মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২০, ৫:৫৩ এএম

করোনাকালে পথে পথে সাহায্য চাচ্ছে অভাবী মানুষ

প্রতিদিনের কাগজ ডেস্ক:
প্রকাশিত: ১০:৫০ পূর্বাহ্ন, ২০ জুন ২০২০, শনিবার


করোনাকালে পথে পথে সাহায্য চাচ্ছে অভাবী মানুষ

ছবি : বাংলানিউজ । রাস্তার পাশে বসে আছেন অভাবী মানুষ

দেশে করোনার প্রকোপ শুরুর পর থেকেই নিম্ন আয়ের বহু মানুষ হয়ে বেকার হয়ে পড়েছেন। ক্রমে ক্রমে বেকার হয়ে নিম্ন মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্তদেরও অনেকে। করোনা মহামারির মুখে দেশে বেকার হয়ে পড়া নিম্ন আয়ের অনেক মানুষকেই বর্তমানে পথে পথে সাহায্য চাইতে বা ভিক্ষা করতে দেখা যাচ্ছে। কেবলমাত্র এক বেলার খাবার জোগাড় করার জন্যও রাস্তার পাশে বসে আছেন অনেক অভাবী আর দুঃস্থ মানুষ।

শুক্রবার (১৯ জুন) সরেজমিনে রাজধানীর ফার্মগেট, ভাষানটেক, মাটিকাটা, ৩০০ ফিট, নতুন বাজার, কাওরান বাজার ও মিরপুর এলাকা ঘুরে এমন চিত্রই দেখা যায়।

কাওরান বাজারে ভিক্ষা করছিলেন জোবেদা আক্তার (৫০) নামের এক মহিলা। তার ব্যাপারে জানতে চাইলে জানান, ৩০ বছর আগে নীলফামারী থেকে ঢাকায় আসেন তিনি। একাকী জীবনের বেশিরভাগ সময় মানুষের বাসায় কাজ করেছেন। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির কারণে এখন তার কাজ নেই।

জোবেদা বলেন, করোনা শুরু হওয়ার পর থাইকা আমি আর বাসা-বাড়িতে কাজ করতে পারতেছি না। কাজ করতে গেলে বাসাবাড়ির অ্যাপার্টমেন্টের দারোয়ানরা ঢুকতে দেয় না। অহন একবেলা এক মুঠা খাওয়ার জন্য হাত পাইতা রাস্তার ধারে বইসা আছি। যে যা পারে, তাই দেয়, তাই দিয়াই কোনো মতে খাইয়া দিন পার করতাছি। করোনার কারণে আমারে এহন পথে পথে ভিক্ষা করতে হইতাছে।

মাটিকাটা এলাকার একটি সিএনজি পাম্পের সামনে সড়ক আইল্যান্ডের ওপর বসে ছিলেন সাফিয়া নামের আরেক নারী। চলাচলের সময় গাড়ি থামিয়ে কেউ কেউ তাকে টাকা বা খাবার দেন। সেই সাহায্য নিয়েই সাফিয়া পরিবারে মানুষদের দিচ্ছেন।

এই পরিণতির কথা জানতে চাইলে সাফিয়া বলেন, দুই-তিন মাস আগে যহন রাস্তার কাজ হইতো লেবারির কাজ করতাম। এর লগে রাইতে ভাঙ্গাড়ি আর কাগজ টুকাইতাম। করোনার লাইগা সড়কের কাম বন্ধ, ভাঙ্গাড়ি টুকানির কামও করতে পারি না। জামাই আর মাইয়া-পোলা লইয়া ৬ জনের সংসার আমার। যে যেমনে পারি মাইনষের কাছে সাহায্য চাইয়া, ভিক্ষা করে আইনা খাইয়া-পইরা দিন পার করতাছি।

ভাষানটেক এলাকাতেই রাস্তার পাশে বসে থাকতে দেখা যায় মোমেনা আক্তার নামের এক বৃদ্ধাকে। স্বামী হারিয়ে ১৫ বছর আগে কিশোরগঞ্জ থেকে ঢাকায় আসেন তিনি।

মোমেনা বলেন, মাইয়ার জামাইর বাসায় থাকতাম আর রাস্তায় কাগজ টোকাইতাম। করোনায় সেই কাম বন্ধ। তিন মাস ধইরা প্রত্যেক দিন মাইয়ার জামাইর লগে থাকা-খাওয়া নিয়া ঝগড়া হয়। বাসায় খাবারও দেয় না। দুই মাস ধইরা পথে পথে ঘুরি, মাইনষের কাছে সাহায্য চাই। কহনো পাই, কহনো পাই না। লগে টাকা না থাকলে, মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খাবার চাইয়া খাই। বিষ্যুদবার ১০০ টাকা পাইছিলাম। শুক্কুরবার দুপুর পর্যন্ত পাইছি ২০০ টাকা। এমনেই দিন গুজরান করি।

৩০০ ফিট রাস্তার পাশে সাহায্যের জন্য হাত পেতে বসে আছেন খিলক্ষেতে থাকা পারুল। তিনিও বিবাহিত মেয়ের বাসায় আশ্রিত ছিলেন। বলেন, প্রতিবেলায় মাইয়ার জামাইর লগে খাওয়া নিয়া ঝগড়া হয়। অনেক কথা শুনায়। আমার মাইয়াটা গার্মেন্টসে চাকরি করতো, গার্মেন্টসটাও বন্ধ হইয়া গেছে। বাসা ভাড়া দিতে পারতাছিনা। ৩ মাসের ভাড়া বকেয়া পড়েছে। তাই এইহানে বইসা সাহায্য চাই। কিন্তু এহন এইহানে পুলিশও বসপার দেয় না। এক-দুই মাস আগে মানুষ না চাইলেও সাহায্য দিত। অহন চাইলেও আর দেয় না। পরশুদিন এইহানে বইসা ১০০ টাকা পাইছি। আইজকা বিকাল হইয়া গেল, অহন পর্যন্ত একটা টাকাও পাই নাই।

একই জায়গায় তার সঙ্গে বসে আছেন মুন্নি (৫০) নামের আরেক নারী। তিনি এক বাসায় বুয়ার কাজ করতেন। করোনার কারণে ওই বাড়িতে আর কাজের লোক ঢুকতে দেয় না।

মুন্নি বলেন, যে ম্যাডামের বাসায় কাজ করতাম সেই ম্যাডাম এখন অসুস্থ। তার লগে যোগাযোগ করতে পারতাছিনা। ওই বাড়িতে ঢুকতে দেয় না গেটের দারোয়ান। আমার একটা পোলা যমুনা মার্কেটের একটা দোকানে কাজ করতো। করোনায় দোকানটা বন্ধ। পোলাডা অহন বেকার। না পারতে বাধ্য হইয়া এই রাস্তার পাশে সাহায্যের জন্য বইসা আছি। দুই মাস আগে আসলেই এইহানে বইলে বড় লোকেরা অনেক সাহায্য দিত। অহন আর দেয় না। যাগোর ভাগ্য ভালা, এহন তারাই সাহায্য পায়, সবাই পায় না।

মন্তব্য করুন

সর্বশেষ নিউজ

আরো পড়ুন