সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০, ৬:৩৯ এএম

১২ বছর বাড়ি ভাড়া দেন না ইউএনও অফিসের মালি

খালেদ বিন ফিরোজ, নওগাঁ প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: ৬:২৩ অপরাহ্ন, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২০, শনিবার


১২ বছর বাড়ি ভাড়া দেন না ইউএনও অফিসের মালি

ছবি : সংগৃহীত

নওগাঁর ধামইরহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইউএনও অফিসের চুক্তিভিত্তিক বর্তমান মালি আব্দুল বারিক ও সাবেক মালি বুলবুল হোসেন ১২ বছর ধরে বাড়ি ভাড়া ও ব্যবহৃত বিদ্যুৎ বিল না দিয়েই সরকারি বাসা ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ধামইরহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইউএনওর খুঁটির জোরে বাড়ি ভাড়া (প্রায় ১০ লাখ টাকা) সরকারি কোষাগারে জমা না দেয়ায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছে স্থানীয় সচেতন মহলে।

বুলবুল হোসেন ও আব্দুল বারিকের বাড়ি জয়পুরহাট জেলার আক্কেলপুর উপজেলার অনন্তপুর গ্রামে। তারা সম্পর্কে চাচা ও ভাতিজা। চাচা দীর্ঘদিন এই উপজেলা শাসন করে যাবার সময় তার ভাতিজা আব্দুল বারিককে (মাস্টারুল) তার জায়গায় রেখে যান।

বর্তমানে ধামইরহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বারিকের পরামর্শে সকল কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন বলে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে প্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ স্থানীয় মানুষদের মাঝে।

উপজেলা পরিষদ সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে একই উপজেলার হিসাবরক্ষণ অফিসের অফিস সহায়ক হিসেবে কর্মরত বুলবুল দীর্ঘদিন (২০০৩ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত) ইউএনও’র বাসায় ও অফিসে কর্মরত থাকলেও মূলত তিনি ছিলেন উপজেলা পরিষদের একজন মালি।
এরপর উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিসের অফিস সহায়ক হিসেবে নিয়োগ পাওয়াই ইউএনও’র সহযোগিতায় ভাতিজা আব্দুল বারিককে তার নিজের পদে নিয়োগের ব্যবস্থা করেন। অতঃপর আব্দুল বারিক তার ছোট ভাই সুজনকে ইউএনও’র সহযোগিতায় একই উপজেলার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের নৈশপ্রহরী হিসেবে নিয়োগের ব্যবস্থা করে পারিবারিক শক্তি পাকাপোক্ত করেন।

কিন্তু বুলবুল মালি পদে যোগদানের পর কর্তৃপক্ষের অনুমতি না নিয়েই উপজেলা পরিষদ এলাকায় কর্মচারীদের জন্য নির্মিত সরকারি ‘কর্ণফুলী’ বাসভবনের নীচতলার পশ্চিমপাশের একটি ফ্ল্যাটে পরিবার নিয়ে দীর্ঘ প্রায় ৯ বছর বসবাসের পর গত তিন বছর যাবত একই ফ্ল্যাটে অস্থায়ীভাবে নিয়োগ পাওয়া আব্দুল বারিক তার পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন।

বুলবুলের মূল বেতন ছিলো ১২ হাজার টাকা। ওই বেতনের ৪০ শতাংশ হিসাবে প্রতি মাসে বাড়তি ভাড়া বাবদ পান ৩ হাজার টাকা। সরকারি বাড়িতে বসবাস করলে প্রতি মাসে বাসা ভাড়ার টাকা কেটে বেতন উত্তোলন করতে হয়। কিন্তু বুলবুল এবং আব্দুল বারিক যোগদানের পর থেকে চলতি বছরের আগস্ট মাস পর্যন্ত অর্থাৎ গত প্রায় ১২ বছর বেতন থেকে বাড়ি ভাড়ার টাকা জমা করেননি।

