বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২০, ১:১৬ এএম

রাসায়নিক মারণাস্ত্র V / S করোনা ভাইরাস

:
প্রকাশিত: ৬:২০ অপরাহ্ন, ৩০ মার্চ ২০২০, সোমবার


বলছি ১৯১৫ সালের কথা। তখন প্রথম বিশ্ব যুদ্ধ চলছিলো পুরোদমে। বলতে গেলে মিত্র পক্ষের সুদক্ষ যোদ্ধকৌশলের নিকট কোনঠাসা হয়ে পড়েছিল জার্মান সেনারা। কিন্তু যুদ্ধবাজ জার্মানীর কাইজার এই পরাজয় মানতে নারাজ। তিনি বুঝতে পারলেন শুধু বন্দুক এবং গোলা-বারুদ দিয়ে বিশ্বযুদ্ধ জয় করা সম্ভব নয়। তিনি জার্মানীর দেশ প্রেমিকদের ডেকে পাঠালেন। কাইজারের নির্দেশ “যেভাবেই হোক নতুন মারণাস্ত্র আবিষ্কার করা চাই” সেদিনের বিজ্ঞানীদের মধ্যে তরুণ বিজ্ঞানী “ফ্রিটজ হ্যাবার” তিনিও ছিলেন। বিজ্ঞানীদের সব জটিল ব্যপারের সহজ এবং দ্রুত সমাধান বের করার ক্ষেত্রে তাঁর ছিলো বেশ সুনাম। ফ্রিটজ রাত দিন খেটে কাজ করতে লাগলেন। তাঁর এই পরিশ্রম বৃথা যায়নি, কাইজারের নিকট তিনি এক নতুন অস্ত্র নিয়ে হাজির হলেন সেটি ছিলো বিষাক্ত গ্যাস “ক্লোরিন” কাইজার এই রাসায়নিক পদার্থ “ক্লোরিন” যুদ্ধক্ষেত্রে প্রয়োগ করার অনুমতি দিলেন। ২২ এপ্রিল সকালে তিনি বেলজিয়ামে অক্ষশক্তির অধিকৃত শহর ইপ্রিস থেকে চার কিলোমিটার দূরে তাঁর অস্ত্র নিয়ে অবস্থান করলেন। সেদিন প্রায় ৬,০০০ গ্যাস সিলিন্ডার থেকে ক্লোরিন গ্যাস ছড়িয়ে দেয়া হয় শত্রুপক্ষের ঘাঁটি বরাবর। এবার শুরু হয় অপেক্ষার পালা।
প্রায় ৭ দিন পর যখন ফ্রিটজ ইপ্রিস শহরে জার্মানী সেনা নিয়ে প্রবেশ করে, তখন ইপ্রিসকে আর শহর বলে ডাকা যাচ্ছিলো না। পথে-ঘাটে লাশের পর লাশ স্তুপ হয়ে সেটা বিশাল বিরানভূমিতে রূপ নিয়েছে। এখান থেকেই বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থের অভিষেক ঘটে। রাসায়নিক পদার্থের জনক এবং কালো ভিলেন বলা হয় এই জার্মান বিজ্ঞানী ফ্রিটজ হ্যাবারকে।
রাসায়নিক অস্ত্র কী?
রাসায়নিক অস্ত্র বলতে যে কোনো ধরনের রাসায়নিক পদার্থ দ্বারা তৈরী অস্ত্রকে বোঝায়। রাসায়নিক অস্ত্র কঠিন, তরল এবং বায়বীয় যে কোনো রূপে ব্যবহার হতে পারে। তবে পারমাণবিক অস্ত্র এবং জীবাণুমূলক অস্ত্রের ব্যবহার রাসায়নিক অস্ত্রের অন্তর্ভূক্ত নয়। সাধারণ যুদ্ধের গোলা-বারুদ থেকেও বেশি কার্যকর এই রাসায়নিক পদার্থ।
ইতিহাসের পাতা:
ফ্রিটজ হ্যাবার রাসায়নিক অস্ত্রের জনক বলে গণ্য করলেও ইতিহাসের রাসায়নিক অস্ত্র প্রবীণ অভিনেতা। প্রথম দিকে রাসায়নিক অস্ত্রের ধারণা পাওয়া যায় গ্রীক পুরাণ থেকে। পৌরাণিক বীর হারকিউলিস তার তীরের ফলায় বিষ মাখানোর মাধ্যমে রাসায়নিক অস্ত্রের জন্ম দেয়। হোমার তার ঐতিহাসিক মহা কাব্য “ইলিয়াড” এবং “ওডিট”-এর মাঝে ট্রয় যুদ্ধে বিষাক্ত হাতির ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেন।
রাসায়নিক অস্ত্রকে বাস্তব জগতে নিয়ে আসা হয় ৬০০ খ্রীষ্টপূর্ব তীর্থভূমি কিরা যুদ্ধের মাধ্যমে। প্রায় ১২০০ খ্রীষ্টাব্দ অবধি রাসায়নিক অস্ত্রের আধিপত্য ইউরোপ অবধি সীমাবদ্ধ ছিলো। পরে মঙ্গল সম্রাজ্যের জনক “চেঙ্গিস খান” মাটিতে রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহার শুধু করে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ:
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯২৫ সালে জেনেভা সম্মেলনে তৎকালীন বিশ্ব শান্তি সংঘ জাতিপুঞ্জ নতুন করে রাসায়নিক অস্ত্রের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। কিন্তু ১৯৩৬ সালে ইতালীয় স্বৈরাচার বেনিতো মুসলিনি জেনেভা প্রোটোকলকে অগ্রাহ্য করে ইথিওপিয়ার উপর “মাস্টার্ড” বোমা নিক্ষেপ করে। ফলে নতুন করে আবার রাসায়নিক অস্ত্র নিয়ে গবেষণা শুরু হয়। ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহার হয়, ব্যবহার প্রক্রিয়া ছিলো সম্পূর্ণ আলাদা।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর:
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে কয়েক বছর জন্য রাসায়নিক অস্ত্রে ব্যবহার থমকে গেলেও বন্ধ হয়নি। বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে “ভিয়েতনাম” যুদ্ধে মার্কিন সেনারা দনাপালম গ্যাসদ ব্যবহার করে। বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা না কাটতেই এই রাসায়নিক আক্রমণ বিশ্ব শান্তিকামী মানুষদের মনে ক্ষোভের জন্ম দেয়। ফলে সমালোচিত হয় বিশ্ব জুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধনীতি।
১৯৭২ সালে বিশ্ব নেতারা এক হয়ে ১৯২৫ জেনেভা প্রটোকল পরিমার্জন করে নতুন চুক্তি স্বাক্ষর করেন। নতুন চুক্তিতে শুধু রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার নয় বরং উপকরণের উপরেও কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। কিন্তু পূর্ববর্তী সকল চুক্তির মতোই নতুন চুক্তিকেও সামান্য আঁকিবুঁকি করা কাগজে পরিনত করে ইরাকের রাষ্ট্রপতি সাদ্দাম হোসেন, ইরাক-ইরান যুদ্ধে তুর্কি সম্প্রদায়ের উপর “টাবুন গ্যাস” নিক্ষেপ করে। এবার জাতিসংঘ নতুন রীতি অবলম্বনে ১৯৯৩ সালে নতুন নীতিমালা প্রনয়ণ করে। এই নীতিমালা অনুযায়ী ১৯৯৭ সালের মধ্যে সকল রাসায়নিক অস্ত্র বন্ধ করে ফেলার নির্দেশ জারি করা হয়। কিন্তু আবারও পরবর্তীতে ২০০৯ সালে গাঁজা আগ্রাসনের সময় ইসরায়েল ফিলিস্তিনির উপর বিষাক্ত “সাদা ফসফরাস বোমা” নিক্ষেপ করে । ২০১৩ সালে সিরিয়ার রাষ্ট্রপতি বাশার আল আসাদ সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ চলাকালীন নিজ দেশেই “সারিন গ্যাস” দিয়ে আক্রমণ করে।
২০২০ সালের বিশ্ব:
বিজ্ঞানের উন্নতি হয়েছে। বিজ্ঞান যেমন মানব জীবনকে সহজ করেছে, তেমনি ধ্বংসও করেছে। হয়তো’বা বর্তমান করোনা ভাইরাস বিজ্ঞানের পরিকল্পিত একটি ধ্বংসের নাম। একটু খেয়াল করলে দেখা যায় করোনা ভাইরাসে আক্রান্তে জটিল এবং ভয়াবহ অবস্থানে আছে বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলো, অন্যদিকে গরীব এবং কমজোর রাষ্ট্রগুলোতে তেমন করোনার কোনো প্রভাব পরেনি। তাহলে এটি কী ভিন্ন কিছুর ইঙ্গিত করছেনা?
অতীতে এবং বর্তমান একাধারে বিশ্ব নেতৃত্ব দিচ্ছে আমেরিকা। এখন বিশ্ব যেনো আমেরিকাকে ডেকে বলছে, ওহে.. আমেরিকা আর কতো? এবার তো রাজত্ব ছাড়ো!
তাছাড়া চীন এবং আমেরিকা একে অন্যের উপর যেভাবে কাদা ছোড়াছুড়ি করছে। এতে পরিষ্কার বোঝা যায় “সায়েদ ড্যাল মে কোচ কালা হ্যায়” একটি বিষয় পরিষ্কার এখন ক্ষমতার লড়াইয়ে নেমেছে বিশ্ব এবং হারাতে বসেছে আমেরিকা বিশ্ব নেতৃত্ব। দেখা যাক সময় কী বলে।
লেখক: প্রিয়া ইসলাম ফাতিহা, ব্যবসায়ী ও পুলিশ অফিসার, ভারত।

মন্তব্য করুন

সর্বশেষ নিউজ

আরো পড়ুন