মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২০, ৬:২৯ পিএম

পুলিশ থেকে মানুষ -মাহমুদুল হাসান রতন

:
প্রকাশিত: ১০:১১ পূর্বাহ্ন, ১২ এপ্রিল ২০২০, রোববার


অতীতের গ্লানিমাখা চরিত্র পরিস্ফুটন করে সময়ের আলোকে নিজেদের শোধরে নিচ্ছে মানুষবেস্টিত পুলিশ। অতীতের আধার কেটে সত্যিই বুঝি তারা মানুষ হচ্ছে ভাবা যায়। বর্তমান সময়ে বিশ্বব্যাপী করোনা তাদের পুলিশ থেকে মানুষ হিসেবে গড়ে দিয়েছে। দিয়েছে নতুন একটি পরিপূর্ন পরিচয় তারা মানুষ। বহু কষ্টে অর্জিত সোনার বাংলার সোনার মানুষই এখন তারা। দিন-রাত পরিশ্রম করে অসচেতনদের সচেতন করে গড়ে তোলার দায়িত্ব কাধেঁ নিয়ে র্নিঘুম রাত্রি পার করছেন আমাদের এই পুলিশ নামক মানুষগুলি। দেশ ও দেশের অতন্ত্রপ্রহরী হিসেবে মানুষকে ভালো ও সুস্থ থাকার লক্ষ্যে পরিশ্রম করে যাচ্ছেন তারা। বর্তমান সময়ের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত মানুষ তারা। নিজ দায়িত্বে মানুষকে ঘরে ফেরাচ্ছেন। অসহায়দের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছেন। মধ্যবিত্তদের ঘরে খাবার পৌছে দিচ্ছেন। উচ্চ বিত্তদের জীবনের নিরাপত্তা দিচ্ছেন। অথচ নিজেদের জীবনটাই দেশ ও দেশের মানুষের জন্য উৎস্বর্গ করে দিচ্ছেন এই পুলিশবাহিনী। তাদের কাজের মাধ্যমেই আজ তারা স্থান করে নিয়েছেন ১৭ কোটি মানুষের হৃদয়ে। দু-দিন আগেও যাদের দেখলে কেউ না কেউ ঘালি দিত, আজ তারাই তাদের প্রানের মানুষ হয়ে পাশে দাড়িয়েছে যোদ্ধা হিসেবে। একসময় যে পুলিশকে দেখলে মানুষ ঘৃনা করতো আজ তারা সাধারণ মানুষের কাছে ভালোবাসার ফুল হয়ে ফুটে উঠেছে। তাইতো স্বার্থক পুলিশ জনম, স্বার্থক বাঙালী।
ফেসবুকে একজন লিখেছেন ভালোবাসার প্রিয় পুলিশ বাহিনী- রাত সাড়ে ৩টা। হঠাৎ এক কল এলো আশরাফ আলী রোড থেকে। প্রসব বেদনা উঠেছে এক মহিলার। সঙ্গে অন্যান্য সমস্যাও। চিকিৎসা নিতে হবে, কিন্তু পাশে ডাক্তার নেই। হাসপাতালে নিতে হবে, কিন্তু রাস্তায় গাড়ি নেই। শেষে ফোন করে টিম কোতোয়ালিকে। কোনো অ্যাম্বুলেন্স না পেয়ে থানার টহল গাড়িই নিয়ে যান এএসআই আজিজুল ইসলাম ও সুকুমার। সেখানে গিয়েই দেখেন, রোগীর অবস্থা খারাপ। অজ্ঞান অবস্থা প্রায়। এতে কিছুটা ভড়কে যান তারা, অঘটন ঘটলে আবার পুলিশের দোষ ধরে। শেষে এই ‘ঝুঁকি’ মাথায় রেখেই হাসপাতালে ছোটেন। পুলিশকে দেখে একটু আন্তরিকতা বেশি দেখাতে পারে সে চিন্তা থেকে হাসপাতালে দৌড়ঝাঁপ করলেন নিজেরাই। ডাক্তার ডেকে, নার্স ডেকে নিশ্চিত করলেন তাৎক্ষণিক চিকিৎসার। অবশেষে তাদের সব উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা হাসিতে রূপ নিলো ফুটফুটে বাচ্চার কান্নার শব্দে। প্রায় তিন ঘণ্টার কষ্ট সার্থক হলো। মা-মেয়ে দুইজনই সুস্থ আছেন। আর হাসিতে আছি আমরা। ভালোবাসা প্রিয় টিম কোতোয়ালি’।
