২৩, নভেম্বর, ২০১৯, শনিবার

ইতালির মৎস্যকুমারীতে নেই কোনো রাস্তা, যাতায়াতে ভরসা ‘গণ্ডোলা’

আফরিন রিমী :
প্রকাশিত: ১২:৫০ অপরাহ্ন, ২৩, নভেম্বর, ২০১৯, শনিবার

নিউজটি পড়া হয়েছে ১ বার

ছবি: সংগৃহীত

এক গৌরবময় সমুদ্র-নগরী রয়েছে। উঁচু-নিচু ঢেউয়ের সঙ্গে সমুদ্রটা চওড়া ও সরু রাস্তায় বয়ে যায়; আর লবণাক্ত সমুদ্র-শৈবাল প্রাসাদগুলোর মর্মর প্রস্তরে লেপটে থাকে। ইংরেজ কবি স্যামুয়েল রজার্সের কথা এটি। বুঝতে পারছেন কি, কোন নগরীর কথা বলেছেন তিনি?

ইতালির মৎস্যকুমারী নামে খ্যাত এই নগরী শিল্প সাহিত্য, বিশেষ করে স্থাপত্য শিল্পে যে কারো মন জুড়িয়ে যাবে! সেখানকার প্রতিটি ঘর বাড়িও যেন এক একটি নান্দনিক রূপ ধারণ করেছে। রঙবেরঙের কারুকার্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে জলের মধ্যে। সত্যিই এক অপরূপ জলের শহর। এখন নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন ভেনিস শহরের কথা বলা হচ্ছে! পৃথিবীর ভাসমান শহরের তালিকায় সব সময় শীর্ষে তার নাম। ভেনিস তার এই সৌন্দর্য্য ৬০০ বছর ধরে রেখেছে। এ শহরে প্রায় ১১৮টি দ্বীপপুঞ্জ ও ১৭৭টি খাল রয়েছে। এক দ্বীপ থেকে অন্য দ্বীপে পায়ে হেঁটে যাওয়ার জন্য রয়েছে ৪০৯টি সেতু। প্রতিবছরই হাজারো দর্শক এখানে ভিড় জমায় শুধু এর খ্যাতি ও আকর্ষণীয় স্থানের কারণে। শহরের সবচেয়ে প্রাচীনতম দেয়ালটি ৩২৫ ফিট উঁচু।

ভেনিস নগরীর সৌন্দর্য

ভেনিস নগরটি মূলত কতগুলো দ্বীপের সমষ্টি। ইতিহাস থেকে জানা যায়, জলদস্যুদের হাত থেকে রক্ষা পেতে প্রবাসীরা এখানে বসতি গড়ে তোলে। আস্তে আস্তে লোক সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং পানির ওপর গড়ে ওঠে এ শহরে। ভেনিসে গাড়ি চালানোর মতো কোনো রাস্তাই নেই। পুরো শহর জুড়েই ছড়িয়ে রয়েছে গাছের শেকড়ের মতো অসংখ্য খাল। এজন্যই ভেনিসকে ইতালির মৎস্যকুমারীও বলা হয়। এখানে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে একমাত্র সঙ্গী ছোট ডিঙি নৌকা। ভেনিসে বসবাস করা প্রতিটি পরিবারের নিজস্ব একাধিক নৌকা আছে। বাড়ির সঙ্গে বাধা থাকে এসব নৌকা অথবা স্পীড বোটগুলো। ভেনিসের জলযানের একটি আকর্ষণীয় রোমান্টিক জলযান হল গণ্ডোলা। আর এই ঐতিহ্যবাহী গণ্ডোলা সব পর্যটকের দৃষ্টি কেড়ে নেয়।

চমৎকার কারুকার্য খচিত, শিল্পীর শৈল্পিক ছোয়ায় তৈরি এসব গণ্ডোলা। ভেনিসের পর্যটন কেন্দ্রের প্রধান আকর্ষণগুলো দেখে নিতে পারবেন এই গণ্ডোলায় চড়ে। আবার খালের পাশে তৈরি পায়ে চলা পথ দিয়েও ঘুরে বেড়াতে পারেন।  তবে মজার বিষয় হচ্ছে, অচেনা পথে যতই হাঁটেন দ্বীপের বাইরে চলে যাওয়ার ভয় নেই। এর চারপাশে লেকের জলধারা আপনাকে পথ দেখাবে। তাছাড়া একটু পরপরই দেখার মতো কিছু না কিছু পেয়েই যাবেন। সেটা হতে পারে প্রাচীন কোনো চার্চ, কোনো মিউজিয়াম বা কোনো প্রদর্শনী। এছাড়াও স্থানীয়রা বিভিন্ন জিনিসের পশরা সাজিয়ে বসেছে রাস্তার ধারেই। এখানে পেয়ে যেতে পারেন আপনার পছন্দের মুখোশ, হ্যাট বা নানা রঙের ঘর সাজানোর কাঁচের জিনিস।

