শনিবার, ৩০ মে ২০২০, ২:৫৯ এএম

স্বাধীন গণমাধ্যমঃ সত্যপক্ষের নির্ভীক মুক্তকণ্ঠ..

:
প্রকাশিত: ২:০৩ অপরাহ্ন, ৩ মে ২০২০, রোববার


আজ ৩মে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস। ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ডে বা ‘বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস’ হিসেবে প্রতি বছর এই দিনে পালিত হয়।এবার এই দিবসের থিম ‘ভয় বা পক্ষবিহীন সাংবাদিকতা’ । ১৯৯১ সালে ইউনেস্কোর ২৬তম সাধারণ অধিবেশনের সুপারিশ অনুযায়ী ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘের সাধারণ সভায় ৩ মে কে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসের স্বীকৃতি দেয়া হয়।তারপর থেকে বিশ্বব্যাপী গণমাধ্যম কর্মীরা এ দিবসটি উদযাপন করে আসছেন।
সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার স্বাধীনতা এবং মুক্ত গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠার মৌলিক নীতিমালা অনুসরণ, বিশ্বব্যাপী গণমাধ্যমের স্বাধীনতার মূল্যায়ন, স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ প্রতিহত করার অঙ্গিকারের পাশাপাশি ব্রতী-আত্মদানকারী সাংবাদিকদের স্মরণ ও তাদের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানানো হয় এই দিবস উদযাপনের মাধ্যমে। ‘সমাজের আয়না, জাতির বিবেক, চতুর্থ স্তম্ভ, ওয়াচডগ- প্রভৃতি অভিধায় অভিষিক্ত গণমাধ্যম জগত।এইসব অভিধার বাস্তবরূপ কতটা দৃশ্যমান, তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও এক্ষেত্রে সমাজ-বাস্তবতা, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট, বিরাজমান বিভিন্ন অনুষঙ্গের দায়কেও উপেক্ষা করা যায় না। তবে, গণমাধ্যমের উৎপত্তি ও বিকাশের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের দিকে দৃষ্টি দিলে বলতে হবে, গণমানুষের সার্বিক কল্যাণের জন্যই গণমাধ্যমের ঐতিহাসিক অভিযাত্রা।
সবশেষ গণমাধ্যম গণমানুষের বন্ধু। অসহায় মানুষের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, যন্ত্রণা, হতাশা, দুর্দশা, অসাম্য প্রভৃতি বিষয় তুলে ধরে সমাধানের পথ ত্বরান্বিত করে গণমাধ্যম।দুর্নীতি, অপরাধ, অনাচার, অবিচার তথা সমাজের নেতিবাচক দিকগুলোর বিরুদ্ধেও থাকে সোচ্চার।সোচ্চার আওয়াজের মাধ্যমে মানুষকে সংশোধনের পথ বাতলে দিয়ে একটি সুন্দর, নৈতিক ও মানবিক পৃথিবী গড়ে তুলতে পারাই গণমাধ্যমের অন্যতম লক্ষ্য। একমাত্র স্বাধীন গণমাধ্যমই এই লক্ষ্য পূরণে যথযথ ভূমিকা রাখতে পারে।
সূচকটি “করোনাভাইরাস মহামারীর প্রতিক্রিয়া হিসাবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার দমন এবং সূচকে একটি দেশের র‌্যাঙ্কিংয়ের মধ্যে স্পষ্ট সম্পর্ক প্রকাশ করে। সূচকের ১৮০ টি দেশ ও অঞ্চলগুলির মধ্যে ইরান তাদের করোনভাইরাস প্রাদুর্ভাবকে ব্যাপকভাবে সেন্সর করেছে। ইরাক রয়টার্সকে করোনা সংক্রান্ত একটি নিবন্ধের জন্য শাস্তি দিয়েছিল যা মহামারী সম্পর্কিত বিষয়ে অফিসিয়াল ব্যক্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল। এবং হাঙ্গেরি সদ্য বাধ্যবাধকতাপূর্ণ করোনাভাইরাস আইন পাস করেছে।যা প্রেসের স্বাধীনতা দমনে ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে। প্রেসের স্বাধীনতা দমনের দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকি করোনার মহামারী দ্বারা প্রকাশিত হয়েছে।যেহেতু অভূতপূর্ব অনুপাতের অর্থনৈতিক সঙ্কটের মধ্যে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে, স্বচ্ছ প্রতিবেদনের প্রচার তাই বৈশ্বিক প্রয়োজনীয়তা। ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্স বলছে যে, উত্তর থেকে দক্ষিণে সাংবাদিকদের নিপীড়নের যে চিত্র ফুটে উঠেছে এবং একটি মহামারী তার নিজের ডানায় উদ্ভাসিত বলে মনে হচ্ছে। মায়ানমারে, ভয়েস অফ মিয়ানমারের সম্পাদককে সম্প্রতি গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের জন্য লড়াই করা এক বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান সেনাবাহিনীর প্রতিনিধির সাক্ষাত্কারের জন্য সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ আনা হয়। এমনকি বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী গণতন্ত্রের রাষ্ট্রপতিও প্রেসকে ‘জনগণের শত্রু’ হিসাবে বর্ণনা করেছেন। গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ দাবিদার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমের চরম বিষোদগার করেছেন। গণমাধ্যম নিয়ে টুইটারে আক্রমণাত্মক মন্তব্য করেছেন। রোহিঙ্গা নির্যাতন নিয়ে প্রতিবেদন করায় মিয়ানমারের দুই সাংবাদিককে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে বেশি নির্মম ও জঘন্যতম ঘটনা ছিল, সৌদি দূতাবাসের ভেতরে সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ড। এ হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ উঠেছে। সারাবিশ্বে এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার রেশ না কাটতেই গ্রেফতার হলেন জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ। ফলে সারাবিশ্বে মুক্তিকামী মানুষের মধ্যে বিরাজমান উৎকণ্ঠাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এ ছাড়া আফগানিস্তান, সিরিয়াসহ বিভিন্ন দেশে অনেক সাংবাদিক হত্যার শিকার হয়েছেন। এসব ঘটনা বৈশ্বেক প্রেক্ষাপটে গণমাধ্যমের নাজুক পরিস্থিতি তুলে ধরে। শেষ পর্যন্ত, সমন্বিত বৈশ্বিক প্রচেষ্টা, জনসচেতনতা এবং আরও সমালোচনামূলক বিশ্বের দীর্ঘমেয়াদী সুবিধার দিকে মনোনিবেশের মাধ্যমে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা প্রদান আবশ্যক।
এ বছরের বিশ্ব প্রেস স্বাধীনতা দিবসটির লক্ষ্য “সাংবাদিকতা বিনা ভয় বা অনুকূলতা” শীর্ষক থিমের আওতায় ঠিক করা।যা সাংবাদিকদের সুরক্ষা, রাজনৈতিক বা বাণিজ্যিক প্রভাব থেকে তাদের স্বাধীনতা এবং গণমাধ্যমের সকল ক্ষেত্রে লিঙ্গ সমতা সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট বিষয়ে সচেতনতার দাবি জানায়। অ্যালবার্ট ক্যামাসের ভাষায়, ‘ স্বাধীনতা ছাড়া প্রেস কখনও খারাপ ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না।’
প্রেক্ষাপতঃ প্রেক্ষাপটঃ বাংলাদেশ
দুর্ভাগ্যজনক সত্যি হচ্ছে- বাংলাদেশে মুক্ত ও স্বাধীন গণমাধ্যমের প্রধান অন্তরায় পেশি ও রাজনৈতিকশক্তি আর কালোটাকা। এর বাইরে, স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মুক্ত গণমাধ্যম বিকাশে অন্যতম অরেকটি বাধা হচ্ছে, আইন-কানুন ও বিধি-বিধান ডিঙ্গিয়ে বা চাপা দিয়ে গণমাধ্যম কর্মিদের অহরহ চাকরিচ্যুতির ঘটনা।
বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ আরও বলেন, এই দিনটিতে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা এবং মুক্ত গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠার মৌলিক নীতিমালা অনুসরণ করা হয়ে থাকে। অথচ, দুর্ভাগ্য হলো- দেশে এবার করোনা দুর্যোগের এই কঠিন সময়েও বহু সংবাদমাধ্যমে নিয়মিত বেতন-ভাতা দেওয় হচ্ছে না। উপরন্তু চলছে, সাংবাদিক ও কর্মি ছাটাই।
