মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২০, ৬:৩৯ পিএম

করোনা মহামারি তীব্র শোষণের কুৎসিত রূপ উন্মোচিত করেছে

:
প্রকাশিত: ৪:৪০ অপরাহ্ন, ১ মে ২০২০, শুক্রবার


করোনা মহামারি তীব্র শোষণের কুৎসিত রূপ উন্মোচিত করেছে

ছবি : সংগৃহীত ।

মহান মে দিবসের সংগ্রামী চেতনা এখনও শ্রমিক শ্রেণির প্রতিটি আন্দোলনের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক ও তাৎপর্যপূর্ণ। মে দিবসের চেতনায় আজও উদ্বুদ্ধ শ্রমিকশ্রেণি। কিন্তু সেই ঘটনার ১৩৪ বছর পরে আমাদের দেশের পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের উপর চলমান শোষণ-নির্যাতন যেন মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানায়। আজ সারা পৃথিবীব্যাপী চলমান মহামারিতে বাংলাদেশও এক আসন্ন মহাবিপর্যয় প্রত্যক্ষ করছে। ঠিক এই সময়েই আমাদের শ্রমিকদের উপর একের পর এক যে অন্যায় চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে তা নিকৃষ্ট ও নিষ্ঠুর জুলুম হিসেবে মানুষ স্মরণ রাখবে। এই শিল্পে অতি মুনাফালোভী মালিকদের শোষণ-বঞ্চনা অবহেলার ফলে শ্রমিকদের প্রায়ই জীবন দিতে হয়। এ যাবৎকালে অর্ধশতাধিক কারখানায় প্রায় তিন হাজার শ্রমিক অগ্নিদগ্ধ হয়ে এবং ভবনচাপা পড়ে মারা গেছেন। তার সাক্ষী হিসেবে রানা প্লাজা, তাজরীন, স্পেকট্রাম, কেটিএস কারখানাসহ অসংখ্য মর্মান্তিক দৃষ্টান্ত উল্লেখ করা যায়। এই দেশের গার্মেন্ট শিল্প যে তীব্র শ্রম শোষণের উপর দাঁড়িয়ে আছে তার কুৎসিত চেহারা এই করোনা মহামারি খুলে দিয়েছে। এই মে দিবসে এটাই শ্রমিকদের পর্যবেক্ষণ।

তিন দশকের বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা পোশাক শিল্পের যে সাফল্য ও শ্রেষ্ঠত্বের কথা আজ ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয় তার পেছনের ইতিহাস আসলে কী? কৃতিত্বের গৌরবটাই বা কার? এই ইতিহাস তীব্র শ্রম শোষণের ইতিহাস, যে কথা সাধারণত বলা হয় না। যে শ্রমিকদের অতি সস্তা শ্রমে এ শিল্প এতোদূর এলো, যাদের সীমাহীন আত্মত্যাগে অর্থনৈতিক উন্নয়নের এতো বাহাদুরি, কৃতিত্বের মালা তাদের গলায় কখনোই জোটে না। আমাদের দেশের অধিকাংশ মালিক মনে করেন, তাদের বিশেষ ক্যারিশমা দিয়ে তারা পোশাক শিল্পকে আজকের এই গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে এসেছেন। তারা এই খাতের প্রায় ৫০ লাখ পোশাক শ্রমিকের অবদান এবং জনগণের টাকায় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাসহ অন্যান্য সুবিধা ও আনুকূল্যকে অস্বীকার করে থাকেন।

আমাদের পোশাক শিল্পের বিকাশের পেছনে রয়েছে শ্রমিকের সস্তা শ্রম। এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে শ্রমিকের লাশ, রক্ত, স্বজন হারানোর বেদনা, অসংখ্য মানুষের কান্না আর আহাজারি। এর কোনোটিকেই আমরা অস্বীকার করতে পারি না। আজ বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প একটি শক্তিশালী অবস্থান করে নিয়েছে। শুধু তাই-ই নয়, কয়েক দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তিতেও পরিণত হয়েছেন পোশাক শিল্পের শ্রমিকেরাই। অথচ এই শ্রমিকরা যখনই কোনো ন্যায্য দাবি উত্থাপন করে, তখনই সবাই মিলে গেলো গেলো একটা রব তোলা হয়। গার্মেন্ট শিল্পের ‘ক্রয় আদেশ অন্য দেশে চলে যাবে’ এই জুজুর ভয়কে শ্রমিক ঠকানোর প্রধান হাতিয়ারে পরিণত করা হয়েছে। দেশি মালিক ও আন্তর্জাতিক বড় করপোরেট পুঁজির ক্রেতা গোষ্ঠীগুলো উভয়েই আজ বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের অমানবিক এবং মানবেতর জীবনের জন্য দায়ী। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় সবচেয়ে কম মজুরিতে পোশাক শ্রমিকরা বাংলাদেশে তাদের শ্রম বিক্রি করতে বাধ্য হন। এই বৈশ্বিক মহামারিতেও আমরা দেখলাম, পরিস্থিতির একেবারে শুরুতেই সব শেষ হয়ে গেছে এমন একটা ভাব তৈরি করলেন আমাদের মালিকরা। তারা অর্ডার বাতিল-স্থগিত, কাজ নেই ইত্যাদি কথা বলে সরকারের সঙ্গে বড় আর্থিক প্রণোদনা আদায়ের দেন দরবার শুরু করলেন। তারা বলতে থাকলেন, এই পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের মজুরি দেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় করা শিল্প একটা জরুরি পরিস্থিতিতে একমাস শ্রমিকের বেতন দিতে পারে না এই অবিশ্বাস্য ঘটনাও আমাদের দেখতে হলো। আমরা দেখলাম যে মার্চ মাসে শ্রমিকরা কাজ করলো সেই মাসের বেতনটাও অধিকাংশ মালিক যথাসময়ে পরিশোধ না করে শ্রমিকদের রাস্তায় নামতে বাধ্য করলো। ব্যাপক সংক্রমণ ঝুঁকি মাথায় নিয়ে প্রতিদিন কোথাও না কোথাও শ্রমিকদের রাস্তায় নামতে হয়েছে।