রোমান্টিকতার শহর

রোমান্টিকতার শহর

ভ্যানিসের পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে মোহনীয় সৌন্দর্য। রোমান্টিক শহর ভ্যানিস নবদম্পতিদের হানিমুনের জন্য দারুণ জনপ্রিয় একটি জায়গা। তাই এই শহরকে সিটি অব লাভ বলেও ডাকা হয়। মাকড়শার জালের মত পুরো ভেনিস জুড়ে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য খাল। এরই মাঝে এই শহরকে দ্বিখণ্ডিত করেছে গ্র্যান্ড ক্যানেল। নৌকা, স্পীড বোটের যাতায়াতের পথের এসব খাল থেকে দেখতে পাবেন শহরটি। চোখ জুড়ানো রং, নকশা ও দারুণ স্থাপত্যশৈলীর এই নগরী সবাইকে বিমোহিত করে। খালের ওপরে রয়েছে চমৎকার সব সেতু। এসব সেতুর সৌন্দর্য পর্যটকদের মুগ্ধ করে। তবে সবচেয়ে সুন্দর ও জমকালো সেতু হল রিয়ালটো ব্রিজ, যা গ্র্যান্ড ক্যানেলের উপর স্থাপিত। খালের মধ্যে থেকে এই সেতুর অপূর্ব কারুকার্য দর্শনার্থীদের মন ছুঁয়ে যায়। ভেনিস আসলে গণ্ডোলায় চড়ে এই সেতুর নিচ দিয়ে পার না হলে পুরো ভ্রমণই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

মুখোশের শহর 

দেশ-বিদেশের বিভিন্ন উৎসবেই মুখোশের ব্যবহার হয়। মুখোশের শহর হিসেবে সারা বিশ্বে দারুণ খ্যাতি আছে ভেনিস নগরীর। প্রতিবছর ইতালির ভেনিসে যে কার্নিভাল হয় তার একটা বড় অংশ রয়েছে এই মুখোশ। ‘কার্নিভাল ডি ভ্যানিজিয়া‘ নামের এ উৎসবে যোগ দিতে প্রতি বছর প্রায় ত্রিশ লাখ মানুষ জড়ো হয় স্বপ্ন নগরী ভেনিসে। এই কার্নিভাল উপলক্ষে অসাধারণ কারুকার্য খচিত, শৈল্পিক রুচির সমন্বয়ে তৈরি হয় চমৎকার সব মুখোশ। ভেনিস গেলে পর্যটকরা রঙ বেরঙের এই মুখোশগুলো কিনে থাকেন।

মুখোশের শহর

খ্রিস্টধর্মের বিশেষ উপবাস (লেন্ট) উপলক্ষে খ্রিস্টানদের অ্যাশ ওয়েডনেসডে থেকে ইস্টার ইভ পর্যন্ত চল্লিশ দিন যাবতীয় পার্টি, মাংস, মিষ্টি ও চর্বিজাতীয় সব রকম রিচ ফুড এবং মদ্যপান থেকে বিরত থাকতে হয়। চল্লিশ দিনের দীর্ঘ সংযমের আগে ভেনিসবাসী তাই এই কার্নিভালের মাধ্যমে আনন্দের আয়োজন করে। কার্নিভাল শব্দটা ল্যাটিন শব্দ ‘কার্নে’ এবং ‘ভেল’ থেকে এসেছে তার অর্থ করলে দাঁড়ায় -ফেয়ারওয়েল টু মিট অর্থাৎ মাংসকে বিদায়! উৎসবের দিনগুলোতে ভেনিসকে একদম জাদু নগরী মনে হয়। একটা মন্ত্রমুগ্ধকর আবহ চারপাশে। মুখোশ পরা বিচিত্র সাজে মানুষ  ঘুরছে, হেসে বেড়াচ্ছে, অংশ নিচ্ছে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। দুই সপ্তাহ জুড়ে চলতে থাকে মুখোশ উৎসব। তবে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হলো শেষ মঙ্গলবার ও বৃহস্পতিবার। এগুলোকে বলা হয়, ‘ফ্যাট থার্সডে’ এবং ‘ফ্যাট টুয়েসডে’!

