বুধবার, ৮ জুলাই ২০২০, ২:৩৭ পিএম

শুধু তাজমহলই নয় আগ্রায় রয়েছে বিস্ময়কর সব স্থাপনা

আফরিন রিমী :
প্রকাশিত: ১০:১১ অপরাহ্ন, ৮ ফেব্রুয়ারী ২০২০, শনিবার


শুধু তাজমহলই নয় আগ্রায় রয়েছে বিস্ময়কর সব স্থাপনা

ভারতের বৃহত্তম পর্যটন কেন্দ্র কোনটি? না ভেবেই নিশ্চয় আপনি উত্তর দিবেন আগ্রা। বেশিরভাগ বিদেশি দর্শকই আগ্রার তাজমহল দেখে খুশি মনে বাড়ি ফিরে। তবে তাজমহল ছাড়াও যে ভারতে দর্শনীয় স্থানের অভাব নেই সেকথা কি কারো জানা আছে?

ভারতে এমন সব নিদর্শন রয়েছে যা আপনার চোখকে ছানাবড়া করে তুলবে! সেইসঙ্গে এসব স্থানের ইতিহাসও আপনাকে চমকে দেবে বৈ-কি। এই ধরুন, আগ্রা মুঘল সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল। এটি মুঘল এবং মারাঠাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক দুর্গ। ঐতিহাসিক আগ্রার ইতিহাস অনেক। তেমনই কয়েকটি স্থান সম্পর্কে জেনে নিন-

জ্যাকবের ছত্রী
জ্যাকবের ছত্রী

জ্যাকবের ছত্রী

বেশিরভাগ লোকেরা আগ্রাকে মুঘল শহর হিসেবে মনে করেন। তবে এ শহরের মোট জনসংখ্যার মধ্যে আর্মেনিয়ানরাও ছিল অনাকাংশে। প্রকৃতপক্ষে ভারতের আগ্রাতেই আর্মেনিয়ানরা প্রথম উপনিবেশ গড়ে তোলে। পরবর্তীতে, সম্রাট আকবর আর্মেনিয়ান এক নারীকে বিয়েও করেছিলেন। আব্দুল হাই নামের এক আর্মেনিয়ানকে সম্রাট প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত করেছিলেন। এমনকি পরিবারিক চিকিৎসক হিসেবেও আকবরের প্রাসাদে ঠাঁই পেয়েছিলেন আর্মেনিয়ান এক নারী।

আগ্রার আর্মেনিয়ান বাসিন্দাদের মধ্যে ছিলেন মেজর জন জ্যাকব। তার পরিবার ১৮৫০ সালে আগ্রায় চলে আসেন। সাত বছর পর আগ্রার শাহগঞ্জ এলাকায় বিদ্রোহের সময় তিনি নিহত হন। উইলিয়াম ডার্লিম্পল তার বই ‘হোয়াইট মুঘলস’ এ ইউরোপীয়দের সম্পর্কে অনেক কিছু লিখেন। সেখানেই উঠে এসেছিল জ্যাকবের সমাধির স্থাপত্যশৈলীর কথা। জ্যাকবের বাড়িটিকেই জ্যাকব ছত্রী বলা হয়। যা এখন কটেজ ইন্ডাস্ট্রি কমপ্লেক্সের অভ্যন্তরে অবস্থিত। মেজর জন জ্যাকব এর সমাধি সংলগ্ন বাড়িটি এখন শো-রুম হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

জামে মসজিদ
জামে মসজিদ

জামে মসজিদ 

মুঘল সম্রাট শাহজাহানের নির্দেশে ১৬৪০ খ্রিস্টাব্দে আগ্রার জামে মসজিদ নির্মিত হয়। তিন গম্বুজবিশিষ্ট এই মসজিদটি অনেকটা আঁকাবাকা ধাঁচের। যা বেলে এবং মার্বেল পাথর দ্বারা তৈরি করা হয়। তাজমহলের মতোই মসজিদের কেন্দ্রীয় খিলানের তিন দিকে ইসলামিক শিল্পকর্ম রয়েছে। মসজিদটির পশ্চিমে নামাজের স্থান, লাইব্রেরি ও তিনটি টেবিল রয়েছে। এর পাশেই একটি উন্মুক্ত স্থান ও একটি পুল রয়েছে। যা ওজুখানা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তাজমহলের সঙ্গে এর অনেকটাই মিল রয়েছে।

যশবন্ত সিংহের স্থাপত্য
যশবন্ত সিংহের স্থাপত্য

যশবন্ত সিংহের স্থাপত্য

আগ্রা শহরের কয়েকটি হিন্দু স্মৃতিস্তম্ভের মধ্যে যশবন্ত সিংহের স্থাপত্য বেশ জনপ্রিয়। এটি অনেকটা মুগল সমাধি উদ্যানগুলোর মতো দেখতে। যমুনা নদীর তীরে অবস্থিত এই নিদর্শনটি। সেখানেই অমর সিং রাঠোরের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া করা হয়েছিল। শাহজাহানের নির্দেশেই অমর সিংয়ের মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল। এরপর তার মরদেহ পরিবারের সদস্যরা যমুনার তীরে দাহ করেছিল। আর তখনকার সতীদাহ প্রথা অনুসারে তার বিধবা স্ত্রীকেও চিতায় তুলে দেয়া হয়। যশবন্ত সিংহের স্থাপত্যটি আয়তক্ষেত্রাকার। যিনি এটি নির্মাণ করেছিলেন তিনি শাহজাহানের অধীনেও কাজ করতেন।

