মঙ্গলবার, ২ জুন ২০২০, ৪:৩৫ এএম

পুলিশ স্বামীর নির্যাতনে ঘরছাড়া গৃহবধূ

প্রতিদিনের কাগজ ডেস্ক:
প্রকাশিত: ১১:৫৭ অপরাহ্ন, ১২ মে ২০২০, মঙ্গলবার


পুলিশ স্বামীর নির্যাতনে ঘরছাড়া গৃহবধূ

ছবি : সংগৃহীত ।

পুলিশ স্বামীর নির্যাতনে ঘরছাড়া হয়ে এক গৃহবধূ তার দেড় বছরের সন্তানকে নিয়ে পথে পথে ঘুরছেন।

ঘরছাড়া হয়ে পথে পথে ঘুরে চাইছেন নিরাপদ আশ্রয়।

গত সোমবার স্বামীর পরিবারের লোকজনের মারধরে অসুস্থ ওই গৃহবধূর ঠাঁই হয়েছে পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালে। হাসপাতালের বেডে শুয়ে ওই গৃহবধূ এখন নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজ করছেন। কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই তার। স্বামীর বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। আশ্রয় মেলেনি নিজের বাবার বাড়িতেই।

প্রেমে পড়ে ওই পুলিশ সদস্যকে বিয়ে করাই যেন তার জীবনে কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বামী ও শ্বশুর বাড়ির লোকজনের ক্রমাগত নির্যাতনের ছাপ তার চোখে মুখে। ১৮ বছর বয়সী ওই গৃহবধূর নাম জামিয়াতুন নেছা জুঁই। বাড়ি দেবীগঞ্জ উপজেলার টেপ্রিগঞ্জ ইউনিয়নের বানেশ্বরপাড়া এলাকায়। সে ওই গ্রামের জসিম উদ্দিনের মেয়ে। তার শ্বশুর বাড়িও একই গ্রামে। তার স্বামী আকতারুজ্জামান সৈয়দপুরে আমর্ড পুলিশ ব্যাটালিয়নে কর্মরত আছেন। আকতারুজ্জামান ওই এলাকার মৃত দেলোয়ার হোসেন ছেলে।

জানা যায়, দেবীগঞ্জ রিভারভিউ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ৯ নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় দেবীগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের ছাত্র আকতারুজ্জামানের সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে জুঁইয়ের। এক পর্যায়ে শারীরিক সম্পর্কও গড়ে উঠে তাদের মধ্যে। এক সময় অন্তঃস্বত্তা হয়ে পড়ে কিশোরী জুঁই। পরে বিষয়টি জানাজানি হয়ে গেলে আকতারুজ্জামানের পরিবার তাকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করে।

২০১৮ সালের নভেম্বরে আদালতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করে জুঁই। পরে মামলা তুলে নেয়ার শর্তে সমঝোতা হয়। ধর্ম মোতাবেক জুঁইকে বিয়ে করে আকতারুজ্জামান। তবে কাজীর মাধ্যমে রেজিস্ট্রি করা হয়নি আকতারুজ্জামানের চাকরি বাঁচানোর শর্তে।

বিয়ের পরও জুঁই বাবার বাড়িতেই থাকতো। ২০১৮ সালের ১৭ই নভেম্বর জুঁই একটি কন্যা সন্তানের মা হন। পরে চাপে পড়ে তাকে বাড়ি নিতে বাধ্য হয় আকতারুজ্জামান।

জুঁইয়ের অভিযোগ, চাপে পড়ে জুঁইকে গ্রহণ করলেও বিয়ের পর থেকেই তার ওপর স্বামী ও শ্বশুর বাড়ির লোকজন নির্যাতন শুরু হয়। টর্চার শেলের মতো করে পরিবার সবাই তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন শুরু করে। সন্তানসহ জুঁইয়ের জায়গা হয় শ্বশুর বাড়ির রান্না ঘরে। এমনকি ধান কাটা থেকে শুরু করে বাড়ির যাবতীয় কাজ সবাই তাকে দিয়েই করিয়ে নিতো। তবে, ঠিকমতো খাবারও জুটতো না জুঁই ও তার সন্তানের। এমনকি কাপড় চোপড়রও দেয়া হতো না তাদের। শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করে স্বামীর বাড়িতেই ছিলেন জুঁই। তাদের কথার অবাধ্য হলে মাঝে মধ্যেই ঘরে তালাবন্ধ করে আটকে রাখা হতো।