জুয়েলারি

সেন্ট মার্কস স্কয়ারে বসে মূল আয়োজন। এক বিরাট কাঠের মঞ্চে উৎসবের দিনগুলোতে চলে দেশ বিদেশের নামী নাটক মঞ্চায়ন, সার্কাস এবং এক্রোব্যাট প্রদর্শনী। কেউ মুখের ভেতর আগুনের গোলা ঢুকিয়ে দেয়। কেউ জাগলিং করতে করতে দর্শকদের মাতিয়ে রাখে। আবার রাতে থাকে মোমের আলোয় নৌকার প্যারেড।  ইঁদুর, বিড়াল, হ্যালোউইন, জলদস্যু, রূপকথার নানা চরিত্র তো আছেই। এছাড়াও ভেনিস নগরীর এক পিয়াজ্জা সান মার্কোতে রয়েছে আকর্ষণীয় ভৌজ প্যালেস। প্রাচীন স্থাপত্য রীতিতে নির্মিত এই ভবন মূলত একটি জাদুঘর এখন। এছাড়াও এখানে ছোট ছোট আরো অনেক পুরনো মনোমুগ্ধকর স্থাপত্য প্রাসাদ, জাদুঘর রয়েছে। তার পাশাপাশি অনেক রকমের বুটিক, ক্যাফে ও রেস্তোরাতেও ঘুরতে পারবেন।

কাঁচের তৈরি বিভিন্ন সামগ্রী

ভেনিসের কাঁচ শিল্প

ভেনিসের ঐতিহ্যবাহী শিল্পের মধ্যে একটি পৃথিবী বিখ্যাত কাঁচ শিল্প। গলন প্রক্রিয়ায় কাঁচের বাসনপত্র থেকে শুরু করে, এমনকি অপরূপ গয়নাও তৈরি করেন ভেনিসের দক্ষ কারিগরেরা। ফুলদানি, ঝাড়বাতি, বিভিন্ন নকশার শো পিসসহ নানান নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদিও কাঁচ দিয়ে তৈরি করা হয়। কাঁচ শিল্পে ভেনিসের দক্ষতায় মুগ্ধতা অবধারিত।

লিডো দ্বীপ

লিডো দ্বীপ

এই দ্বীপকে বলা হয় ভেনিসের সোনালি দ্বীপ। কারণ পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো চলচ্চিত্র উৎসব ‘ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব’ এর আয়োজক এই সোনালি দ্বীপ। এ দ্বীপের সমুদ্র সৈকতে গোধূলি লগ্নের সূর্যাস্তের দৃশ্য উপভোগ করতে পর্যটকেরা উপস্থিত হন

ভেনিস শহর নির্মাণের পেছনের গল্প

ভেনিস নির্মাণের ইতিহাস শুরু হয় পঞ্চম শতকের দিকে। সময়টা ছিল পশ্চিমা রোমান সাম্রাজ্যের পতনের শুরুর দিক। উত্তরের দিক থেকে বর্বর ও অসভ্য জাতি রোমের প্রাক্তন অঞ্চলগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য উঠে পড়ে লাগে। নিরীহ বাসিন্দাদের ওপর বর্বর হামলা চালানো থেকে শুরু করে লুটপাট প্রতিদিন খুব সাধারণ ঘটনা হয়ে দাড়ায়। এসব হামলা থেকে বাঁচতে বাসিন্দারা তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেতে থাকে। ভূমি ছেড়ে তারা জলাভূমির ওপরই বাসস্থান নির্মাণ করতে শুরু করে। এভাবেই বালুময় তিনটি দ্বীপ- টরসেলো, জেসোলো এবং মালামোক্কোর কাছেই শুরু হয় ভেনিস শহরের নির্মাণ।

আলো আঁধারের ভেনিস

শুধুমাত্র বর্বর জাতির হামলা থেকে বাঁচার তাগিদেই সাময়িক সময়ের জন্য এই নির্মাণকাজের কথা ছিলো। তবে ধীরে ধীরে তা স্থায়ী রূপ নেয়া শুরু করে। শুরুর দিকে এই কাজ শুধুমাত্র জেলেদের পরিবারের ছিলো। অর্থাৎ যাদের সাঁতার এবং পানির ওপর ভেসে ভেসে ঘুরে থাকার অভিজ্ঞতা দু’টোই রয়েছে, তাদের মধ্যেই আবদ্ধ ছিলো। তবে পরের দিকে তা বিস্তৃতি লাভ করতে শুরু করে। প্রথমদিকে কম মানুষ থাকায় কিছু কাঠ, খড় এবং মাটির সহায়তায় কম ওজনের বাড়িঘর তৈরি করে বসবাসের কাজে ব্যবহার করা হয়। তবে পরবর্তী সময়ে অস্থায়ী বাসস্থানে প্রচুর মানুষের ধকল সামলাতে মজবুত এবং শক্ত ভিত্তির প্রয়োজন হয় সেখানকার বাসিন্দারা

