২৩, নভেম্বর, ২০১৯, শনিবার

গ্যাস বেলুন নয়, শিশুদের হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে বোমা!

খাজা মেহেদী শিকদার:
প্রকাশিত: ২:৪৫ অপরাহ্ন, ২৩, নভেম্বর, ২০১৯, শনিবার

নিউজটি পড়া হয়েছে ১ বার

প্রতিনিয়তই গ্যাস বেলুনের ব্যবহার বাড়ছে। গ্যাস বেলুন নয়, শিশুদের হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে চলমান বোমা এমন ধারণা করছে অনেকেই। এ বেলুন ব্যবহারের সাথে সাথে বাড়ছে ব্যাপক ঝুঁকি।

এই বেলুন হিলিয়াম গ্যাস দিয়ে তৈরির কথা থাকলেও খরচ কমানোর জন্য করা হচ্ছে হাইড্রোজেন গ্যাসে। তবে শিশুদের জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ তা গত বুধবার রাজধানীর রূপনগরে হাইড্রোজেন গ্যাসের সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ৭ শিশু নিহতের ঘটনায় অনুমান করা সম্ভব।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্যাস বেলুন নয়, তাদের হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে এক প্রকার চলমান বোমা। যা খুবই বিপজ্জনক।

অতিরিক্ত লাভের জন্য ও খরচ কমানোর কারণে হাইড্রোজেন গ্যাস ভরেই বেলুন বিক্রি হচ্ছে রাজধানীসহ সারাদেশে। আর এই গ্যাস তৈরি করছেন বেলুন ব্যবসায়ীরা নিজেরাই। কোনোরকম নিরাপত্তা কিংবা নির্দেশনা ছাড়াই নিজ উদ্যোগে এই গ্যাস তৈরি করছেন তারা।

রাজধানী ঘুরে প্রায় প্রতিটা স্কুলের সামনে দেখা গেছে, রাজধানীর শিশু পার্কসহ রাজধানীর প্রায় অনেক সিগন্যালেই দেদারসে বিক্রি হচ্ছে এই হাইড্রোজেন গ্যাস বেলুন। বিভিন্ন কার্টুনের অবয়বে বানানো প্লাস্টিকের বেলুনেও ব্যবহৃত হচ্ছে হাইড্রোজেন গ্যাস।

জানা যায়, হাইড্রোজেন সবচেয়ে হালকা গ্যাস। এটা বাতাসের চেয়েও হালকা, যে কারণে বেলুনে ভরলে তা ওড়ে। তবে এটা নিরাপদ নয়। হাইড্রোজেন জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার হয়। বেলুনের সংস্পর্শে গিয়েও আগুন তৈরি করতে পারে।

বিদেশে হাইড্রোজেন নয়, হিলিয়াম গ্যাস দিয়ে বেলুন ফোলানো হয়। বিষয়টা এ রকম যে, আমাদের দেশে ফল পাকানো হয় বিষাক্ত কার্বাইড দিয়ে। বিদেশেও ফল পাকানো হয়, কিন্তু তা কার্বাইড দিয়ে নয়। তেমনিভাবে বিদেশেও বাচ্চাদের জন্য বেলুন ফোলানো হয়, কিন্তু এভাবে বিপজ্জনক গ্যাস দিয়ে নয়। শুধু আমাদের দেশেই বিপজ্জনক হাইড্রোজেন গ্যাস দিয়ে বেলুন ফুলানো হয়।

রাস্তায় যারা বেলুন ফোলায়, তারাই এটা তৈরি করে। অ্যালুমিনিয়াম ও সোডা মিলিয়ে এই গ্যাস তৈরি করা হয়। বেলুন বিক্রেতারা বিক্রির স্থানে যাওয়ার আগে সিলিন্ডারের মুখ খুলে প্রথমে সোডা দেয়। এরপর কুচি কুচি করে কাটা অ্যালুমিনিয়াম সেখানে ঢোকায়। বন্ধ করে দেয়া হয় সিলিন্ডারের মুখ। অ্যালুমিনিয়াম কুচি ও সোডার বিক্রিয়ায় ভেতরে চাপ ও তাপ সৃষ্টি হয়।

আজিমপুর ভিকারুন নিসা স্কুলের সামনে বেলুন বিক্রেতা আরমান খন্দকার বলেন, এ গ্যাসের বেলুন সবাই কিনে নিয়ে যায়। পুলিশ, র‌্যাব, স্কুল, কলেজের স্যাররাও কিনে নিয়ে যায়। আজ পর্যন্ত কোনো সমস্যা হয় নাই। তবে আগুনের কাছে গেলে বিকট শব্দে ফাটবে এটা নিশ্চিত।

