৮, এপ্রিল, ২০২০, বুধবার

নজরুলের স্নেহসিক্ত আব্বাসউদ্দীন -পীযূষ কুমার ভট্টাচার্য্য

:
প্রকাশিত: ১২:৩৮ অপরাহ্ন, ৩ ফেব্রুয়ারী ২০২০, সোমবার


কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) আব্বাসউদ্দীন আহমদ (১৯০১-১৯৫৯)-এর প্রাণ প্রতিম প্রিয় কবি। আব্বাসউদ্দীন হলেন নজরুলের স্নেহসিক্ত সজ্জন। কবি যখন বৃটিশ বিরোধী অসহযোগ আন্দোলনের উত্তাল তরঙ্গে আন্দোলিত, সেইসময় কিছুউদ্দীপনামুলক গান রচনা করেন। যেমন:‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’,‘ঘোরঘোর আমার সাধের চরকা ঘোর’, ‘কারার ঐ লৌহ কপাট’ প্রভৃতি। এ গানগুলো লেখার পরে নজরুলের যশ-খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। যেই সময় নজরুলের সাথে আব্বাসউদ্দীনের পরিচয় হয়, আব্বাসউদ্দীন তখন কুচবিহার কলেজে অধ্যয়নরত। তাঁদের শিক্ষাঙ্গনে (স্কুল ও কলেজ) প্রতি বছর মিলাদ হতো। সে মিলাদ মাহফিলে কবি একবার আমন্ত্রণ পেয়ে এসেছিলেন। তখন কবির সাথে আব্বাসউদ্দীনের পরিচয় হয়। নজরুল যখন আব্বাসউদ্দীনের গান শোনেন তখন তিনি তাঁকে উৎসাহ দিয়ে বলেন-‘সুন্দর মিষ্টি কণ্ঠ’, কলকাতায় চলো তোমার গান রেকর্ড করবো। আব্বাসউদ্দীন ১৯৩০ সালে কলকাতায় গিয়ে প্রথম গান রেকর্ড করে আবার ফিরে আসেন কুচবিহারে। ১৯৩১ সালে তিনি কলকাতায় গিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। কবি তাঁর স্নেহসিক্ত আব্বাসউদ্দীনকে কলকাতায় বাসিন্দা হওয়ার পরে বলেন-‘সবাই আমাকে কাজী সাহেব বলে, তুমি কিন্তু‘ কাজীদা বলে ডাকবে আমাকে।

গানের রেকর্ডিংয়ে আব্বাসউদ্দীন।
তথ্যসূত্র : আব্বাসউদ্দীন আহমদ: কাজীদার কথা, সুধিজনের দৃষ্টিতে নজরুল সঙ্গীত, পৃষ্ঠা. ২৪। আব্বাসউদ্দীন একদিন দেখেন যে, গ্রামোফোন কোম্পানির একটি ঘরে পিয়ারুকাওয়াল উর্দু কাওয়ালি গানের রিহার্সেল দিচ্ছেন। সেটি দেখে আব্বাসউদ্দীন কাজীদার কাছে প্রস্তাব রাখেন তাঁকে বাঙালি কাওয়ালি গান লিখে দেওয়ার জন্য। আব্বাসউদ্দীন যখন গ্রামোফোন কোম্পানির বাঙালি সাহেবকে তাঁর অভিপ্রায় (বাঙালিকাওয়ালি গান গাওয়ার জন্যে) প্রকাশ করেন, তখন বাঙালি সাহেব রাজী হন নি। তিনি বলেন-‘না না ও ধরনের বাংলা গান’ বিক্রি হবে না। কিন্ত‘ আব্বাসউদ্দীন কর্তৃকবাঙালি সাহেবকে তাঁর দেওয়া প্রস্তাব শেষ পর্যন্ত বিফল মনোরথে পর্যবসিত হয় নি। অবশেষে প্রায় এক বছর পরে বাঙালি সাহেব রাজী হন। আব্বাসউদ্দীন বাঙালি সাহেবরাজী হওয়ার কথা কাজীদাকে বলার সাথে সাথে তিনি আব্বাসউদ্দীনকে নিয়ে একটি কামরায় ঢুকে বললেন, ‘দরজা বন্ধ করে দিয়ে চুপ করে বসে থাকো’। ঠিক ১৫-২০ মিনিটের মধ্যে ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ -এই গানটি লিখে ফেললেন। নজরুল আব্বাসউদ্দীনকে তখনই সুর সংযোগ করে এই গানটি শিখিয়ে দিলেন। তিনি আব্বাসউদ্দীনকে বললেন, ‘কাল এসো, রেকর্ডের অপর পৃষ্ঠার জন্য আরও একটি গান লিখে দেবো’। পরদিন লিখলেন, ‘ইসলামের ঐ সওদা নিয়ে এলো নবীন সওদাগর’। নজরুল সুর সংযোগ করে আব্বাসউদ্দীনকে গানটি শিখিয়ে দিলেন। আব্বাসউদ্দীন উল্লিখিত গান দুটো পরে রেকর্ড করলেন। গানগুলো বাংলার আকাশে-বাতাসে তুললো এক নব আলোড়ন। আব্বাসউদ্দীন অনন্য মনীষার লোকশিল্পী বটে। এছাড়াও নজরুল সঙ্গীতে তাঁর অনবদ্য অবদান রয়েছে। পাশাপাশি তিনি তাঁর সু-কণ্ঠে গেয়েছেন মারফতি, মুরশিদি, ইসলামি, দেশাত্মবোধক, কাওয়ালি, লোকসঙ্গীত প্রভৃতি গান। নজরুল বিশ শতকের প্রথমার্ধে এদেশে অশিক্ষা ও কুসংস্কারে আচ্ছন্ন পিছিয়ে পড়া মুসলমানদের সাংস্কৃতিক উত্থান ও নবজাগরণে অসামান্য ভূমিকা রেখেছেন। কিন্ত সে সময় নজরুলকে কাফের বলে বাংলার মুসলমান সমাজের কাছে অপাঙক্তেয় করে রাখবার জন্যে আদাজল খেয়ে লেগেছিলো একদল ধর্মান্ধ। কাজী নজরুল ইসলাকে ইসলামি গান রচনায় উদ্দীপিত করেছিলেন আব্বাসউদ্দীন। তিনি নজরুলকে বলেন,‘আপনি যদি ইসলামি গান লেখেন তা হলে মুসলমানের ঘরে ঘরে আবার উঠবে আপনার জয়গান। ঘটেছিলও ঠিক তাই। কাজী নজরুলের রচনা এবং আব্বাসউদ্দীনের কণ্ঠ হয়ে উঠেছিল এক অনন্য যুগলবন্দী। গ্রামোফোনে তাঁদের গান বাঙালি মুসলমানকে মাতিয়ে দিয়েছিল। টেনে এনেছিল নতুন যুগের সংস্কৃতির শ্রোতধারায়।
তথ্যসূত্র: সাইম রানা: আব্বাসউদ্দীন আহমদ লোকশিল্পী নয় অনন্য মনীষা, নববর্ষসংখ্যা, ১৪এপ্রিল ২০১৬, প্রথম আলো, ঢাকা, পৃষ্ঠা. ০৪। আব্বাসউদ্দীন নিজেকে ‘গানের পাগল’ বলে অভিহিত করলেও অন্যান্য গুণিজন তাঁকে নানা অভিধায় ভূষিত করেছেন। উদাহরণ হিসেবে:নজরুলের দৃষ্টিতে ‘সুন্দর মিষ্টি কণ্ঠ’। অন্নদাশঙ্কর রায় তাঁকে বলেছেন ‘একজন অসাধারণ লোকসঙ্গীতশিল্পী। হেমাঙ্গ বিশ্বাসের দৃষ্টিতে তিনি হলেন ‘ভাওয়াইয়ার জাদুকর’। আপামর জনসাধারণের কাছে তিনি হলেন ‘ভাওয়াইয়ার রাজপুত্র’।

