১৭, জানুয়ারী, ২০২০, শুক্রবার

বিএনপির মোন্তাজের গায়ে এখন ‘মুজিব কোট’

ইজাজ আহমেদ মিলন, গাজীপুর:
প্রকাশিত: ৮:১৭ অপরাহ্ন, ১৫ ডিসেম্বর ১৯ , রোববার

নিউজটি পড়া হয়েছে ৪৮ বার
বিএনপির মোন্তাজের গায়ে এখন 'মুজিব কোট'

মোন্তাজ উদ্দিন আহমেদ।

বছর দেড়েক আগেও বিএনপি-জামায়াতে ইসলামীর মিছিল-মিটিং আর ‘জ্বালাও পোড়াও’ আন্দোলনের অগ্রভাগে থেকে রাজপথ কাঁপিয়েছেন তিনি। কেন্দ্রীয় নেতাদের নজরে পড়তে পোশাক কারখানার শ্রমিকদের ভাড়া করে এনে বিএনপির বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশকে উত্তপ্ত করে তুলেছেন। কিন্তু এই মোন্তাজ উদ্দিনই বছরখানেক হয় গায়ে ‘মুজিব কোট’ চাপিয়ে আওয়ামী লীগের সদস্য হয়েছেন। এমনকি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কাউন্সিলরও নির্বাচিত হয়েছেন।

ক্ষমতাসীন দলে যুক্ত হওয়ার পর মোন্তাজ উদ্দিনের রাজনৈতিক দাপট যত বেড়েছে, দুর্বৃত্তায়নও ততই বেড়েছে। অনুপ্রবেশকারী মোন্তাজ তার অনুগত বাহিনী মারফত বিভিন্ন মিল-কারখানার ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছেন, অবৈধভাবে গ্যাস সংযোগ দিয়ে রাইজারপ্রতি মাসিক ৫০০ টাকা আদায় করছেন, চাঁদাবাজি করছেন লতিফপুর-চক্রবর্তী সড়কের অটোরিকশা ও বিভিন্ন গাড়ি থেকে।

মোন্তাজ উদ্দিনের বিএনপিনামা : গাজীপুর সিটি করপোরেশন কাশিমপুরের লতিফপুর এলাকার সাইদুর রহমানের ছেলে মোন্তাজ উদ্দিন আহমেদ বছর দেড়েক আগেও বিএনপির সক্রিয় নেতা ছিলেন। ২ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সভাপতি ছিলেন তিনি। বিএনপির একাধিক নেতাকর্মী এ তথ্য নিশ্চিত করেন। কেবল যুবদল নয়, গাজীপুর মহানগরের লতিফপুর, তেতুইবাড়ি, চক্রবর্তী, সারাব, লস্করচালা, ভবানীপুর ও আশপাশের এলাকার মূল বিএনপিতেও একসময় মোন্তাজের চেয়ে সক্রিয় নেতা খুঁজে পাওয়া কঠিন ছিল।

সিটি করপোরেশন নির্বাচনের দেড় মাস আগেও টঙ্গীর চেরাগ আলী এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি ও জানমালের ক্ষয়ক্ষতি করে নাশকতা চালান মোন্তাজসহ বিএনপির নেতাকর্মীরা। এ ঘটনায় টঙ্গী থানার এসআই আল আমীন বাদী হয়ে মোন্তাজসহ ১০০ বিএনপির নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা [নম্বর ১১ (৫) ১৮] করেন। দীর্ঘ তদন্তের পর এ মামলার চার্জশিট দিয়েছে পুলিশ এবং মোন্তাজ উদ্দিনও এ মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি।

আওয়ামী লীগে মোন্তাজ : কিন্তু গত বছরের ২৬ জুন অনুষ্ঠিত গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগে হঠাৎ করেই মুজিব কোট গায়ে দিয়ে মোন্তাজ স্থানীয় আওয়ামী লীগে আবির্ভূত হন। স্থানীয় শীর্ষ নেতাদের সুদৃষ্টিতে পড়তে সক্রিয় ভূমিকাও রাখেন সংগঠনে।

কাশিমপুর থানা স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা শরীফ হোসেন বেপারী জানান, গত বছরের জুনের প্রথম দিকে ছাত্রলীগের সাবেক এক নেতার হাতে ফুল দিয়ে মোন্তাজ আওয়ামী লীগে যোগ দেন। তার যোগদানের সেই ছবি ফেসবুকে প্রচারও করেন। তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সমর্থন না পেলেও খুব কম সময়েই তিনি দলের নেতাদের আশীর্বাদ পেতে শুরু করেন।