ঢাকা মেডিক্যালের সামনে ভাসমান বেলুন বিক্রেতা আজিজ রহমান বলেন, আমাদের মহাজনদের বিদেশ থেকে গ্যাস আনতে গেলে খরচ অনেক বেশি। তাই তারা নিজেরাই গ্যাস তৈরি করে (বিকল্প পথ)। এই গ্যাস তৈরি না করলে তেমন ব্যবসা হয় না।

এসব বেলুনে অনেক ঝুঁকি রয়েছে আপনি জানেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, কাজ করতে গেলে তো একটু ঝুঁকি থাকবেই। এসব তেমন কিছুই বুঝি না।

জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল কাদের বলেছেন, কোনো প্রকার তাপের সংস্পর্শে এলেই হাইড্রোজেন বিক্রিয়া করে অনেক দুর্ঘটনা হতে পারে।

তিনি বলেন, তবে হিলিয়াম গ্যাস নন রি-অ্যাক্টিভ, যার বিক্রিয়া করার বা দাহ্য হওয়ার ক্ষমতা নেই। এটি বেলুনে ব্যবহার করা নিরাপদ। কিন্তু হাইড্রোজেন ব্যবহারে ঝুঁকি রয়েছে কারণ তাপের সংস্পর্শে হাইড্রোজেন রি-অ্যাক্ট করা শুরু করবে। এটা যেকোনো ধরনের তাপ হতে পারে। আগুনও হতে পারে, সূর্যের আলোও হতে পারে। মোট কথা গরম পেলেই হাইড্রোজেন বিক্রিয়া করা শুরু করে।

হাইড্রোজেন গ্যাস বিপজ্জনক, তাই গ্যাস বেলুন নিজের নিরাপত্তা বিবেচনা করে ব্যবহার করা উচিত বলে মনে করেন রসায়নবিদ এবং বিস্ফোরক নিয়ে কাজ করা সংশ্লিষ্টরা।

সংশ্লিষ্টরা আরো জানান, এসব বেলুন ফেটে গেলে কাছের সামান্য সিগারেটের আগুনই ঝলসে যাওয়ায় যথেষ্ট। যার ফলে বোমার মতন ঘটনা ঘটতে পারে। এগুলো সরকার বন্ধ করতে না পারলে দুর্ঘটনা ঘটতেই থাকবে।

প্রসঙ্গত, বুধবার (৩০ অক্টোবর) রূপনগরে বেলুন ফোলানোর গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনায় প্রাণ হারায় ৭ শিশু। হাসপাতালে আহত অবস্থায় কাৎরাচ্ছেন শিশুওসহ প্রায় আরও ১৫-১৭ জন। এদেরমধ্যে কয়েকজনের অবস্থা এখনো আশঙ্কাজনক।

ঘটনার প্রতক্ষ্যদর্শীরা জানিয়েছেন, বেলুন বিস্ফোরণের মিনিট দশেক আগে আমি চা খেতে যাওয়ার সময় দেখি এক বেলুন ব্যবসায়ী গ্যাস দিয়ে বেলুন ফোলাচ্ছেন। তার চারপাশ ঘিরে ২০-৩০ জন শিশু গ্যাস ফোলানো দেখছে। অনেকেই বেলুন কিনতেও এসেছিল। চা অর্ধেক খাওয়া অবস্থায় বিকট শব্দে চারপাশ দেখি কালো ধোঁয়ায় অন্ধকারাচ্ছন্ন। পরে এসে দেখি ৬-৭ জন শিশু পড়ে আছে রাস্তার উপর। বাকিদের অবস্থা ভয়াবহ। কারও হাত নেই, কারও পেটের নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে গেছে।

তারা আরো জানান, এ সময় গ্যাস বেলুন ব্যবসায়ীকে দেখি উলঙ্গ অবস্থায় দৌড় দিচ্ছেন।

উল্লেখ্য, গ্যাস বেলুন বিস্ফোরণের ঘটনা শুধু কালই নয়। এর আগে, গত বছরের ৬ জানুয়ারিতে ছাত্রলীগের ৭০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত র‌্যালিতে যোগ দিতে যাওয়ার সময় বাসের মধ্যে গ্যাস বেলুন বিস্ফোরণে ১০ জন অগ্নিদগ্ধ হন। ওইদিন সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় রাইদা পরিবহনের একটি বাসে এ দুর্ঘটনা ঘটে। তাদের সবার কাছে গ্যাস বেলুন ছিল। হঠাৎ করে গ্যাস বেলুনগুলো বিস্ফোরিত হয়ে অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়।

মন্তব্য করুন

খবর অনুসন্ধান

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০  

সর্বশেষ নিউজ

আরো পড়ুন

Shares