গানের রেকর্ডিংয়ে আব্বাসউদ্দীন।
নজরুলের গ্রামোফোন কোম্পানীর রিহার্সেল রুমে তাঁর বড়ো বড়ো খাতাগুলো পড়ে থাকতো। সেগুলো থেকে নতুন কিছুসংখ্যক কবি গান লিখে নিয়ে কাজীদার লাইনশুদ্ধ প্রায় হুবহু নকল করে নিজের লেখা বলে গ্রামোফোনে চালাবার চেষ্টা করতে লাগলো। আব্বাসউদ্দীন কাজীদাকে সে কথা বলার পরে তিনি হেসে বললেন, ‘দূর..পাগল, মহা সমুদ্র থেকে কয় ঘটি পানি নিলে কি সাগর শুকিয়ে যাবে? আর নবাগতদল এক আধটুনা নিলে হালে পাবে কি করে? তথ্যসূত্র : আব্বাসউদ্দীন আহমদ: কাজীদার কথা, সুধিজনের দৃষ্টিতে নজরুল সঙ্গীত,পৃষ্ঠা. ২৮। নজরুলের স্নেহসিক্ত আব্বাসউদ্দীন কাজীদার সাহচর্যে প্রায় বিশ বছর চলেও কোনোদিন কাজীদার মুখে পরনিন্দা যেমন শোনেন নি। তেমনি নজরুলকে আব্বাসউদ্দীন তাঁর প্রাণ দিয়ে ভালবেসেছেন, যা চিত্তকে আন্দোলিত না করে পারেনা। মানবপ্রেমী নজরুলের স্নেহ ভালবাসায় সিক্ত হয়ে আব্বাসউদ্দীন শৈল্পিক জগতে প্রাণময় হয়ে বিচরণ করেন। সরাসরি নজরুলের সান্নিধ্য পেয়ে আব্বাসউদ্দীন যেমনহৃদ্ধ হয়েছেন, তেমনি তিনি তাঁর গানের মাধ্যমে আপামর সাধারণ মানুষের হৃদয়ে চিরস্থায়ী আসন গড়ে নিতে সক্ষম হয়েছেন। তথ্য ঋণ: ০১. আব্বাসউদ্দীন আহমদ: কাজীদার কথা, সুধিজনের দৃষ্টিতে নজরুলসঙ্গীত, প্রকাশকাল: মে ১৯৯৯, প্রকাশক, নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা। ০২.সাইম রানা: আব্বাসউদ্দীন আহমদ লোকশিল্পী নয় অনন্য মনীষা, নববর্ষসংখ্যা, ১৪এপ্রিল ২০১৬, প্রথম আলো, ঢাকা।
লেখক পরিচিতি: লেখক ও নজরুল গবেষক।

মন্তব্য করুন

খবর অনুসন্ধান

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০  

সর্বশেষ নিউজ

আরো পড়ুন

Shares