মরিয়ম আল জামানির সমাধি
মরিয়ম আল জামানির সমাধি

মরিয়ম আল জামানির সমাধি

এই সমাধিটি সিকান্দ্রায় অবস্থিত। মরিয়ম আল জামানি ছিলেন আকবরের স্ত্রী এবং সম্রাট জাহাঙ্গীরের মা। মুঘল উদ্যানের ঠিক মাঝখানে লাল বেলে পাথরের এই সমাধিটি সবার নজর কাড়ে। অনেকের মতে, মরিয়ম ছিলেন আকবরের খ্রিস্টান স্ত্রী। আবার কিছু সংস্করণ অনুসারে, তিনি ছিলেন আর্মেনিয়ান। তবে এর কোনোটিরই প্রমাণ নেই। তিনি সম্ভবত হিন্দু এবং আম্বরের শাসক (জয়পুর) এর কন্যা ছিলেন।

কালের বিবর্তনে সমাধির মূল বেলে পাথরের শোভা অনেকটাই হারিয়েছে। সমাধির প্রতিটি পাশের খিলানযুক্ত প্রবেশদ্বারটি একটি গোলক ধাঁধায় পরিণত করে। যার কেন্দ্রস্থলে রয়েছে একটি সিঁড়ি। যেটি নীচ দিকে সমাধির দিকে নেমে গেছে। মরিয়ম আল জামানির সমাধির চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কয়েকটি মারাত্মক জরাজীর্ণ সমাধি রয়েছে। তবে সেগুলোর পরিচয় আজো মেলেনি।

চৌসথ খাম্বা
চৌসথ খাম্বা

চৌসথ খাম্বা

পিতা ও পুত্রের সমাধি রয়েছে স্থানটিতে। সাদা অষ্টভুজ সমাধিটি সাদিক খানের। যিনি আকবরের অন্যতম সেরা অফিসার ছিলেন। কথিত আছে, তিনি মোঘল সম্রাজ্ঞী নূরজাহানের পিতা ইটমাদ-উদ-দৌলার ভাগ্নে ছিলেন। এই সমাধিটি প্রাচীন মুঘল শৈলীতে নির্মিত। এর চারপাশে লাল বেলে পাথরের ৬৪টি পিলার রয়েছে। এজন্যই এর নাম হয়েছে চৌসথ খাম্বা। আর অন্য সমাধিটি সাদিক খানের পুত্র সালবাত খানের। যিনি মীর বকশী বা মুঘল সম্রাট শাহ জাহানের অধিনায়ক ছিলেন। তার অধীনে প্রায় ছয় হাজার লোক ছিল। কথিত আছে, সালবাত খানকে অমর সিং রাঠোর হত্যা করেছিলেন।

ঝুন ঝুন কাটোরা
ঝুন ঝুন কাটোরা

ঝুন ঝুন কাটোরা 

দেওয়ানি আদালত কমপ্লেক্সের অভ্যন্তরে অষ্টভুজাকার এই সমাধিটির দেখা মেলে। সেটি ঝুন ঝুন কাটোরা নামে পরিচিত। নামের আক্ষরিক অর্থে হুড়োহুড়ি বাটি। কিছু গ্রন্থে বলা হয়েছে, এটি মওলানা হাসানের সমাধি। যিনি ১৫৪৯ খ্রিস্টাব্দে মারা যান। আবার স্থানীয়দের মতে পানিবহনকারী এক ব্যক্তির সমাধি এটি। যিনি একসময় হুমায়ূনের জীবন রক্ষা করেছিলেন। আফগান প্রধান শেরশাহ সুরির যুদ্ধে হুমায়ুন পরাজিত হন।

অতঃপর তিনি সেনাবাহিনীর অবশিষ্টাংশ নিয়ে পিছু হটার সময় ঘোড়া পিছলে নদীতে পড়ে যান। তখন নিজাম নামের একজন পানিবহনকারী সম্রাটকে ডুবে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচান। এতে কৃতজ্ঞ হয়ে হুমায়ূন নিজামকে অর্ধ দিনের জন্য সম্রাট করে পুরস্কৃত করেছিলেন। সেই অর্ধদিনে নিজাম অনেক পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। এরমধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল চামড়া থেকে কয়েন তৈরি করা। স্থানীয়দের মুখে মুখে এ কথা প্রচলিত থাকলেও জোরালো কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।

এসব ঐতিহাসিক স্থান ছাড়াও পুরো আগ্রা জুড়ে আরো অনেক স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে। তবে অবহেলার কারণে অনেকগুলো তাদের অস্তিত্ব হারাতে বসেছে।

সূত্র: লাইভহিস্ট্রিইন্ডিয়া

মন্তব্য করুন

সর্বশেষ নিউজ

আরো পড়ুন