আকতারুজ্জামান ছুটিতে বাড়ি ফিরলে সেও জুঁইকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করতো। সে কর্মস্থলে থাকলেও জুঁইয়ের সাথে কথা বলতে দিতো না তার পরিবারের লোকজন। বেশ কয়েকবার জুঁইকে তার শ্বশুরবাড়ির লোকজন মারধর করে বের করে দেয়। আবার মামলার ভয়ে বাড়ি নিয়ে আসে।

গত ১৭ই মার্চ স্বামীর সাথে সৈয়দপুরে দেখা করতে যাওয়ার অপরাধে জুঁইকে বাড়ি থেকে মারধর করে তাড়িয়ে দেয় তার শ্বশুরবাড়ির লোকজন। পরে সে আশ্রয় নেয় বাবার বাড়িতে। সেখানে প্রতিদিন বাবা জসিম উদ্দিনের বকাঝকা ও মারধরের শিকার হতে হয় তাকে। এক পর্যায়ে গত সোমবার সকালে আবারো শ্বশুরবাড়িতে আশ্রয়ের জন্য যায় জুঁই। কিন্তু বাড়িতে প্রবেশের আগেই ওই পরিবারের লোকজন তাকে টেনে হিচড়ে বের করে দেয়।

পরে, জুঁই আশ্রয়ের জন্য পথে পথে ঘুরে বিকেলে অসুস্থ হয়ে পড়লে ছেলেকে নিয়ে পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালে ভর্তি হয়। হাসপাতালে ভর্তি জুঁই পুলিশ স্বামী ও তার পরিবারের লোকজনের নির্যাতনে আজ পথে পথে আশ্রয়ের জন্য ঘুরছেন। জায়গা হয়নি দরিদ্র বাবার বাড়িতেও। স্বামী ও তার পরিবারের নির্যাতন থেকে মুক্তি চায় সে, চায় নিরাপদ আশ্রয়।

জুঁই বলেন, ”আমার স্বামী আর্মড পুলিশে চাকরি করে। সে এখন সৈয়দপুরে আছে। আমি অন্তঃস্বত্তা হয়ে পড়লে চাপে পড়ে সে আমাকে বিয়ে করে। কিন্তু আমাকে আজও স্ত্রীর মর্যাদা দেয়নি। এমনকি তার চাকরি বাঁচানোর জন্য আমাকে কাজী্র মাধ্যমে রেজিস্ট্রেশন করে বিয়ে করেনি। বিয়ের পর থেকেই আমার ওপর সে ও তার পরিবারের লোকজন নির্যাতন করতো। আমার স্বামী কর্মস্থলে থাকলে তার তিনভাই স্কুল শিক্ষক আব্দুল মালেক, তার স্ত্রী আম্বিয়া আক্তার সিমা, জিআরপি পুলিশের সদস্য আব্দুল খালেক, তার স্ত্রী তাসলিমা বেগম, আব্দুস সাত্তার ও তার স্ত্রী বন্যা আক্তার আমাকে প্রতিনিয়ত শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করতো। যেন আমি তাদের নির্যাতনে বাড়ি ছেড়ে চলে যাই। আমাকে ঘরের ভেতরে মাঝে মধ্যেই তালাবন্ধ করে রাখতো। আমাকে ও আমার সন্তানকে ঠিক মতো খেতে দিতো। এক কাপড়ে মাসের পর মাস থাকতে হতো। জন্মের পর থেকে আমার মেয়েকে আমি একটু ভাল খাবার মাছ, মাংস, ডিম খাওয়াতে পারিনি। ঘরের ভেতর রশি ও বিষ দিয়ে তারা আত্মহত্যা করতে বলতো। কয়েকবার তারা আমাকে মারধর করে বের করে দিয়েছে। বিচারের ভয়ে আবার বাড়িতে নিয়ে গেছে।

এই বয়সে আমি আমার সন্তানের দিকে চেয়ে সব নির্যাতন মুখ বুঝে সহ্য করেছি। গত ১৭ই মার্চ আমি আমার স্বামীর সাথে দেখা করার জন্য সৈয়দপুরে তার কর্মস্থলে যাওয়ার কারণে তারা আমাকে বাড়ি থেকে মারধর করে বের করে দেয়। পরে আমি আশ্রয় নেই আমার বাবার বাড়িতে। সেখানে বাবাও আমাকে মারধর করতো, বকাবকি করতো। সোমবার সকালে আমি আবার শ্বশুরবাড়িতে আশ্রয়ের জন্য গেলে আমাকে টেনে হিচড়ে বাড়ি থেকে বের করে দেয় তারা। আমি আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমার সন্তানের জন্য পারিনি। এখন আমার কোনও আশ্রয় নেই। কোথায় যাবো জানি না। আমি কি এই নির্যাতনের বিচার পাবো না?”

মন্তব্য করুন

সর্বশেষ নিউজ

আরো পড়ুন