সম্প্রতি সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ বলেন, ইতিমধ্যেই আলোকিত বাংলাদেশ, বার্তা সংস্থা ইউএনবি, গাজী টিভি এবং এসএটিভিসহ আরও কয়েকটি গণমাধ্যম থেকে শতাধিক সংবাদকর্মীকে ছাাঁটাই করা হয়েছে। করোনা মহামারির এই সময়ে গণমাধ্যম মালিকদের যেখানে সাংবাদিক-শ্রমিক-কর্মচারিদের প্রতি আরো বেশী মানবিক ও সদয় আচরণ করা দরকার, সেখানে তারা অমানবিক হয়ে উঠছেন। নেতৃবৃন্দ বলেন, অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে, মালিকরা যেন করোনা মহামারিকে একটা সুযোগ হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে ঢালাও ছাঁটায়ের মহোৎসবে মেতেছেন।তারা অবিলম্বে ছাঁটাইকৃতদের পূর্নবহালে দাবি জানান।
নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার ও সরকারের গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার অপরিহার্য নিয়ামক গণমাধ্যমের অবাধ ও মুক্ত ভূমিকা পালনে সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিতকরনে সরকারের প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল-বাংলাদেশ (টিআইবি)। বিশেষ করে কভিড-১৯ উদ্ভূত জাতীয় দুর্যোগ মোকাবেলায় নাগরিকদের তথ্যপ্রাপ্তি ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে অবাধ তথ্য প্রবাহ নিশ্চিতে সংকটকালীন সময়ে গণমাধ্যমকর্মীদের পেশাগত ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার পাশাপাশি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানসমূহ সচল রাখা নিশ্চিতকরণে সরকারসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের তাগিদ জানায় টিআইবি।
৩ মে জাতিসংঘ ঘোষিত বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস ২০২০ উপলক্ষে
প্রকাশিত এক সংবাদ বিবৃতিতে কভিড-১৯ সংকট মোকাবেলায় ত্রাণ বিতরণে জনপ্রতিনিধি ও অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের একাংশের দুর্নীতি ও তার সাথে অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীবাহিনীর একাংশের সংশ্লিষ্টতার সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশে গণমাধ্যমকর্মীদের বিভিন্নভাবে বাধা, হয়রানি ও নির্যাতন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের যথেচ্ছ অপপ্রয়োগের মাধ্যমে গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে নিবর্তনমূলক নজরদারি প্রতিষ্ঠার অপচেষ্টা, হুমকি-ধামকির মাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ থেকে বিরত রাখা ও সাংবাদিকদের সেল্ফসেন্সরশিপে বাধ্য করার প্রয়াসে গভীর হতাশা ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। টিআইবির মতে, চলমান দুর্যোগের কার্যকর মোকাবেলার স্বার্থে এ আত্মঘাতী চর্চাসমূহ অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। একইসাথে নৈতিকতা, বস্তুনিষ্ঠতা, নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে সকল গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ও কর্মীদের দায়িত্ব পালন করার আহ্বান জানায় টিআইবি।
বিদ্যমান বাস্তবতায় আমাদের গণমাধ্যম বহুমাত্রিকতাপূর্ণ অর্জনও কম নয়। এগিয়েছে বহুদুর। তবে এই এগিয়ে যাওয়ার পথ কণ্টকাকীর্ণ সংগ্রামের ইতিহাস। এখনো পেশাগতভাবে এবং শিল্প প্রতিষ্ঠান হিসেবে মৌলিকভাবে দাঁড়াতে রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা অনুপস্থিত। স্বাধীন পেশায় পরাধীনতার ঝুঁকি আর সংকটে দিন গুনে সংবাদপত্রজীবীরা।করোনার মহামারীকাল তৈরি করেছে জীবন-জীবিকার চরম অনিশ্চয়তা।আর মুক্ত গণমাধ্যমের অর্থে যে বাক ও লেখনীর স্বাধীনতা তা তো এখনও পশ্চাতে টেনে ধরে, টুটি চেপে ধরে সময় সময় এক নিকশ অন্ধকার। বোধ চেতন মনন আর সত্যের মুক্তি তো মুক্ত বিহঙ্গের মতো।সীমানাহীন, ভয়হীন,আগলহীন এবং মুক্ত কণ্ঠস্বর ।[গ্রন্থিত সমাচার]

স্বাধীন চৌধুরী: গণমাধ্যম, উন্নয়ন ও সংস্কৃতি সংগঠক।

মন্তব্য করুন

খবর অনুসন্ধান