দিনে দিনে এসব জায়গায় মানুষের আগমনের কারণ ছিল বহিঃশত্রুদের আক্রমণ। এদের জন্য জলাভূমিতে আক্রমণ করা কষ্টকর ছিল। সেজন্যই ধীরে ধীরে সবাই নিজেদের আবাসস্থল ছেড়ে সমুদ্রের ওপরই বসবাসের সিদ্ধান্ত নেয়। বাসস্থানের ভিত্তিকে মজবুত এবং টেকসই করতে কোনো শক্ত মাধ্যমের প্রয়োজন আছে। আর এক্ষেত্রে বাসিন্দারা এই প্রয়োজনীয়তা পূরণ করতে ব্যবহার করে কাঠ। কাঠের পাটাতন ও খুঁটি একের পর এক জোড়া লাগিয়ে শুরু হয় ভেনিস নির্মাণের কাজ। দুর্ভোগের সময় ভিত্তি তৈরির জন্য শুধু কাঠের যোগাড় করাই তাদের পক্ষে সম্ভব ছিলো। তাছাড়া এসব নির্মাণকাজে ব্যবহারের জন্য তখন আধুনিক যন্ত্রপাতিও ছিলো না। তাই কাঠই হয়ে দাড়ায় তাদের ভিত্তি নির্মাণের মূল উপকরণ।

রেস্টুরেন্টে মানুষের ভিড়

নির্মাণ ও টিকে থাকার রহস্য

সাধারণত কোনো ভবন বা সেতু তৈরিতে লোহার বা কোনো শক্ত মাধ্যম ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আসল কথা হলো, এমন কোনো ভিত্তি লাগবে, যা কাঠামোর ভার নিতে পারবে এবং দীর্ঘমেয়াদেও সহজে নষ্ট হবে না। লোহা এবং কংক্রিটের ব্যবহার দেখে অভ্যস্ত লোকেদের কাঠের ভিত্তির ওপর এমন নির্মাণ দেখে আশ্চর্য হতেই হয়। আর কিছু না হোক, পানির নিচে কাঠের খুঁটি থাকা সত্ত্বেও তা পচে যাচ্ছে না। কেন? তা তো ভাবার মতোই একটি বিষয়! এসব ভিত্তিতে কোনো রকম পচন দেখা যায়নি ভেনিসের ক্ষেত্রে।

ভেনিস শহর নির্মাণে ব্যবহৃত হয় ওক এবং লার্চ গাছের কাঠ। প্রায় ৬০ ফুট লম্বা কাঠের খুঁটি পানির নিচে নরম কাদা এবং পাথরের নিচে শক্ত করে প্রতিস্থাপিত হয়। শত শত বছর ধরে পানির নিচে থাকা এসব গাছের কাঠের তৈরি খুঁটি এবং তক্তাই নগরীর ভবনগুলোকে নিজের জায়গায় ধরে রেখেছে। স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন জাগে, কাঠের খুঁটিগুলো এত বছর ধরে পানির নিচে থাকা সত্ত্বেও টিকে আছে কীভাবে? এতদিনে তো  এগুলো পচে নষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা!

রং বেরঙের বাড়ি ঘর

এক্ষেত্রে কিছু বৈজ্ঞানিক যুক্তি দিয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যায়। কাঠের পচন শুধুমাত্র তখনই শুরু হয়, যখন পরিবেশে পানি এবং অক্সিজেন উভয়ই উপস্থিত থাকে। গভীর সমুদ্রে বা জলাশয়ে অক্সিজেন অনুপস্থিত। যদি থাকেও, তাহলে তা পরিমাণে একেবারেই নগণ্য। আর একারণেই পানির গভীরে থাকার পরও কাঠে পচন ধরতে পারে না। ফলে, নগরীর ভিত্তিগুলোও শক্তভাবে টিকে আছে। তাছাড়া ভিত্তিগুলো তৈরিতে ব্যবহৃত ওক এবং লার্চ গাছের কাঠ অত্যন্ত পানি প্রতিরোধী। ভেনিস নগরী টিকে থাকতে পারত না যদি তার ভিত্তিগুলো নড়বড়ে হতো কিংবা সরে যেত। এ যাত্রাও সফলভাবে পার করতে সক্ষম হয়েছে শহরটি।

