২১, অক্টোবর, ২০১৯, সোমবার

উভচর স্কুল

এবার আগা খান স্থাপত্য পুরস্কার পেয়েছে কেরানীগঞ্জের হযরতপুর ইউনিয়নের উভচর এক বাঁশের স্কুল। কিভাবে গড়লেন এই স্কুল আর পুরস্কার পাওয়া নিয়ে বিস্তারিত জানাচ্ছেন এর স্থপতি সাইফ উল হক: | আপডেট: ২১, অক্টোবর, ২০১৯, সোমবার

উভচর স্কুল

আমাকে প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের একটা স্কুল বানিয়ে দেওয়ার জন্য ধরেন রাজিয়া আলম। তিনি ইংল্যান্ডে ছিলেন একসময়। সেখান থেকে ফিরে সাভারের নগরকুণ্ডার বালিয়াপুর এলাকায় একটি স্কুল খুলেছিলেন। এর সঙ্গে ছিল নার্সারি। ওটার টাকায় চলত স্কুল। তো স্কুলটা করার জন্য প্রথম আমাকে কেরানীগঞ্জের কানারচরের ওই জায়গাটিতে নিয়ে যান ২০১১ সালে বর্ষার সময়। জায়গাটা দেখেই আমি রাজিয়া আলমকে জিজ্ঞেস করলাম, এখানে কী করব ঠিক বুঝতে পারছি না। এখানে তো পানি। তখন রাজিয়া আলম বললেন, বর্ষা চলে গেলেই এখানে ডাঙার দেখা মিলবে। বর্ষার সময়টায়ই শুধু পানি থাকে। এই সুযোগে একটা কথা বলে রাখি, একেবারে নিজের মতো করে একটা স্কুল গড়ার স্বপ্ন আমার অনেক দিনের। আমার মনে হয়, ছোট শিশুদের স্কুলের পরিবেশটা হওয়া চাই তাদের মনের মতো। সুযোগ যে একেবারে পাইনি তা নয়। এর আগে উত্তরার স্কলাস্টিকা স্কুলের নকশা করেছি। আবার রাজশাহীর প্যারামাউন্ট স্কুলেরও নকশা করেছিলাম। যদিও পরে তারা আমার নকশায় কিছু বদল করে নিজেদের মতো করে স্কুলটা বানায়। এসব মিলিয়ে মনের মধ্যে একটা আক্ষেপ ছিল। তাই রাজি হয়ে গেলাম। ভাবতে লাগলাম, কিভাবে এখানে স্কুল বানানো যায়। জমিটা ভরাট করতে চাচ্ছিলাম না। আবার বাঁশের মাচার মতো বানিয়ে একটা কিছুর কথাও মনে হলো। কিন্তু বর্ষা চলে গেলে স্কুলটা অনেক উঁচুতে উঠে থাকবে। তখন শিশুদের অনেক সমস্যা হবে। নদীর ঘাটের পন্টুনগুলোর মতো কিছু বানানো যায় কি না চিন্তা করলাম। কিন্তু মনটা খুঁতখুঁত করছিল।

এ সময়ই নতুন একটা চিন্তা মাথায় এলো। এমন একটা কিছু করতে হবে, যেটা বর্ষায় ভেসে থাকবে। আবার পানি চলে গেলেও দাঁড়িয়ে থাকবে সুন্দরমতো। অর্থাৎ উভচর একটা কাঠামো বানাব। ঠিক করলাম, নিচের অংশটা তৈরি করব ড্রাম আর বাঁশ দিয়ে। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে শুরু করলাম আর্কেডিয়া শিক্ষা প্রকল্পের এই স্কুল তৈরির কাজ। পুরনো ড্রাম কিনে আনলাম। ওগুলোকে একটা বাঁশের ফ্রেমে জুড়ে দিয়ে তৈরি করলাম নিচের কাঠামো। অবশ্য মূল কাজ শুরুর আগে ছোট ছোট কিছু কাঠামো দাঁড় করিয়ে দেখেছি এগুলো আসলেই ভাসছে কি না। যা হোক, বর্ষা শুরুর আগে নিচের কাঠামোটা শেষ করতে পারলাম। এতে পানি বাড়ার পর এটা ভেসে থাকল। ওপরের কাঠামোর জন্য কাঠের খুঁটিও বসিয়ে দিতে পেরেছিলাম। এবার এই ভাসমান ভিতের ওপর দাঁড় করালাম বাকি কাঠামো। গোটাটাই বাঁশ দিয়ে। বাঁশ ব্যবহার করার কারণ—এটা হালকা, তার চেয়ে বড় কথা, এটায় খরচও পড়ে কম। ছাদের তিনটা স্তর। দুটি বাঁশের স্তরের মাঝখানে বৃষ্টির পানি আটকানোর জন্য দিলাম ক্যানভাসের কাপড়। আবার প্রতিটি রুমের দুই পাশে শাল-গজারিকাঠের খুঁটি দিয়ে আটকানোর ব্যবস্থা হলো। এভাবেই ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে শেষ হলো কাজ। অবশ্য প্রথম বর্ষার সময় একটা ঝামেলা হলো। কামরাগুলো যে খুঁটি দিয়ে আটকানো হয়েছে, সেগুলো নড়বড়ে হয়ে গোটা কাঠামোই ভেসে গিয়েছিল। পরে কামরাগুলোর দুই পাশে কয়েকটি বাঁশ দিয়ে শক্ত খুঁটি বানিয়ে একেবারে মাটির অনেক গভীর পর্যন্ত আটকে দিই। এ ধরনের ভাসমান স্কুল দুনিয়ায় খুঁজলে আরো অনেকই পাবেন। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ ধরনের ধারণা একটু নতুনই।