অসহায় ও এতিমদের মধ্যে খাদ্যপণ্য বিতরণ করে অনুকরণীয় এবং বিরল দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করছেন সারাদেশের পুলিশবাহিনী। করোনার ভয়ালথাবার আশঙ্কায় দেশ যখন টালমাটাল ঠিক তখনই মানুষের জন্য এগিয়ে এসেছেন সারাদেশের মত ময়মনসিংহ জেলা পুলিশ। তারা অসহায় এবং ক্ষুধার্ত মানুষের হাতে খাদ্যপণ্য তুলে দেওয়ার পাশাপাশি জনসচেতনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিদিন সকাল থেকে মধ্য রাত পর্যন্ত সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।
ময়মনসিংহের প্রতিটি উপজেলায় পুলিশের পক্ষ থেকে অসহায়দের মধ্যে খাদ্যপণ্য এবং মাস্ক বিতরণ করা হচ্ছে। পুলিশ সুপার মোহাঃ আহমার উজ্জামানের নির্দেশনায় ১৪টি থানার অফিসার ইনচার্জগন (ওসি) নিজ এলাকায় সামাজিক দায়িত্ব পালন করছেন। এতে পুলিশের প্রতি ময়মনসিংহসহ দেশবাসীর ধারণা পাল্টে যাচ্ছে। তাইতো এখন স্লোগান উঠেছে পুলিশ এখন মানুষে পরিনত হয়েছেন।
নারায়ণগঞ্জের মেয়র সেলিনা হায়াত আইভীর বাড়ির পাশে গিটারিস্ট হিরো লিসানের লাশ পড়ে থাকার খবরটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নিউজ ফিডে ঘুরে ফিরে আসছে। ঠান্ডা, জ্বর, শ^াসকষ্টে গত সাত এপ্রিল ভোররাতে হিরোর মৃত্যু হয়। ভোরেই হিরোর বাড়ি দেওভোগ কৃষ্ণচূড়া এলাকা থেকে মরদেহ একটি এ্যাম্বুলেন্সে নিয়ে যাওয়ার সময় এলাকাবাসী বাধার মুখে পড়ে চালক মরদেহ ফেলে রেখে চলে যায়। এসময় পরিবারের লোকও কাছে আসেনি। পরে পুলিশ খবর পেয়ে মরদেহটিকে দাফন করেছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক ছবি ভাইরাল হয়েছে। রাজধানীর তালতলা কবরস্থানে পুলিশ সদস্যরা কবর খুঁড়ছেন। তারাই জানাজা পড়ছেন। তারাই দাফন করছেন। করোনাভাইরাসে মৃত ব্যক্তির লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর না করে প্রশাসন থেকেই দাফন করা হচ্ছে। বিশ^স্বাস্থ্য সংস্থার গাইড লাইন অনুযায়ী আইইডিসিআর বিষয়টির তত্ত্বাবধান করছে।
এখন পুলিশের উদারতার এমন হাজারো ঘটনা মিলছে। এইসব ঘটনা একটি বিষয় চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় আমরা কি একটু বেশি অমানবিক আচরণ করছি না। হার্ট এ্যাটাকের রোগীর তো শ্বাসকষ্ট হতেই পারে। তাই বলে কি তার সাহায্যে কারও এগিয়ে যাওয়া উচিত ছিল না! এতদিন যারা পুলিশকে বলে এসেছেন আপনারা তো মানুষ নয় পুলিশ। বাক্যটি শুনতে কেমন গালির মতো শোনালেও সেই পুলিশই এখন দিন রাত মানুষের সেবা করছে। অমানবিক মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে মানবিক পুলিশ। সময়ের বৈরিতাকে যিনি ভয় না পেয়ে সেবার হাত প্রসারিত করেন তিনিই আসলে মানবিক।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চিকিৎসকদের উদ্দ্যেশে বলেছেন, যাদের মানবিকতা নেই তাদের দিয়ে আসলে কিছু হবে না। হওয়া সম্ভবও নয়। জোর করে কোন কিছু হয় না। ঠিক এর বিপরীত চিত্র পুলিশের মধ্যে। রাজধানী তো বটেই সারাদেশে পুলিশ এখন খাবার না থাকলে খাবার কিনে দিচ্ছে। প্রয়োজনীয় ওষুধ ফুরিয়ে গেলেও ফোন করলে দিয়ে যাচ্ছে।
কেউ কেউ বলছেন জাতির পিতার জন্মশতবর্ষে পুলিশের স্লোগান ছিল ‘মুজিব বর্ষের অঙ্গীকার পুলিশ হবে জনতার’। এই স্লোগানটি সত্যি সত্যি পুলিশেরই হয়ে রইলো। পুলিশ এখন জনতার পুলিশেই পরিণত হলো। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হতো পুলিশ জনগণের বন্ধু। তবে কিছু বিপথগামী মানুষের জন্য এই বন্ধুত্বে যে ছেদ পড়েছিল পুলিশ তা এবার ঝালাই করে নিয়েছে। এই বিপদের দিনে মানুষ বুঝতে পেরেছে পুলিশের চেয়ে ভাল বন্ধু আর নেই।
বছর কয়েক আগে কোলকাতা পুলিশের একটি উদ্যোগ আলোচনায় এসেছিল। নগরের নিঃসঙ্গ বয়স্ক মানুষদের জন্য এই সেবা চালু করেছিল তারা। নিঃসঙ্গতা অনুভব করলে পুলিশে ফোন করবেন বয়স্ক ব্যক্তিরা। একজন পুলিশ সদস্য সেই ব্যক্তির বাড়ি যাবেন। তাকে সঙ্গ দেয়ার পশাপাশি তার ওষুধ এবং প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে দিয়ে আসবেন। আমাদের এখানেও স্বেচ্ছায় যেসব সদস্য এমন সেবা দিতে চান তাদের বাছাই করে এমন মানবিক উদ্যোগ নিতে পারে পুলিশ। এতে সারাদিন কেবল অপরাধীর সঙ্গে থাকার এক ঘেয়েমি কেটে যাবে। আবার বিষয়টি অন্যভাবে দেখলে শহরে অপরাধ কমে গেলে পুলিশের কাজও কমে যায়। যে সময়টা তারা অপরাধীদের পেছনে ব্যয় করত সেই সময়টি তারা মানুষের কল্যাণে ব্যয় করতে পারে।
পুলিশের রয়েছে পেশাদারিত্বের ঘাটতি আর ক্ষমতার অপব্যবহার। নিয়োগ পদোন্নতি বদলীতে পেশাদারিত্বের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো রাজনৈতিক প্রভাব ছিল প্রকট। যা অনেকটাই লাঘবের পথে। একটা সময় আতঙ্কের নাম ছিল পুলিশ। আস্থার চেয়ে অনাস্থাই বেশি ছিল। পুলিশ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের নেতিবাচক ধারণা বদলে যাবে এমনটাই প্রত্যাশা আগামীর?
লেখক: সম্পাদক, প্রতিদিনের কাগজ। 

মন্তব্য করুন

খবর অনুসন্ধান

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১

সর্বশেষ নিউজ

আরো পড়ুন

Shares