মোন্তাজ উদ্দিন নিজেকে ২ নম্বর ওয়ার্ড ও কাশিমপুর থানা আওয়ামী লীগের একজন সদস্য দাবি করে জানান, তিনি একসময় বিএনপি করতেন, এটা সত্য। তার সম্পর্কে জেনেই শীর্ষ নেতারা তাকে দলে নিয়েছেন। তবে কীভাবে আওয়ামী লীগের সদস্য হয়েছেন, তা বলতে অস্বীকৃতি জানিয়ে তিনি বলেন, এসব তথ্য তিনি সাংবাদিকদের জানাতে বাধ্য নন।

এ প্রসঙ্গে গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আজমত উল্লা খান বলেন, জ্বালাও-পোড়াও ও নাশকতা মামলার কোনো আসামি আওয়ামী লীগের সদস্য হতে পারবে না- এটা প্রত্যেককে বলে দেওয়া হয়েছে। তবে মোন্তাজ কীভাবে সদস্য হয়েছে, এটা তার জানা নেই।

ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল একাধিক ত্যাগী ও পদধারী কিন্তু নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নেতারা মোন্তাজের সদস্যপদ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, মোন্তাজ উড়ে এসে জুড়ে বসেছে। যে বিএনপির সময় আমাদের নির্যাতন করেছে, এখন আওয়ামী লীগের আমলেও সে শক্তিধর।

তবে গত বছরের জুনে অনুষ্ঠিত গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মহানগরের ২ নম্বর ওয়ার্ড থেকে কাউন্সিলর নির্বাচনের জন্য ‘অনুপ্রবেশকারী’ মোন্তাজকে দলের একটি অংশ সক্রিয়ভাবে সমর্থনও জোগায়। দলের ত্যাগী নেতা ২ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল হালিমকে উপেক্ষা করে উচ্চ পর্যায়ের কয়েকজন নেতার সমর্থনে কাউন্সিলর নির্বাচন করেন তিনি এবং ভোটে জয়ী হন।

কাশিমপুর থানা স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা শরীফ বলেন, ‘হাইব্রিড এই নেতাকে দলের সব কার্যক্রম থেকে বিরত রাখা উচিত।’ একই কথা বলেছেন এলাকার অন্তত ২০-২৫ নেতা।

ভাগ্য খুলেছে কাউন্সিলর হয়ে : আওয়ামী লীগের সদস্য এবং কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়ে গত দেড় বছরে মোন্তাজ প্রচুর বিত্তবৈভবের মালিক বলে গেছেন। তার দাপটে এখন সিনিয়র নেতারাও কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। ঝুট ব্যবসা, অবৈধ গ্যাস বাণিজ্য আর পরিবহন চাঁদাবাজির ক্ষেত্রে মোন্তাজ একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছেন। আশপাশের অন্তত এক ডজন বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান তার নিয়ন্ত্রণে। যদিও মোন্তাজের ভাষ্য, কোনো কারখানায় তিনি ঝুট ব্যবসা করেন না। এসব অপপ্রচার।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, মোন্তাজ কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়ার পরপরই অবৈধভাবে বিভিন্ন বাসাবাড়িতে গ্যাস সরবরাহ দিতে শুরু করেন। সংঘবদ্ধ চক্রের সহায়তায় হাতিয়ে নেন কোটি কোটি টাকা। গ্যাস সরবরাহের জন্য রাইজারপ্রতি মাসে ৫০০ টাকা করে আদায় করেন মোন্তাজের লোকজন। ওই এলাকায় রয়েছে নূ্যনতম প্রায় দুই হাজার অবৈধ রাইজার রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে মোন্তাজ বলেন, এলাকার উন্নয়ন ও সাধারণ জনগণের স্বার্থে তিনি একদিন গ্যাস আনার ব্যাপারে কথা বলেছেন। তবে রাইজারপ্রতি ৫০০ টাকা করে আদায়ের বিষয়ে তার কিছু জানা নেই।

পরিবহন ক্ষেত্রে চাঁদাবাজির অভিযোগও রয়েছে মোন্তাজের বিরুদ্ধে। অভিযোগ, লতিফপুর-চক্রবর্তী সড়কে অটোরিকশা ও বিভিন্ন গাড়ি থেকে প্রতিনিয়ত চাঁদা আদায় করেন তার লোকজন। সিটি করপোরেশনের ঠিকাদারদের কাছেও মোন্তাজ চাঁদা দাবি করে থাকেন। এ প্রসঙ্গে মোন্তাজ বলেন, তিনি জমির ব্যবসা করেন। এসব করার সময় কই তার! তিনি আরও বলেন, ‘এসব না লিখে আপনারা উন্নয়নের কথা লেখেন। আমরা তো উন্নয়নও করছি।’ সূত্র; সমকাল

মন্তব্য করুন

খবর অনুসন্ধান

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০৩১  

সর্বশেষ নিউজ

আরো পড়ুন

Shares