পাওয়া যায়। তেমনি রমজানে দানের ফজিলতও বেশি। রমজান মাসে আল্লাহ তায়ালা প্রতিটি নফল কাজের সওয়াব ৭০ গুণ বাড়িয়ে দেন। আল্লাহ চাইলে এ দানের সওয়াব ৭০ হাজার গুণও বাড়িয়ে দিতে পারেন।

রমজান মাসে মানুষ নির্ধারিত সময় পানাহার থেকে বিরত থেকে রোজা পালনের মাধ্যমে গরিবের দুঃখ-কষ্ট উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়। তাছাড়া অসহায়, গরিব, দুস্থ ও অধিকার বঞ্চিত প্রান্তিক মানুষদের অসহায়ত্ব লাঘবের মাসও এটি। এই সময় তারা ধনীদের নিকট থেকে নিজেদের প্রাপ্য দান সদকা ও জাকাতের অর্থ পেয়ে কিছুটা সচ্ছল হন।

ইসলামের নির্দেশিত এ পথেই দারিদ্র্যকে বিদায় জানিয়ে সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে যাবতীয় জুলুম, অন্যায়-অনাচার ও অবৈধ ধনলিপ্সার পরিসমাপ্তি ঘটানো সম্ভব। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর পথে ব্যয় করাকে এতটা পছন্দ করেন যে, তিনি হাশরের ময়দানে তাঁর সামনে দাঁড়ানোর পূর্বেই তা করতে আহ্বান করেছেন। আল্লাহ বলেন- হে বিশ্বাসীগণ আমি তোমাদীগকে যে জীবিকা দান করেছি, তা থেকে সেই দিন আসার পূর্বে ব্যয় করো যেদিন কোন বিনিময়, বন্ধুত্ব ও সুপারিশ কাজে আসবে না, আর অবিশ্বাসীরাই অত্যাচারী। ( সুরা আল-বাকারাহ: ২৫৪)

এই আয়াতটি বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখি যে, আল্লাহ মুমিনদের কাছ থেকে আশা করেন তারা যেন মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত নিজেদের সম্পদের একটা অংশ অসহায় ও গরিব-দুঃখীদের মাঝে দান করেন। আর যারা এটা করবে না, তাদের আখেরাতে অবিশ্বাসী এবং নিজেদের নফসের উপর জুলুমকারী হিসেবে আল্লাহ আখ্যায়িত করেছেন। আর মৃত্যুর পর অনুশোচনা করারও কোনো সুযোগ থাকবে না।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন- মানুষ আমার সম্পদ আমার সম্পদ বলে তা আঁকড়ে থাকে অথচ তিনটি ক্ষেত্রে ব্যবহৃত সম্পদই শুধু তার। ১) যা খেয়ে শেষ করেছে, ২) যা পরিধান করে নষ্ট করেছে ৩) এবং যা দান করে জমা করেছে-তাই শুধু তার। আর অবশিষ্ট সম্পদ সে ছেড়ে যাবে, মানুষ তা শুধু নিয়ে যাবে। (মুসলিম)

দান না করার পরিণাম সম্পর্কে সতর্ক করে আল্লাহ বলেছেন, আমি তোমাদের যে রিযিক দান করেছি তা থেকে খরচ করো তোমাদের কারো মৃত্যু আসার আগেই। অন্যথায় অনুতাপ অনুশোচনা করে বলতে হবে, হে পরোয়ারদেগার, আমাকে যদি অল্প সময়ের জন্য অবকাশ দিতে, তাহলে আমি দান খয়রাত করতাম এবং নেক লোকদের একজন হতে পারতাম! কারো মৃত্যুর নির্ধারিত সময় আসার পর আল্লাহ কাউকে অবকাশ দেন না। আল্লাহ তোমাদের যাবতীয় কার্যক্রম সম্পর্কে ভালোভাবে ওয়াকিবহাল। (সুরা মুনাফিকুন: ১০-১১)

আর এই কাজটি আল্লাহর জন্য নয় বরং নিজের উপকারের জন্যই অপরিহার্য যার প্রতিদান পরিপূর্ণভাবে পাওয়া যাবে আখেরাতে। আল্লাহ এই দানের বিনিময় তাঁর ইচ্ছামত অসীম পরিমাণ দিতে অঙ্গীকার করে বলেছেন-

যারা আল্লাহর পথে স্বীয় ধন-সম্পদ ব্যয় করে তাদের উপমা যেমন একটি শস্য বীজ, তা হতে উৎপন্ন হলো সাতটি শীষ, প্রত্যেক শীষে (উৎপন্ন হলো) শত শস্য, এবং আল্লাহ যার জন্য ইচ্ছা করেন বর্ধিত করে দেন, বস্তুত আল্লাহ হচ্ছেন বিপুল দাতা, মহাজ্ঞানী। (সুরা বাকারাহ: ২৬১)

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, দানকারী আল্লাহর নিকটতম, বেহেশতের নিকটতম এবং মানুষের নিকটতম হয়ে থাকে। আর দূরে থাকে জাহান্নাম থেকে। অন্যদিকে কৃপণ ব্যক্তি দূরে অবস্থান করে আল্লাহ থেকে, বেহেশত থেকে এবং মানুষের কাছ থেকে। আর কাছাকাছি থাকে জাহান্নামের। অবশ্যই একজন জ্ঞানহীন দাতা একজন কৃপণ ইবাদতকারীর তুলনায় আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়।

মহামারি করোনায় বর্তমানে সমগ্র বিশ্ব এক অভাবনীয় দুর্যোগের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। উপার্জনের সুযোগ না থাকায় দিশেহারা মানুষ অনাহারে অর্ধাহারে মানবেতর জীবন যাপন করছে। তাই দান সদকা ও জাকাত দেওয়ার এখনই উপযুক্ত সময়। বিশেষ করে সমাজের বিত্তবানদের উচিত এখনই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া। ধনীদের জন্য আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের বিরাট সুয়োগ এসেছে এই মুহূর্তে। সর্বোপরি আমরা যদি এই কঠিন দুঃসময়ে বিপদগ্রস্ত মানুষের সাহায্যে আমাদের দানের হাত প্রসারিত করি, দয়াময় মহান আল্লাহ ইহজগত ও পরজগতের কঠিন সংকটকালে আমাদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবেন।

লেখক: সিনিয়র এক্সিকিউটিভ অফিসার, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড।

মন্তব্য করুন

খবর অনুসন্ধান

সর্বশেষ নিউজ

আরো পড়ুন