২২, আগস্ট, ২০১৯, বৃহস্পতিবার | | ২০ জ্বিলহজ্জ ১৪৪০


ইতিহাসের পাতায় নেত্রকোনা

রিপোর্টার নামঃ মোঃ চাঁন মিয়া ফকির | আপডেট: ২২ মে ২০১৮, ০৪:০৭ পিএম

ইতিহাসের পাতায় নেত্রকোনা
মোঃ চাঁন মিয়া ফকির, শিক্ষক,গবেষক ও লেখক।

আমার প্রিয় নেত্রকোনা জেলা। বাংলাদেশে এর অবস্থান স্থানাঙ্ক: ২৪ ডিগ্রি ৫২’ ৪৮” উত্তর ৯০ ডিগ্রি ৪৩’ ৪৮” পূর্ব। ময়মনসিংহ বিভাগের একটি জেলা যার উত্তরে ভারতের মেঘালয় রাজ্য, দক্ষিণে কিশোরগঞ্জ জেলা; পূর্বে সুনামগঞ্জ জেলা ও পশ্চিমে ময়মনসিংহ জেলা। মোট আয়তন ২,৮১০,২৮ বর্গ কি.মি. (১০৮৫.০৬ বর্গমাইল)।


    খ্রিষ্টীয় চতুর্থ শতাব্দিতে এ অঞ্চল গুপ্ত সম্রাটগণের অধীন ছিল। সমুদ্রগুপ্তের অধীনস্থ এ অঞ্চলসহ পশ্চিম ময়মনসিংহ কামরুপ রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। ৬২৯ খ্রিষ্টাব্দে হিন্দুরাজ শশাংকের আমন্ত্রণে চৈনিক পরিব্রাজক হিউ এন সাঙ যখন কামরূপ অঞ্চলে আসেন, তখন পর্যন্ত নারায়ণ বংশীয় ব্রাহ্মণ কুমার ভাস্কর বর্মণ কর্তৃক কামরূপ রাজ্য পরিচালিত ছিল। খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দির শেষভাগে পূর্ব ময়মনসিংহের উত্তরাংশে পাহাড় মুল্লুকে বৈশ্যগারো ও দূর্গা গারো তাদের মনগড়া রাজত্ব পরিচালনা করতো। ত্রয়োদশ শতাব্দির শেষ দিকে জনৈক মুসলিম শাসক পূর্ব ময়মনসিংহ অঞ্চল আক্রমণ করে অল্প কিছুদিনের জন্য মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। চতুর্দশ শতাব্দীতে জিতারা নামকএকজন সন্ন্যাসী কামরূপের তৎকালীন রাজধানী ভাটী অঞ্চল আক্রমণ ও দখল করেন। সে সময় পর্যন্তও মুসলিম শাসক ও অধিবাসী স্থায়ীভাবে অত্রাঞ্চলে অবস্থান ও শাসন করতে পারেনি। খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষভাগে আলাউদ্দিন হোসেন শাহের শাসনামলে (১৪৯৩-১৫১৯) সমগ্র ময়মনসিংহ অঞ্চল মুসলিম রাজত্বের অন্তর্ভূক্ত হয়।

    আলাউদ্দিন হোসেন শাহের পুত্র নসরৎ শাহের শাসনামলে (১৫১৯ - ১৫৩২) দু একবার বিদ্রোহ সংঘটিত হলেও বিদ্রোহীরা সফল হয়নি। নসরৎ শাহের উত্তরাধিকারীরা (১৫৩৩ - ১৫৩৮) কিংবা তার পরবর্তী লক্ষ্মনাবতীর অন্য শাসকেরা ময়মনসিংহ অঞ্চলের উপর আধিপত্য বজায় রাখতে পারেনি। ময়মনিংহের উত্তরাংশ কোচদের পুনরাধীন হয়ে পড়ে বাকী অংশ দিল্লীর পাঠান সুলতান শেরশাহ্্ এর (১৫৩৯ - ১৫৪৫) শাসনভুক্ত হয়েছিল। তৎপুত্র সেলিম শাহের শাসনের সময়টি (১৫৪৫ - ১৫৫৩) ছিল বিদ্রোহ ও অস্থিরতায় পূর্ণ। রাজধানী দিল্লী থেকে অনেক দূরে ও কেন্দ্রিয় রাজশক্তির দূর্বলতার সুযোগে প্রধান রাজস্ব সচিব দেওয়ান সুলায়মান খাঁ (যিনি পূর্বে কালিদাস গজদানী নামে পরিচিত ছিলেন)। স¤্রাটের বিরুদ্ধাচরণ করেন। ফলে দেশী ও বিদেশী রাজ্য লিপ্সুরা এতদঞ্চল দখলের প্রয়াস পায়। এর মধ্যে ভাটী অঞ্চল (পূর্ব - উত্তরাংশ) সোলায়মান খাঁ-র দখলভূক্ত ছিল। কেন্দ্রিয় শাসকের প্রেরিত সৈন্যদের হাতে সোলায়মান খাঁ নিহত হলেও তার দু’পুত্রের মধ্যে জ্যেষ্ঠ পুত্র ঈশা খাঁ খিজিরপুর থেকে ভাটী অঞ্চলের শাসন কার্য পরিচালনা করেন। ১৫৯৯ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে ঈশা খাঁর মৃত্যুর পর তৎপুত্র মুসা খাঁ ও আফগান সেনা খাজা উসমান খাঁ কর্তৃক অত্রাঞ্চল শাসিত ছিল। স¤্রাট জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালে (১৬০৫ - ১৬২৭) সমগ্র ময়মনসিংহ অঞ্চল মোঘল সা¤্রাজভূক্ত হয়।

    ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর শাসনামলে ১৭৬৩ খ্রিস্টাব্দে ফকির মজনু শাহ-র (নবাব নুরুদ্দিন বাকের মোহাম্মদ জঙ্গ বাহাদুর) নেতৃত্বে ইংরেজ বিরোধী ফকির সন্ন্যাসীদের তীব্র প্রতিরোধ আন্দোলন শুরু হয়। ১৭৮৮ খ্রীঃ ২৬ জানুয়ারি ভারতের মাখনপুরে যুদ্ধাহত মজনু শাহ বিনা চিকিৎসায় মারা যান। এ আন্দোলনের ময়মনসিংহ এরিয়ার হাল ধরেন করম শাহ। তাঁর নেতৃত্বে যে আন্দোলন হয় তাই ঐতিহাসিক পাগলপন্থী কৃষক বিদ্রোহ। করম শাহ পাগলপন্থী ফকির পাগলপন্থী কৃষক বিদ্রোহের জনক। পূর্বধলার ঘাঘড়া ইউনিয়নের লেটিরকান্দা গ্রাম থেকে পাগলপন্থী কৃষক বিদ্রোহের জনক করম শাহ পাগলপন্থী ফকির ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর শাসন বিরোধী আন্দোলনের সক্রিয় নেতৃত্ব দেন। করম শাহ এর জ্যেষ্ঠ পুত্র ছপাতি শাহ-র স্বাধীন রাজ্য স্থাপনের চেষ্টা, কনিষ্ঠ পুত্র টিপু শাহ পাগলপন্থী ফকিরের নেতৃত্বে গারো, হাজং, মুসলিম, হিন্দুসহ সকল কৃষক সমাজের সসন্ত্র বিদ্রোহ ও শেরপুর আক্রমণ ও বিজয় এর মধ্যে দিয়ে ১৮২৫ সালে স্বাধীন রাজ্য স্থাপন করেন। ইত্যাদির প্রেক্ষিতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী তাদের দমন কল্পে বিভিন্ন থানা স্থাপন সহ সৈন্য বাহিনী মোতায়ন করেন। এ সকল স্বাধীনতা কামীদের আন্দোলন ও বিদ্রোহের ফলে শাসক শ্রেণি শংকিত হয়ে পড়েছিল। ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দের ২৭ মে ময়মনসিংহের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মি. ডানাবার কর্তৃক জামালপুরে অবস্থানরত ইংরেজ সেনাবাহিনীর অধ্যক্ষ মেজর মন্টিথের কাছে যে পত্রটি প্রেরণ করেছিল তা থেকে সহজেই অনুমান করা যায় গারো পাহাড়ের পাদদেশের অবস্থা তৎকালীন সময়ে কেমন ছিল - পত্রটির বঙ্গানুবাদ এরূপঃ-   

     “আমি অতীব দুঃখের সহিত জানাইতেছি যে, এই জেলার শান্তি এইরূপ গুরুতর রূপে বিঘিœত হইয়াছে যে, নিয়মিত সৈন্যবাহিনী ব্যতিত বিদ্রোহ দমন ও পুনরায় শান্তি স্থাপনের কোন সম্ভাবনা নাই। বিদ্রোহীরা তাদের স্বাধীনতা লাভের পরিকল্পনানুযায়ী বহু আক্রমণাত্মক ক্রিয়াকলাপ চালাইয়া যাইতেছে এবং আপাতত শেরপুর ও গারো পাহাড়ের মধ্যবর্তী বিস্তীর্ণ অঞ্চল সম্পুর্ণ অধিকার করিয়া ফেলিয়াছে। তাহারা এখন সকল প্রজার নিকট হইতে কর আদায় করিতেছে এবং শেরপুর আক্রমণের জন্য লোকসংখ্যা বৃদ্ধি করিতেছে। এই অবস্থায় আপনাকে বিনীত ভাবে অনুরোধ করিতেছি যে, আপনি অবিলম্বে প্রয়োজনীয় সামরিক সাহায্য প্রেরণ করিয়া আমাকে সাহায্য করুন। পাগলপন্থী বিদ্রোহীগণ পরগণার বিভিন্ন স্থানে চারিশত হইতে পাঁচশত করিয়া লোক সমাবেশ করিতেছে। তাহাদের মুল বাহিনীর লোক সংখ্যা সম্ভবত চারি সহস্র হইতে পাঁচ সহস্রের মধ্যে। তাহাদের পরিচালকের নেতৃত্বে বিদ্রোহীগণ বল্লম, তরবারি এবং বিষাক্ত তীর ও ধনুক দ্বারা-সুসজ্জিত। ইহা ব্যতিত তাহারা কতিপর বন্দুকও সংগ্রহ করিয়াছে।”

    পাগলপন্থী আন্দোলনের বিভিন্ন নথিপত্র দৃষ্টে মনে হয়, পাগলপন্থী টিপু শাহের বিদ্রোহের পূর্বেই নাটেরকোনা গ্রাম থেকে চৌকিদার, বরকন্দাজদের পরিচালনা করা হতো। কেননা পাগলপন্থী করম শাহ-র আন্দোলনে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী প্রশাসন যেমন ছিল ব্যতিব্যস্ত তেমনি ছিল শংকিত। কালীগঞ্জ ছিল তৎকালে এক অখ্যাত স্থান, যার নামকরণ সহ জনবসতি গড়ে উঠেছে নবাব মুর্শিদকুলী খাঁ-র শাসনকালে। তৎকালে এতদাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা জলপথ অর্থাৎ জলযান ছাড়া বিকল্প অন্য কিছু ছিলনা। তাই যোগাযোগের চিন্তা করেই কালীগঞ্জে ইরেজদের শারীরিক অবস্থান থাকলেও দাপ্তরিক কাজে কালীগঞ্জের পরিবর্তে পূর্বের অবস্থান অর্থাৎ নাটেরকোণা নামকেই ব্যবহার করতো। তাদের উপর পর্যায় থেকে যোগাযোগের ও কাগজ পত্রাদি নাটেরকোণা লিখেই প্রেরিত হতো। ইংরেজদের ভাষায় অর্থাৎ ইংরেজীতে ঘঅঞজকঙঘঅ স্থলে ঘঊঞজকঙঘঅ এরূপ লিখায় উচ্চারণে কাছ কাছি হলেও শব্দটি অপভ্রম হয়ে যায়। ইংরেজদের উচ্চারণে নাটেরকোণা > নেটেরকোণা > নেতেরকোণা শব্দে রূপান্তরিত হয়। সেখান থেকেই বাংলায় নেত্রকোণা ইরেজিতে ঘঊঞজঅকঙঘঅ নামকরণ হয়ে কালীগঞ্জ নামের অপমৃত্যু ঘটায়।