এভাবে বাড়ি ভাড়া বাবদ ১০ লাখ ১০ হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না করে তারা আত্মসাৎ করেছেন। পাশাপাশি অদৃশ্য খুঁটির জোরে বুলবুল প্রায় একযুগ ধরে একই কর্মস্থলে থাকায় তিনি তার পরিবারের একের পর এক সদস্যকে চাকরিতে নিয়োগের ব্যবস্থা করছেন।
অথচ বিধি মোতাবেক ৩য়/৪র্থ শ্রেনির এসব পদে স্থানীয়দের নিয়োগ পাওয়ার কথা। একই সঙ্গে স্থানীয় এক ব্যক্তির মাধ্যমে কয়েক লক্ষাধিক টাকা স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে সুদের ওপরে দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে বারিকের বিরুদ্ধে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, আব্দুল বারিক উপজেলা পরিষদের পুকুরে মাছের চাষ করছেন পরিষদের বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। এতে করে দিবারাত্রি ২৪ ঘণ্টা বৈদ্যুতিক মোটর চালিয়ে পানির ঝর্ণার চালু রাখা হয়। এসব বিষয় সকলে জানলেও হয়রানির ভয়ে অভিযোগ করতে সাহস পান না কেউ।
নাম-পরিচয় গোপন করে একজন উপজেলা কর্মকর্তা বলেন, উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান দেলদার হোসেনের সময় বুলবুলের নিকট সরকারি বাসা ভাড়া বাবদ প্রায় ৭লক্ষ টাকা পাওনা ছিল। এ বিষয়ে তার বিরুদ্ধে একটি অভিযোগও ছিল।

তিনি বলেন, পদের দিক থেকে বারিক মালি হলেও ইউএনও’র মদদপুষ্ট ও আস্থাভাজন হওয়ায় তার দাপটে অফিসে প্রবেশ করাই মুশকিল। বর্তমান নির্বাহী কর্মকর্তা উপজেলার সকল উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী দ্বারা দেখভাল করার নিয়ম থাকলেও অস্থায়ী পদে থাকা মালি বারিক সেই কর্মকান্ডগুলো দেখভাল করে আসছেন। বারিক যা বলে সেই অনুপাতে উপজেলা প্রশাসনের কাজ হয়। এতে করে অনেকটাই অসন্তোষ স্থানীয় পর্যায়ের চেয়ারম্যানসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষরা।

সরকারি বাস ভবন কর্ণফুলীতে দীর্ঘ নয় বছর বসবাসের বিষয়টি স্বীকার করলেও বুলবুল বলেন বাসা ভাড়ার বিষয়টি ইউএনও স্যার জানেন। একই বিষয়ে আব্দুল বারিক বলেন, আমি যে ভবনে বসবাস করছি, সেটি অনেক পুরোনো এবং পরিত্যক্ত ভবন।

তবে পরিত্যক্ত ভবনে অন্য স্টাফরা কিভাবে বসবাস করছেন এমন প্রশ্ন করা হলে বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে তিনি বলেন, এসব বিষয় ইউএনও স্যার জানেন এবং স্যার আমাকে থাকতে বলেছেন।
বাসা বরাদ্দ কমিটির সদস্য সচিব ও উপজেলা প্রকৌশলী আলী হোসেন বলেন, উপজেলা পরিষদে তৃতীয় শ্রেণির স্টাফদের জন্য নির্মিত কর্ণফুলী ভবনটি পরিত্যক্ত নয়। কারণ ওই ভবনে তিনজন বাসা বরাদ্দ নিয়ে বসবাস করছেন। অথচ আব্দুল বারিক কর্তৃপক্ষের অনুমতি না নিয়ে ও সাকারি বিধি না মেনে দীর্ঘদিন ধরে বিনা ভাড়ায় সরকারি বাড়ি ব্যবহার করছেন। এর আগে তার চাচা বুলবুল হোসেনও দীর্ঘদিন যাবত বাসা ভাড়া না দিয়েই ওই ফ্লাটে বসবাস করেছেন।
তিনি বলেন, ৪র্থ শ্রেনির কর্মচারী হিসেবে তাদের কারোই এসব সরকারি বাসা ব্যবহার করার সুযোগ নেই। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গনপতি রায় দীর্ঘদিন বাসা ভাড়া না দেয়ার বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, উপজেলা পরিষদের এই ভবনটি বেশ পুরোনো এবং পরিত্যক্ত।
ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করে কোনো রেজুলেশন করা হয়েছে কি-না এমন প্রশ্নের উত্তরে বলেন, এখনো করা হয়নি তবে আগামী মাসের সমন্বয় সভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

মন্তব্য করুন

সর্বশেষ নিউজ

আরো পড়ুন