আমরা দেখেছি, যেই মালিকরা কাজ নেই কাজ নেই বলে মার্চ মাসের শেষে টিভি, পত্র-পত্রিকা ও বিভিন্ন দরবারে কেঁদে বেড়ালেন তারাই ব্যাপক কমিউনিটি সংক্রমণ প্রতিরোধে সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটি ভেঙে কারখানা চালানোর জন্য পাগলপ্রায় অস্থির হয়ে উঠলেন। ফলাফল লকডাউন, পরিবহন বন্ধের মধ্যেও শত কিলোমিটার পায়ে হেঁটে লাখ লাখ শ্রমিককে ফিরতে হলো। এ ঘটনায় সরকারও কোনোভাবেই দায় এড়াতে পারে না। প্রথমত গণপরিবহন বন্ধ না করে, কার্যকর একটা লকডাউন নিশ্চিত না করে সাধারণ ছুটি দিয়ে দেওয়া এবং দ্বিতীয়ত এপ্রিলের শুরুতে সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রীর কারখানা খোলার ঘোষণা। সেই ঘটনায় শুধু গার্মেন্ট শ্রমিকরাই নয় সারাদেশের মানুষ সংক্রমণ ঝুঁকিতে পড়েছে। দেশের দুর্ভাগ্য মালিকরা এই মহামারির সুযোগ নিয়ে ব্যাপক ছাঁটাই, চাকরিচ্যুতি ঘটিয়েছে। এ সময়ে মালিকরা সরকারের কাছ থেকে বড় বেল-আউট আদায়ের দরকষাকষির কৌশল হিসেবে শ্রমিকদের জিম্মিদশায় ফেলেছে। যার প্রেক্ষিতে সরকার শ্রমিকদের মজুরি বাবদ ইতোমধ্যে ৫ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। ব্যাপকভাবে যাতে সংক্রমণ না ঘটে সেজন্য সরকারই দেশব্যাপী সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে। তারপরও এখন সরকারিভাবে ঘোষণা এসেছে শ্রমিকদের বেতনের ৪০ শতাংশ কেটে রাখা হবে।

যে শ্রমিকদের হাড়ভাঙা শ্রমে ৩৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি হয়। যাদের রক্ত পানি করা উপার্জনে আমলা ও মন্ত্রীদের বেতন, গাড়ির তেল, আয়েশি জীবন, আর মালিকদের এতো ভোগবিলাস তারা এমনিতেই মজুরি পায় যৎসামান্য। সেই মজুরি দিয়ে কোনোভাবেই তাদের জীবন চলে না। আজ এই মহাবিপর্যয়ের দিনে আর কারও বেতন কম দিতে হচ্ছে না, শুধু এই শ্রমিকের বেতনটাই কেটে নিতে হবে। এটা সাক্ষাৎ বর্বরতা। দেশে সংক্রমণের হার এখন উপরের দিকে উঠছে। এই অবস্থাতেই শ্রমিকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজে যোগ দিতে বাধ্য হচ্ছে। সামনে আমাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে, কে জানে? এই ১৩৪ বছর পরে আজকের মে দিবসে এদেশের শ্রমিকের জন্য দুটি শব্দই শুধু সত্য মনে হয় ‘ক্ষুধা’ আর ‘মৃত্যু’। এই দুইয়ের মধ্যেই কোনোমতে বেঁচে থাকাটাই শ্রমিকের সংগ্রাম। যে সংগ্রামের নেতা অগাস্ট স্পাইস সেদিন ফাঁসির মঞ্চ থেকে দৃঢ়চিত্তে বলেছিলেন, ‘তোমরা আমাদের যে কণ্ঠকে স্তব্ধ করতে চাও, এমন একদিন আসবে যেদিন এই নীরবতা তার চেয়েও শক্তিশালী হয়ে উঠবে’। শ্রমিকের এই সংগ্রাম কি আশ্চর্য এক স্ফুলিঙ্গ, কোনোদিন নেভে না।

জলি তালুকদার,সাধারণ সম্পাদক, গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র ।

মন্তব্য করুন

খবর অনুসন্ধান

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১

সর্বশেষ নিউজ

আরো পড়ুন

Shares