    উপযুক্ত কারণে ব্রিটিশ সরকার অনুধাবন করতে পেরেছিলেন অত্র অঞ্চলে তাদের স্থায়ী প্রশাসনিক কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। তাই তারা নেত্রকোণার বরকন্দাজ থানাকে ০১ অক্টোবর ১৮৭৪ খ্রিস্টাব্দে আধুনিক পুলিশ থানায় রূপান্তর করেন (ঘড়ঃরভরপধঃরড়হ ঘড়. ১২১.উযধশধ ১ংঃ ঙপঃড়নবৎ ১৮৭৪)।

    একই কারণে গারো পাহাড় অঞ্চলসহ সমগ্র নেত্রকোণাকে ব্রিটিশ শাসন ক্ষমতায় রাখার লক্ষ্যে ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সরকার মহকুমা মঞ্জুর করে। ৩ জানুয়ারী ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে মহকুমা কার্যক্রম শুরু হয়। মহকুমা প্রশাসনের দায়িত্ব পালনের জন্য ক্ষেত্রগোপাল রায়কে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করা হয়। ১ জানুয়ারী ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে নেতকোণা মিউনিসিপ্যালিটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে নেত্রকোণা সদর থানায় আধুনিক পুলিশ ব্যারাক পরিদর্শন বাংলো নির্মাণ করা হয়। ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে নেত্রকোণা মিউনিসিপ্যালিটিকে টাউন কমিটিতে রূপান্তর করা হয়। বাংলাদেশ লোকাল কাউন্সিল এন্ড মিউনিসিপ্যাল কমিটিজ (এ্যামেন্ডমেন্ট) অর্ডার ১৯৭২ মোতাবেক নেত্রকোণা টাউন কমিটি পৌরসভায় রূপান্তরিত হয়।

    ১৭ জানুয়ারি ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের এক প্রজ্ঞাপন মূলে নেত্রকোণা মহকুমাকে জেলা ঘোষণা করা হয়। ১ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে আনুষ্ঠানিকভাবে নেত্রকোণা জেলার কার্যক্রম শুরু হয়। নতুন নেত্রকোণা জেলার প্রথম জেলা প্রশাসক হন এ.এইচ.এম সাদিকুল হক।

বিশিষ্ট্য ব্যক্তিত্ব:

    কাহ্নপাদ (দ্বাদশ শতক) চর্যাপদের চুরাশিজন বৌদ্ধ মহাসিদ্ধদের একজন।
    মনসুর বয়াতি (আনুমানিক ১৮ শতক) পল্লি কবি ও গায়ক। ময়মনসিংহ গীতিকার মহুয়া পালার লেখক।
    করম শাহ্্ পাগলপন্থী ফকির (১৭১০ - ১৮১৩) (পূর্বধলা) পাগলপন্থী কৃষক বিদ্রোহের জনক। একজন সুফী সাধক। ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি- বিরোধী আন্দোলনের ব্যক্তিত্ব।
    ছপাতি শাহ্্ পাগলপন্থী ফকির (মেঘা পাগল):- (মৃত্যু- ১৮১৪) (পূর্বধলা) ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ও জমিদারদের শোষণের হাত থেকে স্ব-স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠার ব্যর্থ রাষ্ট্র নায়ক।
    টিপু শাহ্্ পাগলপন্থী ফকির:- (মৃত্যু- ১৮৫২) (পূর্বধলা) শেরপুর, নেত্রকোণা, জামালপুর, ময়মনসিংহ এর কিরদংশ নিয়ে ইস্ট ইন্ডিয়া শাসন ক্ষমতা চ্যালেঞ্জ করে স্বাধীনরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকারী (১৮২৫ - ১৮২৭)।
    নলিনী রঞ্জন সরকার (১৮৮২-১৯৫৩) (কেন্দুয়া) অবিভক্ত ভারত বর্ষের মন্ত্রী কলকাতার সাবেক মেয়র ও বিশিষ্ট্য অর্থনীতি বিদ।
    জ্ঞান চন্দ্র মজুমদার (১৮৮৯ - ১৯৭০) (নেত্রকোণা) ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন অন্যতম ব্যক্তিত্ব অগ্নিযুগের বিপ্লবী এবং অনুশীলন সমিতির অন্যতম শীর্ষ নায়ক।
    চন্দ্রকুমার দে (১৮৮৯ - ১৯৪৬) (কেন্দুয়া) প্রখ্যাত বাউল শিল্পী ও সাধক। ময়মনসিংহ গীতিকার অন্যতম সংগ্রাহক।
    জালাল উদ্দিন খাঁ (১৮৯৪ - ১৯৭২) (কেন্দুয়া) বিশিষ্ট্য বাউল কবি ও গায়ক।
    উকিল মুন্সী (        ১৯৭৮) (খালিয়াজুরী) বাউল শিল্পী সাধক।
    কময়েড মনিসিংহ (২৮ জুলাই ১৯০১ - ৩০ ডিসেম্বর ১৯৯০) (দূর্গাপুর) প্রখ্যাত বামপন্থী রাজনীতিবিদ।
    রশিমনি হাজং (১৯০৮ - ৩১ জানুয়ারী ১৯৪৬) (দূর্গাপুর) টঙ্ক আন্দোলনের অন্যতম বিপ্লবি নেত্রী।
    কুমুদিনী হাজং- (১৯৪২/৪৩ বর্তমান) (দূর্গাপুর) টংক আন্দোলনের বিপ্লবী নেত্রী।
    যাদুমণি হাজং- (বিশশতক) (দূর্গাপুর) টঙ্ক আন্দোলনের অন্যতম বিপ্লবি কর্মী।
    শৈলজারজ্ঞন মজুমদার (১৯০০ - ১৯৭৬) (মোহনগঞ্জ) রবীন্দ সংগীত শিল্পী ও গবেষক, সংগীত গুরু।
    সিরাজুদ্দিন কাসিমপুরী (১৯০১ - ১৯৭৯) (কেন্দুয়া) লোক সাহিত্য বিশারদ।
    খালেকদাদ চৌধুরী (২ ফেব্রুয়ারি ১৯০৭ - ১৬ অক্টোবর ১৯৮৫) (আটপাড়া) খ্যাতিমান প্রাবন্ধিক, গল্পকার, নাট্যকার ও উপন্যাসিক।
    গোলাম সামদানী কোরায়শী (৫ এপ্রিল ১৯২৯ - ১১ অক্টোবর ১৯৯১) (কেন্দুয়া) বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট্যসাহিত্যিক, গবেষক ও অনুবাদক।
    বিচারপতি শাহাবউদ্দিন আহাম্মদ (১ ফেব্রুয়ারি ১৯৩০ - বর্তমান) (কেন্দুয়া) প্রখ্যাত আইনবিদ ও ৬ষ্ঠ প্রধান বিচারপতি এবং দুৎবার দায়িত্ব পালনকারী রাষ্ট্রপতি।
    যতীন সরকার (১৯৩৬ - বর্তমান) (কেন্দুয়া) প্রগতিবাদী চিন্তাবিদ ও লেখক।
    খগেশ কিরণ তালুকদার (১৯৪৮ - ২০০৭) ফোকলোর গবেষক শিক্ষাবিদ।
    কর্ণেল তাহের (১৪ অক্টোবর - ১৯৩৮ - ২১ জুলাই ১৯৭৬) (পূর্বধলা) মুক্তিযোদ্ধা ১১নং সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার এবং বামপন্থী বিপ্লবী নেতা।
    মলয় কুমার গাঙ্গুলী (১৯৪৪ - বর্তমান) বিশিষ্ট্য সংগীত শিল্পী, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক।
    নির্মলেদু গুণ (জন্ম ২১ জুন ১৯৪৫ - বর্তমান) প্রখ্যাত কবি এবং চিত্রশিল্পী।
    হেলাল হাফিজ (৭ অক্টোবর ১৯৪৮ বর্তমান) (আটপাড়া) জনপ্রিয় আধুনিক কবি।
    হুমায়ুন আহমেদ (১৩ অক্টোবর ১৯৪৭ - ১৯ জুলাই ২০১২) (কেন্দুয়া) শিক্ষাবিদ, জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক।
    ড. আব্দুল মতিন : তড়িৎ প্রকৌশলী ও পরমাণু প্রযুক্তিবিদ।
    ড. ইন্নাস আলী, (জন্ম ১৯১৬, মৃত্যু ০৩ মে ২০১০) (বারহাট্টা) জাতীয় অধ্যাপক, পদার্থ বিজ্ঞানের বরেণ্য শিক্ষক।
    রওন ইজদানী (১৯১৭ - ১৯৬৭) (কেন্দুয়া) পল্লী কবি, প্রাবন্ধিক, লোক সাহিত্যের গবেষক ও সংগ্রাহক, বাউল শিল্পী।
    ড. বজলুর রহমান খান: ইতিহাসবিদ ও গবেষক।
    মোহাম্মদ জাফর ইকবাল (২৩ ডিসেম্বর ১৯৫২ - বর্তমান) (কেন্দুয়া) লেখক পদার্থবিদ ও শিক্ষাবিদ।
    ওবায়দুল হাসান শাহীন: হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর সাবেক চেয়ারম্যান।
    আহসান হাবীব : (কেন্দুয়া) জনপ্রিয় কার্টুনিস্ট রম্য সাহিত্যিক ও একজন কমিক বুক রাইটার।
    বারী সিদ্দিকী : (জন্ম ১৫ নভেম্বর ১৯৫৪ - মৃত্যু ২০১৮) (নেত্রকোণা) সংগীত শিল্পী, গীতিকার ও বাঁশি বাদক।
    আলী আহাম্মদ খান আইয়োব: (জন্ম ৭ মার্চ ১৯৬০) (পূর্বধলা) ইতিহাসবিদ, লেখক ও গবেষক।
    মোস্তফা জব্বার : (জন্ম ১২ আগস্ট ১৯৪৯) (খালিয়াজুরী) কম্পিউটার বিশেষঞ্জ ও লেখক।
    ডঃ আনোয়ার হোসেন : (পূর্বধলা), মুক্তিযোদ্ধা, অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সাবেক সভাপতি, জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও লেখক।
    ডঃ মুজিব রহমান : (কেন্দুয়া) হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের (যুক্তরাষ্ট্র) শিক্ষক ও ক্যান্সার গবেষক।
    মরহুম ডাঃ হাফিজ উদ্দিন : (১৯৩১ - ১৯৯৬) (নেত্রকোণা) নেত্রকোণা জেলার প্রথম এম.বি.বি.এস।
    ডাক্তার এম.এ হামিদ খাঁন (২৯ আগষ্ট ১৯৩১ - বর্তমান) (পূর্বধলা) নেত্রকোণা জেলার তৃতীয় এম.বি.বি.এস, ভাষা সৈনিক।
    ডঃ সফর আলী আকন্দ: (১৯৩১ - বর্তমান) (বারহাট্ট) মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষাবীদ।
    গোলাম এরশাদুর রহমান (১০ ফেব্রুয়ারি - ১৯৪৮ ) (মোহনগঞ্জ) মুক্তিযোদ্ধা, লোক সাহিত্য গবেষক লেখক।
    খালেদ মতিন : (নেত্রকোণা) কবি অধ্যাপক, কলামিস্ট।
    মঞ্জুরুল হক তারা মিয়া (২৮ ডিসেম্বর ১৯৪৮     ) (কলমাকান্দা) কবি, মুক্তিযোদ্ধা।
    আব্দুল আজিজ তালুকদার : (১৯৩৪ - বর্তমান) (পূর্বধলা) শিক্ষক, ভাষা সৈনিক, রাজনীতিবীদ (বামপন্থী)।
    অধ্যাপক মোহাম্মদ ফুরৈ হুসেন (১৯৩৪ - বর্তমান) (নেত্রেকোণা) শিক্ষাবিদ, নেত্রকোণা প্রথম দেয়াল পত্রিকা অভিযাত্রী বের করেন।
    ওয়াজেদ আলী: (মৃত্যু - ১৬ জুন, ২০০১) (নেত্রকোণা) ভাষাসৈনিক, রাজনীতিবীদ।

    উত্তরে গারো পাহাড়, দক্ষিণ ও পূর্বে হাওড় ও অসংখ্যা নদী, খাল, বিল পরিবেষ্ঠিত অবারিত সবুজে ঘেরা আমাদের এই নেত্রকোণা। নেত্রকোণার এই উর্বর ভূমিতে জন্ম নেওয়া কৃর্তি সন্তানদের আদর্শ আমরা মানসপঠে লালন করি ও নিজেকে আলোকিত মানুষ করার চেষ্টা করি।

ইতিহাসের পাতায় নেত্রকোনা

প্রতিবেদক নাম: মোঃ চাঁন মিয়া ফকির ,

প্রকাশের সময়ঃ ২২ মে ২০১৮, ০৪:০৭ পিএম

আমার প্রিয় নেত্রকোনা জেলা। বাংলাদেশে এর অবস্থান স্থানাঙ্ক: ২৪ ডিগ্রি ৫২’ ৪৮” উত্তর ৯০ ডিগ্রি ৪৩’ ৪৮” পূর্ব। ময়মনসিংহ বিভাগের একটি জেলা যার উত্তরে ভারতের মেঘালয় রাজ্য, দক্ষিণে কিশোরগঞ্জ জেলা; পূর্বে সুনামগঞ্জ জেলা ও পশ্চিমে ময়মনসিংহ জেলা। মোট আয়তন ২,৮১০,২৮ বর্গ কি.মি. (১০৮৫.০৬ বর্গমাইল)।


    খ্রিষ্টীয় চতুর্থ শতাব্দিতে এ অঞ্চল গুপ্ত সম্রাটগণের অধীন ছিল। সমুদ্রগুপ্তের অধীনস্থ এ অঞ্চলসহ পশ্চিম ময়মনসিংহ কামরুপ রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। ৬২৯ খ্রিষ্টাব্দে হিন্দুরাজ শশাংকের আমন্ত্রণে চৈনিক পরিব্রাজক হিউ এন সাঙ যখন কামরূপ অঞ্চলে আসেন, তখন পর্যন্ত নারায়ণ বংশীয় ব্রাহ্মণ কুমার ভাস্কর বর্মণ কর্তৃক কামরূপ রাজ্য পরিচালিত ছিল। খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দির শেষভাগে পূর্ব ময়মনসিংহের উত্তরাংশে পাহাড় মুল্লুকে বৈশ্যগারো ও দূর্গা গারো তাদের মনগড়া রাজত্ব পরিচালনা করতো। ত্রয়োদশ শতাব্দির শেষ দিকে জনৈক মুসলিম শাসক পূর্ব ময়মনসিংহ অঞ্চল আক্রমণ করে অল্প কিছুদিনের জন্য মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। চতুর্দশ শতাব্দীতে জিতারা নামকএকজন সন্ন্যাসী কামরূপের তৎকালীন রাজধানী ভাটী অঞ্চল আক্রমণ ও দখল করেন। সে সময় পর্যন্তও মুসলিম শাসক ও অধিবাসী স্থায়ীভাবে অত্রাঞ্চলে অবস্থান ও শাসন করতে পারেনি। খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষভাগে আলাউদ্দিন হোসেন শাহের শাসনামলে (১৪৯৩-১৫১৯) সমগ্র ময়মনসিংহ অঞ্চল মুসলিম রাজত্বের অন্তর্ভূক্ত হয়।

    আলাউদ্দিন হোসেন শাহের পুত্র নসরৎ শাহের শাসনামলে (১৫১৯ - ১৫৩২) দু একবার বিদ্রোহ সংঘটিত হলেও বিদ্রোহীরা সফল হয়নি। নসরৎ শাহের উত্তরাধিকারীরা (১৫৩৩ - ১৫৩৮) কিংবা তার পরবর্তী লক্ষ্মনাবতীর অন্য শাসকেরা ময়মনসিংহ অঞ্চলের উপর আধিপত্য বজায় রাখতে পারেনি। ময়মনিংহের উত্তরাংশ কোচদের পুনরাধীন হয়ে পড়ে বাকী অংশ দিল্লীর পাঠান সুলতান শেরশাহ্্ এর (১৫৩৯ - ১৫৪৫) শাসনভুক্ত হয়েছিল। তৎপুত্র সেলিম শাহের শাসনের সময়টি (১৫৪৫ - ১৫৫৩) ছিল বিদ্রোহ ও অস্থিরতায় পূর্ণ। রাজধানী দিল্লী থেকে অনেক দূরে ও কেন্দ্রিয় রাজশক্তির দূর্বলতার সুযোগে প্রধান রাজস্ব সচিব দেওয়ান সুলায়মান খাঁ (যিনি পূর্বে কালিদাস গজদানী নামে পরিচিত ছিলেন)। স¤্রাটের বিরুদ্ধাচরণ করেন। ফলে দেশী ও বিদেশী রাজ্য লিপ্সুরা এতদঞ্চল দখলের প্রয়াস পায়। এর মধ্যে ভাটী অঞ্চল (পূর্ব - উত্তরাংশ) সোলায়মান খাঁ-র দখলভূক্ত ছিল। কেন্দ্রিয় শাসকের প্রেরিত সৈন্যদের হাতে সোলায়মান খাঁ নিহত হলেও তার দু’পুত্রের মধ্যে জ্যেষ্ঠ পুত্র ঈশা খাঁ খিজিরপুর থেকে ভাটী অঞ্চলের শাসন কার্য পরিচালনা করেন। ১৫৯৯ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে ঈশা খাঁর মৃত্যুর পর তৎপুত্র মুসা খাঁ ও আফগান সেনা খাজা উসমান খাঁ কর্তৃক অত্রাঞ্চল শাসিত ছিল। স¤্রাট জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালে (১৬০৫ - ১৬২৭) সমগ্র ময়মনসিংহ অঞ্চল মোঘল সা¤্রাজভূক্ত হয়।

    ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর শাসনামলে ১৭৬৩ খ্রিস্টাব্দে ফকির মজনু শাহ-র (নবাব নুরুদ্দিন বাকের মোহাম্মদ জঙ্গ বাহাদুর) নেতৃত্বে ইংরেজ বিরোধী ফকির সন্ন্যাসীদের তীব্র প্রতিরোধ আন্দোলন শুরু হয়। ১৭৮৮ খ্রীঃ ২৬ জানুয়ারি ভারতের মাখনপুরে যুদ্ধাহত মজনু শাহ বিনা চিকিৎসায় মারা যান। এ আন্দোলনের ময়মনসিংহ এরিয়ার হাল ধরেন করম শাহ। তাঁর নেতৃত্বে যে আন্দোলন হয় তাই ঐতিহাসিক পাগলপন্থী কৃষক বিদ্রোহ। করম শাহ পাগলপন্থী ফকির পাগলপন্থী কৃষক বিদ্রোহের জনক। পূর্বধলার ঘাঘড়া ইউনিয়নের লেটিরকান্দা গ্রাম থেকে পাগলপন্থী কৃষক বিদ্রোহের জনক করম শাহ পাগলপন্থী ফকির ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর শাসন বিরোধী আন্দোলনের সক্রিয় নেতৃত্ব দেন। করম শাহ এর জ্যেষ্ঠ পুত্র ছপাতি শাহ-র স্বাধীন রাজ্য স্থাপনের চেষ্টা, কনিষ্ঠ পুত্র টিপু শাহ পাগলপন্থী ফকিরের নেতৃত্বে গারো, হাজং, মুসলিম, হিন্দুসহ সকল কৃষক সমাজের সসন্ত্র বিদ্রোহ ও শেরপুর আক্রমণ ও বিজয় এর মধ্যে দিয়ে ১৮২৫ সালে স্বাধীন রাজ্য স্থাপন করেন। ইত্যাদির প্রেক্ষিতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী তাদের দমন কল্পে বিভিন্ন থানা স্থাপন সহ সৈন্য বাহিনী মোতায়ন করেন। এ সকল স্বাধীনতা কামীদের আন্দোলন ও বিদ্রোহের ফলে শাসক শ্রেণি শংকিত হয়ে পড়েছিল। ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দের ২৭ মে ময়মনসিংহের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মি. ডানাবার কর্তৃক জামালপুরে অবস্থানরত ইংরেজ সেনাবাহিনীর অধ্যক্ষ মেজর মন্টিথের কাছে যে পত্রটি প্রেরণ করেছিল তা থেকে সহজেই অনুমান করা যায় গারো পাহাড়ের পাদদেশের অবস্থা তৎকালীন সময়ে কেমন ছিল - পত্রটির বঙ্গানুবাদ এরূপঃ-   

     “আমি অতীব দুঃখের সহিত জানাইতেছি যে, এই জেলার শান্তি এইরূপ গুরুতর রূপে বিঘিœত হইয়াছে যে, নিয়মিত সৈন্যবাহিনী ব্যতিত বিদ্রোহ দমন ও পুনরায় শান্তি স্থাপনের কোন সম্ভাবনা নাই। বিদ্রোহীরা তাদের স্বাধীনতা লাভের পরিকল্পনানুযায়ী বহু আক্রমণাত্মক ক্রিয়াকলাপ চালাইয়া যাইতেছে এবং আপাতত শেরপুর ও গারো পাহাড়ের মধ্যবর্তী বিস্তীর্ণ অঞ্চল সম্পুর্ণ অধিকার করিয়া ফেলিয়াছে। তাহারা এখন সকল প্রজার নিকট হইতে কর আদায় করিতেছে এবং শেরপুর আক্রমণের জন্য লোকসংখ্যা বৃদ্ধি করিতেছে। এই অবস্থায় আপনাকে বিনীত ভাবে অনুরোধ করিতেছি যে, আপনি অবিলম্বে প্রয়োজনীয় সামরিক সাহায্য প্রেরণ করিয়া আমাকে সাহায্য করুন। পাগলপন্থী বিদ্রোহীগণ পরগণার বিভিন্ন স্থানে চারিশত হইতে পাঁচশত করিয়া লোক সমাবেশ করিতেছে। তাহাদের মুল বাহিনীর লোক সংখ্যা সম্ভবত চারি সহস্র হইতে পাঁচ সহস্রের মধ্যে। তাহাদের পরিচালকের নেতৃত্বে বিদ্রোহীগণ বল্লম, তরবারি এবং বিষাক্ত তীর ও ধনুক দ্বারা-সুসজ্জিত। ইহা ব্যতিত তাহারা কতিপর বন্দুকও সংগ্রহ করিয়াছে।”

    পাগলপন্থী আন্দোলনের বিভিন্ন নথিপত্র দৃষ্টে মনে হয়, পাগলপন্থী টিপু শাহের বিদ্রোহের পূর্বেই নাটেরকোনা গ্রাম থেকে চৌকিদার, বরকন্দাজদের পরিচালনা করা হতো। কেননা পাগলপন্থী করম শাহ-র আন্দোলনে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী প্রশাসন যেমন ছিল ব্যতিব্যস্ত তেমনি ছিল শংকিত। কালীগঞ্জ ছিল তৎকালে এক অখ্যাত স্থান, যার নামকরণ সহ জনবসতি গড়ে উঠেছে নবাব মুর্শিদকুলী খাঁ-র শাসনকালে। তৎকালে এতদাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা জলপথ অর্থাৎ জলযান ছাড়া বিকল্প অন্য কিছু ছিলনা। তাই যোগাযোগের চিন্তা করেই কালীগঞ্জে ইরেজদের শারীরিক অবস্থান থাকলেও দাপ্তরিক কাজে কালীগঞ্জের পরিবর্তে পূর্বের অবস্থান অর্থাৎ নাটেরকোণা নামকেই ব্যবহার করতো। তাদের উপর পর্যায় থেকে যোগাযোগের ও কাগজ পত্রাদি নাটেরকোণা লিখেই প্রেরিত হতো। ইংরেজদের ভাষায় অর্থাৎ ইংরেজীতে ঘঅঞজকঙঘঅ স্থলে ঘঊঞজকঙঘঅ এরূপ লিখায় উচ্চারণে কাছ কাছি হলেও শব্দটি অপভ্রম হয়ে যায়। ইংরেজদের উচ্চারণে নাটেরকোণা > নেটেরকোণা > নেতেরকোণা শব্দে রূপান্তরিত হয়। সেখান থেকেই বাংলায় নেত্রকোণা ইরেজিতে ঘঊঞজঅকঙঘঅ নামকরণ হয়ে কালীগঞ্জ নামের অপমৃত্যু ঘটায়।

    উপযুক্ত কারণে ব্রিটিশ সরকার অনুধাবন করতে পেরেছিলেন অত্র অঞ্চলে তাদের স্থায়ী প্রশাসনিক কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। তাই তারা নেত্রকোণার বরকন্দাজ থানাকে ০১ অক্টোবর ১৮৭৪ খ্রিস্টাব্দে আধুনিক পুলিশ থানায় রূপান্তর করেন (ঘড়ঃরভরপধঃরড়হ ঘড়. ১২১.উযধশধ ১ংঃ ঙপঃড়নবৎ ১৮৭৪)।

    একই কারণে গারো পাহাড় অঞ্চলসহ সমগ্র নেত্রকোণাকে ব্রিটিশ শাসন ক্ষমতায় রাখার লক্ষ্যে ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সরকার মহকুমা মঞ্জুর করে। ৩ জানুয়ারী ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে মহকুমা কার্যক্রম শুরু হয়। মহকুমা প্রশাসনের দায়িত্ব পালনের জন্য ক্ষেত্রগোপাল রায়কে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করা হয়। ১ জানুয়ারী ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে নেতকোণা মিউনিসিপ্যালিটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে নেত্রকোণা সদর থানায় আধুনিক পুলিশ ব্যারাক পরিদর্শন বাংলো নির্মাণ করা হয়। ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে নেত্রকোণা মিউনিসিপ্যালিটিকে টাউন কমিটিতে রূপান্তর করা হয়। বাংলাদেশ লোকাল কাউন্সিল এন্ড মিউনিসিপ্যাল কমিটিজ (এ্যামেন্ডমেন্ট) অর্ডার ১৯৭২ মোতাবেক নেত্রকোণা টাউন কমিটি পৌরসভায় রূপান্তরিত হয়।

    ১৭ জানুয়ারি ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের এক প্রজ্ঞাপন মূলে নেত্রকোণা মহকুমাকে জেলা ঘোষণা করা হয়। ১ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে আনুষ্ঠানিকভাবে নেত্রকোণা জেলার কার্যক্রম শুরু হয়। নতুন নেত্রকোণা জেলার প্রথম জেলা প্রশাসক হন এ.এইচ.এম সাদিকুল হক।

বিশিষ্ট্য ব্যক্তিত্ব:

    কাহ্নপাদ (দ্বাদশ শতক) চর্যাপদের চুরাশিজন বৌদ্ধ মহাসিদ্ধদের একজন।
    মনসুর বয়াতি (আনুমানিক ১৮ শতক) পল্লি কবি ও গায়ক। ময়মনসিংহ গীতিকার মহুয়া পালার লেখক।
    করম শাহ্্ পাগলপন্থী ফকির (১৭১০ - ১৮১৩) (পূর্বধলা) পাগলপন্থী কৃষক বিদ্রোহের জনক। একজন সুফী সাধক। ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি- বিরোধী আন্দোলনের ব্যক্তিত্ব।
    ছপাতি শাহ্্ পাগলপন্থী ফকির (মেঘা পাগল):- (মৃত্যু- ১৮১৪) (পূর্বধলা) ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ও জমিদারদের শোষণের হাত থেকে স্ব-স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠার ব্যর্থ রাষ্ট্র নায়ক।
    টিপু শাহ্্ পাগলপন্থী ফকির:- (মৃত্যু- ১৮৫২) (পূর্বধলা) শেরপুর, নেত্রকোণা, জামালপুর, ময়মনসিংহ এর কিরদংশ নিয়ে ইস্ট ইন্ডিয়া শাসন ক্ষমতা চ্যালেঞ্জ করে স্বাধীনরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকারী (১৮২৫ - ১৮২৭)।
    নলিনী রঞ্জন সরকার (১৮৮২-১৯৫৩) (কেন্দুয়া) অবিভক্ত ভারত বর্ষের মন্ত্রী কলকাতার সাবেক মেয়র ও বিশিষ্ট্য অর্থনীতি বিদ।
    জ্ঞান চন্দ্র মজুমদার (১৮৮৯ - ১৯৭০) (নেত্রকোণা) ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন অন্যতম ব্যক্তিত্ব অগ্নিযুগের বিপ্লবী এবং অনুশীলন সমিতির অন্যতম শীর্ষ নায়ক।
    চন্দ্রকুমার দে (১৮৮৯ - ১৯৪৬) (কেন্দুয়া) প্রখ্যাত বাউল শিল্পী ও সাধক। ময়মনসিংহ গীতিকার অন্যতম সংগ্রাহক।
    জালাল উদ্দিন খাঁ (১৮৯৪ - ১৯৭২) (কেন্দুয়া) বিশিষ্ট্য বাউল কবি ও গায়ক।
    উকিল মুন্সী (        ১৯৭৮) (খালিয়াজুরী) বাউল শিল্পী সাধক।
    কময়েড মনিসিংহ (২৮ জুলাই ১৯০১ - ৩০ ডিসেম্বর ১৯৯০) (দূর্গাপুর) প্রখ্যাত বামপন্থী রাজনীতিবিদ।
    রশিমনি হাজং (১৯০৮ - ৩১ জানুয়ারী ১৯৪৬) (দূর্গাপুর) টঙ্ক আন্দোলনের অন্যতম বিপ্লবি নেত্রী।
    কুমুদিনী হাজং- (১৯৪২/৪৩ বর্তমান) (দূর্গাপুর) টংক আন্দোলনের বিপ্লবী নেত্রী।
    যাদুমণি হাজং- (বিশশতক) (দূর্গাপুর) টঙ্ক আন্দোলনের অন্যতম বিপ্লবি কর্মী।
    শৈলজারজ্ঞন মজুমদার (১৯০০ - ১৯৭৬) (মোহনগঞ্জ) রবীন্দ সংগীত শিল্পী ও গবেষক, সংগীত গুরু।
    সিরাজুদ্দিন কাসিমপুরী (১৯০১ - ১৯৭৯) (কেন্দুয়া) লোক সাহিত্য বিশারদ।
    খালেকদাদ চৌধুরী (২ ফেব্রুয়ারি ১৯০৭ - ১৬ অক্টোবর ১৯৮৫) (আটপাড়া) খ্যাতিমান প্রাবন্ধিক, গল্পকার, নাট্যকার ও উপন্যাসিক।
    গোলাম সামদানী কোরায়শী (৫ এপ্রিল ১৯২৯ - ১১ অক্টোবর ১৯৯১) (কেন্দুয়া) বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট্যসাহিত্যিক, গবেষক ও অনুবাদক।
    বিচারপতি শাহাবউদ্দিন আহাম্মদ (১ ফেব্রুয়ারি ১৯৩০ - বর্তমান) (কেন্দুয়া) প্রখ্যাত আইনবিদ ও ৬ষ্ঠ প্রধান বিচারপতি এবং দুৎবার দায়িত্ব পালনকারী রাষ্ট্রপতি।
    যতীন সরকার (১৯৩৬ - বর্তমান) (কেন্দুয়া) প্রগতিবাদী চিন্তাবিদ ও লেখক।
    খগেশ কিরণ তালুকদার (১৯৪৮ - ২০০৭) ফোকলোর গবেষক শিক্ষাবিদ।
    কর্ণেল তাহের (১৪ অক্টোবর - ১৯৩৮ - ২১ জুলাই ১৯৭৬) (পূর্বধলা) মুক্তিযোদ্ধা ১১নং সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার এবং বামপন্থী বিপ্লবী নেতা।
    মলয় কুমার গাঙ্গুলী (১৯৪৪ - বর্তমান) বিশিষ্ট্য সংগীত শিল্পী, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক।
    নির্মলেদু গুণ (জন্ম ২১ জুন ১৯৪৫ - বর্তমান) প্রখ্যাত কবি এবং চিত্রশিল্পী।
    হেলাল হাফিজ (৭ অক্টোবর ১৯৪৮ বর্তমান) (আটপাড়া) জনপ্রিয় আধুনিক কবি।
    হুমায়ুন আহমেদ (১৩ অক্টোবর ১৯৪৭ - ১৯ জুলাই ২০১২) (কেন্দুয়া) শিক্ষাবিদ, জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক।
    ড. আব্দুল মতিন : তড়িৎ প্রকৌশলী ও পরমাণু প্রযুক্তিবিদ।
    ড. ইন্নাস আলী, (জন্ম ১৯১৬, মৃত্যু ০৩ মে ২০১০) (বারহাট্টা) জাতীয় অধ্যাপক, পদার্থ বিজ্ঞানের বরেণ্য শিক্ষক।
    রওন ইজদানী (১৯১৭ - ১৯৬৭) (কেন্দুয়া) পল্লী কবি, প্রাবন্ধিক, লোক সাহিত্যের গবেষক ও সংগ্রাহক, বাউল শিল্পী।
    ড. বজলুর রহমান খান: ইতিহাসবিদ ও গবেষক।
    মোহাম্মদ জাফর ইকবাল (২৩ ডিসেম্বর ১৯৫২ - বর্তমান) (কেন্দুয়া) লেখক পদার্থবিদ ও শিক্ষাবিদ।
    ওবায়দুল হাসান শাহীন: হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর সাবেক চেয়ারম্যান।
    আহসান হাবীব : (কেন্দুয়া) জনপ্রিয় কার্টুনিস্ট রম্য সাহিত্যিক ও একজন কমিক বুক রাইটার।
    বারী সিদ্দিকী : (জন্ম ১৫ নভেম্বর ১৯৫৪ - মৃত্যু ২০১৮) (নেত্রকোণা) সংগীত শিল্পী, গীতিকার ও বাঁশি বাদক।
    আলী আহাম্মদ খান আইয়োব: (জন্ম ৭ মার্চ ১৯৬০) (পূর্বধলা) ইতিহাসবিদ, লেখক ও গবেষক।
    মোস্তফা জব্বার : (জন্ম ১২ আগস্ট ১৯৪৯) (খালিয়াজুরী) কম্পিউটার বিশেষঞ্জ ও লেখক।
    ডঃ আনোয়ার হোসেন : (পূর্বধলা), মুক্তিযোদ্ধা, অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সাবেক সভাপতি, জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও লেখক।
    ডঃ মুজিব রহমান : (কেন্দুয়া) হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের (যুক্তরাষ্ট্র) শিক্ষক ও ক্যান্সার গবেষক।
    মরহুম ডাঃ হাফিজ উদ্দিন : (১৯৩১ - ১৯৯৬) (নেত্রকোণা) নেত্রকোণা জেলার প্রথম এম.বি.বি.এস।
    ডাক্তার এম.এ হামিদ খাঁন (২৯ আগষ্ট ১৯৩১ - বর্তমান) (পূর্বধলা) নেত্রকোণা জেলার তৃতীয় এম.বি.বি.এস, ভাষা সৈনিক।
    ডঃ সফর আলী আকন্দ: (১৯৩১ - বর্তমান) (বারহাট্ট) মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষাবীদ।
    গোলাম এরশাদুর রহমান (১০ ফেব্রুয়ারি - ১৯৪৮ ) (মোহনগঞ্জ) মুক্তিযোদ্ধা, লোক সাহিত্য গবেষক লেখক।
    খালেদ মতিন : (নেত্রকোণা) কবি অধ্যাপক, কলামিস্ট।
    মঞ্জুরুল হক তারা মিয়া (২৮ ডিসেম্বর ১৯৪৮     ) (কলমাকান্দা) কবি, মুক্তিযোদ্ধা।
    আব্দুল আজিজ তালুকদার : (১৯৩৪ - বর্তমান) (পূর্বধলা) শিক্ষক, ভাষা সৈনিক, রাজনীতিবীদ (বামপন্থী)।
    অধ্যাপক মোহাম্মদ ফুরৈ হুসেন (১৯৩৪ - বর্তমান) (নেত্রেকোণা) শিক্ষাবিদ, নেত্রকোণা প্রথম দেয়াল পত্রিকা অভিযাত্রী বের করেন।
    ওয়াজেদ আলী: (মৃত্যু - ১৬ জুন, ২০০১) (নেত্রকোণা) ভাষাসৈনিক, রাজনীতিবীদ।

    উত্তরে গারো পাহাড়, দক্ষিণ ও পূর্বে হাওড় ও অসংখ্যা নদী, খাল, বিল পরিবেষ্ঠিত অবারিত সবুজে ঘেরা আমাদের এই নেত্রকোণা। নেত্রকোণার এই উর্বর ভূমিতে জন্ম নেওয়া কৃর্তি সন্তানদের আদর্শ আমরা মানসপঠে লালন করি ও নিজেকে আলোকিত মানুষ করার চেষ্টা করি।