বিদ্যালয়ে সর্বমোট পাঁচটি কক্ষ রয়েছে। এর মধ্যে কণা, বিন্দু ও সিন্ধু নামের তিনটি কক্ষ শিশুদের শিক্ষাদানের জন্য ব্যবহার করা হয়। অন্য দুটির মধ্যে একটি অফিসরুম, আরেকটি ছাত্র-ছাত্রীদের টয়লেট হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া অফিসকক্ষ ও শ্রেণিকক্ষের মাঝখানে শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার জন্য বানানো হয়েছে সুন্দর একটি বাঁশের তৈরি জায়গা। বিদ্যালয়ে বর্তমানে মোট ২০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে এবং তাদের শিক্ষাদানের জন্য একজন শিক্ষিকা আছেন। এটা আসলে প্রাক-প্রাথমিক একটি বিদ্যালয়। বিদ্যালয়টিতে পাশের ইটভাটার শ্রমিকদের বাচ্চারা পড়ে। পড়ে গ্রামের শিশুরাও। এমনিতে সকাল ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত ইটভাটার শ্রমিকদের বাচ্চাদের পড়ানো হয়। ১০টা থেকে ১২টা পর্যন্ত পড়ানো হয় গ্রামের অন্য শিশুদের। রাজিয়া আলমের এই এলাকায় একটা দালানের একটা কামরাও ভাড়া নিয়েছেন। বর্ষার সময় তাই এখানে প্রতিদিন ক্লাস হয় না। আবার যখন পানি অতিরিক্ত বেড়ে যায়, তখন শিশুদের নিরাপত্তার কথা ভেবে কিছুদিন বন্ধ রাখা হয় স্কুলটি। বিদ্যালয়টি সার্বিক দেখাশোনা করেন মো. আব্দুল বারেক নামে স্থানীয় এক ব্যক্তি। কয়েকজন মিস্ত্রিকে দায়িত্ব দেওয়া আছে, বিদ্যালয়টির বাঁশ-খুঁটির সমস্যা হলে সঙ্গে সঙ্গে তা মেরামত করে দেয়।বিদ্যালয়ে সর্বমোট পাঁচটি কক্ষ রয়েছে। এর মধ্যে কণা, বিন্দু ও সিন্ধু নামের তিনটি কক্ষ শিশুদের শিক্ষাদানের জন্য ব্যবহার করা হয়। অন্য দুটির মধ্যে একটি অফিসরুম, আরেকটি ছাত্র-ছাত্রীদের টয়লেট হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া অফিসকক্ষ ও শ্রেণিকক্ষের মাঝখানে শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার জন্য বানানো হয়েছে সুন্দর একটি বাঁশের তৈরি জায়গা। বিদ্যালয়ে বর্তমানে মোট ২০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে এবং তাদের শিক্ষাদানের জন্য একজন শিক্ষিকা আছেন। এটা আসলে প্রাক-প্রাথমিক একটি বিদ্যালয়। বিদ্যালয়টিতে পাশের ইটভাটার শ্রমিকদের বাচ্চারা পড়ে। পড়ে গ্রামের শিশুরাও। এমনিতে সকাল ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত ইটভাটার শ্রমিকদের বাচ্চাদের পড়ানো হয়। ১০টা থেকে ১২টা পর্যন্ত পড়ানো হয় গ্রামের অন্য শিশুদের। রাজিয়া আলমের এই এলাকায় একটা দালানের একটা কামরাও ভাড়া নিয়েছেন। বর্ষার সময় তাই এখানে প্রতিদিন ক্লাস হয় না। আবার যখন পানি অতিরিক্ত বেড়ে যায়, তখন শিশুদের নিরাপত্তার কথা ভেবে কিছুদিন বন্ধ রাখা হয় স্কুলটি। বিদ্যালয়টি সার্বিক দেখাশোনা করেন মো. আব্দুল বারেক নামে স্থানীয় এক ব্যক্তি। কয়েকজন মিস্ত্রিকে দায়িত্ব দেওয়া আছে, বিদ্যালয়টির বাঁশ-খুঁটির সমস্যা হলে সঙ্গে সঙ্গে তা মেরামত করে দেয়।  বাঁশ দিয়ে বিশেষভাবে নির্মিত স্কুলটির কথা গোটা বাংলাদেশের মানুষ জানতে পারে মূলত স্থাপত্যনিদর্শন হিসেবে আন্তর্জাতিক আগা খান স্থাপত্য পুরস্কার পাওয়ার পর। ২৯ আগস্ট রুশ ফেডারেশনের তাতারস্তানের রাজধানী কাজানে বিজয়ীর নাম ঘোষণা করা হয়। বাংলাদেশসহ বাহরাইন, ফিলিস্তিন, রুশ ফেডারেশন, সেনেগাল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ছয়টি স্থাপনাকে দেওয়া হয় বিশ্বের সেরা ছয় স্থাপনার পুরস্কার। যদি বলেন পুরস্কার পাওয়ার অনুভূতি কেমন, তাহলে বলব—স্বাভাবিকভাবেই খুব ভালো লাগছে। আর স্বপ্নপূরণের একটা ব্যাপার তো আছেই। তবে এই পুরস্কার মোটেই আমার একার নয়। এই প্রজেক্টের সঙ্গে অন্য স্থপতিরাসহ আরো যাঁরা আছেন, তাঁদের সবার। বিশেষ করে স্থপতি সালমা পারভীন খানের কথা বলতেই হয়। তিনিও এর পেছনে অনেক শ্রম দিয়েছেন।  ভবিষ্যতে স্কুল নিয়ে আরো কিছু ভিন্ন ধরনের কাজ করতে চাই। বিশেষ করে আমাদের দেশে বন্যার সময় নদীর আশপাশের এলাকায় ভাঙনের কারণে অনেক বিদ্যালয়ই হুমকির মুখে পড়ে। এ ক্ষেত্রে এ ধরনের উভচর কাঠামোর স্কুল একটা সমাধান হতে পারে বলে মনে করি আমি।  ছবি : আগা খান ডেভলপমেন্ট নেটওয়ার্কের ওয়েবসাইট থেকে সংগ্রহ করা তথ্য দিয়ে সাহায্য করেছেন কালের কণ্ঠ’র কেরানীগঞ্জ প্রতিনিধি আলতাফ হোসেন মিন্টু

