রোববার, ৩১ মে ২০২০, ৫:৩৫ পিএম

নড়াইলের ইতিহাস ইতনার পরীর খাট

উজ্জ্বল রায়, নড়াইল জেলা প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: ৫:২১ অপরাহ্ন, ৪ মে ২০২০, সোমবার


নড়াইলের ইতিহাস ইতনার পরীর খাট

ইতনার পরীর খাট

নাটোরের মহারানী ভবানী ও নড়াইলের জমিদার নির্মাণের প্রস্তুতি। এখন শুধু ধৈর্য ধরে নাতনীর আবদার রক্ষা করা।কাজ শুরু হলো,একটানা কাজ করছে কাঠ মিস্ত্রি যে করেই হোক তৈরি করতেই হবেই পরীর খাট,কাজ শেষ হবার কোন লক্ষণ রানী ভবানী দেখতে পেল না,মনে হলো তাজমহল তৈরি হচ্ছে।শুধু টুকটাক হাতুড়ির শব্দ শোনা ছাড়া কিছুই নজরে এলো না।টানা আটটি বছর ধরে খাটের কাজ চললো ত্রিশজন মিস্ত্রি এই কাজ করলো।এক সময় রানীকে দেখানো হলো পরীর খাট।লক্ষণীয় হলো চারটি পরীর একই চেহারা,উচ্চতা,হাতের মাপ,পায়রে মাপ একই।

একটি কে সরিয়ে অন্যটি দেখলে একটাই মনে হবে। কি নিখুঁত কোকড়ানো চুলের বাহার, হাতের পিছনে পরীর পাখা, চোখের পাতা, হাতের নখ, পায়ের নখ, হাতে গাদা ফুল, কাপড়ের ডিজাইন দেখলে মনে হবে বর্তমান সময়ের আধুনিক ডিজাইনাররা এই পোষাকের ডিজাইন করেছে, একেবারেই আধুনিকতায় ভরপুর, অসাধারণ এক শিল্পকর্ম এটি, খাটটি জুড়ে দিলে কোন জোড়া খুঁজে পাওয়া মুশকিল, চারটি পরী হলো খাটের পায়া রানী ভবানীর পছন্দ হলো। সে নাতনীকে খাটটি উপহার দিল। কিংবদন্তি আছে ঐ মিস্ত্রিদের নাকি হাত কেটে ফেলেছিল যাতে করে আর এই ধরনের খাট তৈরি করতে না পারে, এই ঘটনা কতটুকু সত্য জানি না,বা এর কোন সাক্ষী তো আর বেঁচে নেই। এই খাটটি রানী ভবানীর ইচ্ছেতেই নাতির জন্য তৈরি করা হয়েছিল। রানী ভবানী চলে যায় দত্তক পুত্র রামকৃষ্ণের কাছে জমিদারি অর্পণ করে মুর্শিদাবাদ একমাত্র মেয়ের কাছে।ওয়ারেন হেস্টিংস জোর পূর্বক সকল সম্পদ জমিদারি কেড়ে নেন।

সুচতুর বুদ্ধিমান নড়াইলের জমিদার কালীশঙ্কর লর্ড কর্নওয়ালিসের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তিত হওয়ার ফলে নাটোরের বিশাল জমিদারি বাকী খাজনার দায়ে নিলামে বিক্রয় হতে থাকলে, কালীশঙ্কর সুকৌশলে নাটোরের বিশাল তালুক ও মহাল নিলামে ক্রয় করে পিতার ক্ষুদ্র জমিদারি বৃদ্ধি করেন।কালিশঙ্করের পিতা ছিলেন মুলত নড়াইল জমিদারের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা।তার নাম ছিল ‘রুপ রাম রায়’ তার নিজের যোগ্যতা বলে নাটোরের রাজ সরকারের উকিল রুপে রানী ভবানীর অনুগ্রহ লাভকরেন।নড়াইলের আলাদাৎপুর স্থানে তিনি বসতবাড়ি নির্মান করেন।এর অল্প দূরে চিত্রা নদীর পাড়ে গড়ে তোলেন একটি বাজার,যা নড়াইলের শ্রেষ্ঠ বাজার হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন।বাজারটির নাম রুপগঞ্জ বাজার।কালি শঙ্কর রায় পিতার মতোই নাটোরের রাজ সরকারের কর্মচারী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।নড়াইল মৌজায় তিনি বৃহত অট্টালিকা,নাট মন্দির সহ পুকুর খনন করেন।এক বিশাল রাজবাড়ি নির্মাণ করেন।রানী ভবানীর সম্পত্তি নিলামে কিনতে কিনতে কোন এক সুযোগে এই পরীর খাটটি কালীশঙ্কর নড়াইল তার রাজবাড়িতে নিয়ে আসেন।কালিশঙ্কর রায়ের শেষ জীবনে পুত্রদ্বয়ের মৃত্যু হলে পৌত্রগন পিতামহদের ঐতিহ্য বজায় রাখেন।তারাই এই অঞ্চলে নীল চাষের জন্য নীলকুঠি স্থাপন করে।যদিও এই নীলকুঠির কোন অস্তিত্ব এখন নাই।নড়াইল জমিদারগন নড়াইলের উন্নয়নের জন্য নড়াইল শহরের কেন্দ্র স্থলে একট পুকুর খনন করেন,যার নাম কালীশঙ্কর ট্যাঙ্ক।এই পুকুর পাড়েই নড়াইল পৌরসভা কার্যালয়।

নড়াইলের জমিদারেরা শিক্ষানুরাগী ছিলেন বলেই জমিদার রতন লালু মহারানী ভিক্টোরিয়ার নামে প্রতিষ্ঠা করেন ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুল।প্রতিষ্ঠা করেন খুলনা বিভাগের প্রাচীনতম কলেজ,রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় প্রাচীনতম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজ।১৮৬১ সালে মহকুমা সদর হিসেবে নড়াইল প্রতিষ্ঠি হয়।মহকুমা সদরের জন্য স্থান নির্বাচনের জন্য প্রথমে গোপালগঞ্জ, ভাটিয়াপাড়া, লোহাগড়া, সর্বশেষ মহিষখোলা আলাদাৎপুর মৌজায় নড়াইল সদর স্থাপিত হয়।উপরোক্ত ইতিহাস এই ‘পরীর খাটে’এর সঙ্গে জড়িত বলেই আপনাদের সামনে তুলে ধরতে হলো সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।

নড়াইলের কালীশঙ্করের জমিদারির প্রধান পন্ডিত ছিলেন শশিভূষন স্মৃতি রত্নের পুত্র বামন দাস বিদ্যাসাগর।আমি আগেই আপনাদের জানিয়েছিনড়াইলের জমিদারগন শিক্ষানুরাগী ছিলেন,সে কারনের তৎকলীন বামন দাস বিদ্যাসাগরের মতো জ্ঞানি ব্যক্তিকে প্রধান পন্ডিত করেছিলেন।ভারতবর্ষের জমিদারি যখন ব্রিটিশ সরকার বিলুপ্ত করে তখন এই ‘পরীর খাট’নড়াইলের জমিদার কালীশঙ্কর নাকি তার প্রধান পণ্ডিত বামন দাস বিদ্যাসাগরকে দান করে ছিলেন।সেই দান করা খাটটি বামন দাস বিদ্যাসাগরের তৃতীয় পুত্র লক্ষী নারায়ণ ভট্টাচার্য নড়াইল জমিদার বাড়ি থেকে ইতনা নিয়ে আসে, ইতনা বামন দাস বিদ্যাসাগরের নিজেদের বাড়ি বর্তমান ফাতেমা ম্যানসনে।কিন্তু দুঃখের বিষয় তারা খাটটি সেটিং করতে পারলেন না। এই সেটিং না করার ব্যাপারটি এরকম যখন নাটোরের মহারানী ভবানীর ওখান থেকে খাটটি আনা হয় তখন এর প্রতিটি সংযোগ স্থলের নাট, বোল্ড সে কাঠের হোক আর লোহার হোক হারিয়ে যায়।সে কারনে নড়াইলের জমিদার এবং বামন দাস বিদ্যাসাগরের পুত্র লক্ষী নারায়ণ ভট্টাচার্য এই খাটে ঘুমাতে পারেননি। ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে।

মন্তব্য করুন

সর্বশেষ নিউজ

আরো পড়ুন