সাগরের গভীরে পলিমাটির নিচে একটি স্তর থাকে, যা শক্ত মাটি দিয়ে তৈরি। একে বলা হয় ক্যারান্টো। লবণাক্ত পানিতে থাকা খনিজ পদার্থ দিয়েই তৈরী স্তরটি। এ স্তরে খুঁটিগুলো স্থাপন করার ফলে ভিত্তিও বেশ মজবুত হয়। তাছাড়া জলাভূমির গভীরে থাকা খুঁটির নিচের অংশে প্রতিনিয়ত নুড়ি, পাথর, মাটি এসে জমা হয় । যা খুঁটিগুলোর সঙ্গে মাটির সংযোগ আরো মজবুত করে। ফলে দিনের পর দিন খুঁটি সরে যাওয়ার বদলে তা আরো টেকসই হয়। কাঠ এসব পলিমাটি শোষণ করে শক্ত খুঁটিতে পরিণত হয়েছে। আর এক্ষেত্রে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি সহায়তা করেছে। পানিতে থাকা খনিজ পদার্থগুলো এই ভিত্তি শক্ত করতে ভূমিকা রেখেছে।

ওপর থেকে ভেনিস নগরী

১৭ শতকে লেখা একটি বইয়ের তথ্য মোতাবেক ভেনিস শহরে অবস্থিত সান্তা মারিয়া ডেলা স্যালুট চার্চ নির্মাণে ব্যবহৃত হয়েছে ১১ লাখ ৬ হাজার ৬৫৭টি কাঠের খুঁটি। প্রতিটি খুঁটির উচ্চতা ছিল প্রায় ৪ মিটার। চার্চটি নির্মাণ করতে সময় লাগে দুই বছর দুই মাস। প্রক্রিয়াটি বেশ কষ্টকর, তাই সময় বেশি লাগারই কথা। তাছাড়া কাঠের যোগাড় করতে হতো অন্য জায়গা থেকে। আর যোগাড় করে পানিপথে আনা হতো কাঠগুলো। এ শহর নির্মাণের জন্য ব্যবহৃত কাঠগুলোর অধিকাংশই আসে স্লোভেনিয়া, ক্রোয়েশিয়া এবং মন্টিনিগ্রো থেকে। এভাবেই নির্মিত হয় ভেনিস নগরী। তবে অনন্য সৌন্দর্যে ঘেরা শহরটির পরিস্থিতি এখন অবনতির পথে। কাঠের ভিত্তির উপর তৈরি ভাসমান নগরী ভেনিস ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে পানির নিচে।

গণ্ডোলা, ভেনিসবাসীর যাতায়াতের একমাত্র বাহন

২০০০ থেকে ২০১০ সালের এক হিসাবে দেখা গেছে, প্রতি বছর গড়ে শূন্য দশমিক ৪ থেকে শূন্য দশমিক ৮ ইঞ্চি ভূমি চলে যাচ্ছে সাগরের নিচে। এর একটি কারণ অবশ্যই সমুদ্রের পানির স্তর বেড়ে যাওয়া। আর এর পেছনে দায়ী বৈশ্বিক উষ্ণতা। তবে, এই একটি কারণেই ঐতিহ্যবাহী ভেনিস শহরকে এই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে না। আরো কারণ রয়েছে। যেমন- মাটির গভীর থেকে প্রতিনিয়ত পানি উত্তোলন করা। এর ফলে সমুদ্রের তলদেশের খনিজ স্তর আরো নিচের দিকে চলে যাচ্ছে। ফলে শহরটির ভিত্তি হয়ে যাচ্ছে দুর্বল। তবে মাটির গভীরতলে পানি উত্তোলন হওয়ায় এই ঝুঁকি কমে গেলেও বাকি ঝুঁকি রয়েই গেছে।

ভেনিসের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নাম সান পোলো বিমানবন্দর। সারা বছরই ট্যুরিস্টদের আনাগোনা থাকে ভেনিসে। তবে মে থেকে সেপ্টেম্বর সবচেয়ে বেশি পর্যটক দেখা যায়। প্রতি বছর ২০ মিলিয়ন পর্যটক ভেনিসে আসে। সময় ও সুযোগ থাকলে ঘুরে আসুন স্বপ্নের নগরী ভেনিসে।

 

মন্তব্য করুন

খবর অনুসন্ধান

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০  

সর্বশেষ নিউজ

আরো পড়ুন

Shares