বাঁশ দিয়ে বিশেষভাবে নির্মিত স্কুলটির কথা গোটা বাংলাদেশের মানুষ জানতে পারে মূলত স্থাপত্যনিদর্শন হিসেবে আন্তর্জাতিক আগা খান স্থাপত্য পুরস্কার পাওয়ার পর। ২৯ আগস্ট রুশ ফেডারেশনের তাতারস্তানের রাজধানী কাজানে বিজয়ীর নাম ঘোষণা করা হয়। বাংলাদেশসহ বাহরাইন, ফিলিস্তিন, রুশ ফেডারেশন, সেনেগাল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ছয়টি স্থাপনাকে দেওয়া হয় বিশ্বের সেরা ছয় স্থাপনার পুরস্কার। যদি বলেন পুরস্কার পাওয়ার অনুভূতি কেমন, তাহলে বলব—স্বাভাবিকভাবেই খুব ভালো লাগছে। আর স্বপ্নপূরণের একটা ব্যাপার তো আছেই। তবে এই পুরস্কার মোটেই আমার একার নয়। এই প্রজেক্টের সঙ্গে অন্য স্থপতিরাসহ আরো যাঁরা আছেন, তাঁদের সবার। বিশেষ করে স্থপতি সালমা পারভীন খানের কথা বলতেই হয়। তিনিও এর পেছনে অনেক শ্রম দিয়েছেন।

ভবিষ্যতে স্কুল নিয়ে আরো কিছু ভিন্ন ধরনের কাজ করতে চাই। বিশেষ করে আমাদের দেশে বন্যার সময় নদীর আশপাশের এলাকায় ভাঙনের কারণে অনেক বিদ্যালয়ই হুমকির মুখে পড়ে। এ ক্ষেত্রে এ ধরনের উভচর কাঠামোর স্কুল একটা সমাধান হতে পারে বলে মনে করি আমি।

ছবি : আগা খান ডেভলপমেন্ট নেটওয়ার্কের ওয়েবসাইট থেকে সংগ্রহ করা তথ্য দিয়ে সাহায্য করেছেন কালের কণ্ঠ’র কেরানীগঞ্জ প্রতিনিধি আলতাফ হোসেন মিন্টু

আরো পড়ুন

%d bloggers like this: