১৮, আগস্ট, ২০১৯, রোববার | | ১৬ জ্বিলহজ্জ ১৪৪০


রাজনীতিতে করমশাহ পাগলপন্থী ফকির

রিপোর্টার নামঃ স্টাফ রিপোর্টার | আপডেট: ১৭ মে ২০১৮, ১২:৪৫ পিএম

রাজনীতিতে করমশাহ পাগলপন্থী ফকির
রাজনীতিতে করমশাহ পাগলপন্থী ফকির

১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর আম্রকাননে যখন নবাব সিরাজ-দৌল্লার সূচনীয় পরাজয় নেমে আসে, তখনই ইংরেজ কোম্পানীর হাতে শাসন ক্ষমতা চলে যায়। ইংরেজ কোম্পানীর বিরোদ্ধে সর্ব প্রথম ফকির মজনুশাহ (নবাব নূর উদ্দীন বাকের মোহাম্মদ জঙ্গ বাহাদুর) সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য বিদ্রোহ আরম্ভ করেন। এই বিদ্রোহের সময়কাল হল ১৭৬৩ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৭৮০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত। ইতিহাসে এই আন্দোলনকে ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ বলা হয়। ১৭৮৮ খ্রিস্টাব্দে জানুয়ারি মাসে ভারতের মাখনপুরের যুদ্ধাহত ফকির মজনু শাহের কর্মময় জীবনের অবসান ঘটে। উনার বিস্বস্ত সংগ্রামী সাথী ছিলেন করশাহ পাগলপন্থী ফকির। ফকির মজনুশাহের মৃত্যুর পর ইংরেজ কোম্পানীর বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে যান পাগলপন্থী কৃষক বিদ্রোহের জনক করম শাহ পাগলপন্থী ফকির। তিনি শেরপুর, ধোবাউড়া, নেত্রকোণা অঞ্চলের গারো, হাজং, বানাই ও সাধারণ মানুষদেরকে নিয়েই এ আন্দোলন সংগঠিত করেছিলেন। কোন কোন গ্রন্থে তাঁকে করিম শাহ বাবজী বলে অভিহিত করেছেন।  

স্বাধীনচেতা এই সূফী সাধক পাগলপন্থী কৃষক বিদ্রোহের জনক করমশাহের জন্ম ১৭১০ খ্রিষ্টাব্দে। তাঁর বাল্য নাম চাঁন খাঁ গাজী / চাঁন গাজী। তিনি ছিলেন দশকাহনীয়া পরগনার মুসলিম শাসক শের খাঁ গাজী / শের আলী গাজীর পুত্র। শের আলী গাজী হিন্দু নন্দী ও মুর্শিদকুলী খাঁর ষড়যন্ত্রের স্বীকার হয়ে জমিদারী হারান। জমিদারী হারিয়ে রিক্ত হস্তে স্ত্রী সন্তান নিয়ে অজ্ঞাত বাসে চলে যান সেখানেও তাঁকে বাঁচতে দেয়নি নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ ও হিন্দু নন্দীরা। শের আলী গাজীর মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী শিশু পুত্রকে নিয়ে শেরপুরের প্রান্ত সীমায় শালকোনা নামক স্থানে নিরাপদ আশ্রয় গ্রহণ করেন। (এটি ধোবাউড়া উপজেলার মুন্সিরহাট বাজারের কাছে।) আত্মগোপন অবস্থাতেই শের আলী গাজীর স্ত্রী মারা যান। উনাকে সমাহিত করা হয় দূর্গাপুর উপজেলার পুকুরাকান্দা গ্রামে। পরে পাগলপন্থী কৃষক বিদ্রোহের জনক করম শাহ পাগলপন্থী ফকির সুসঙ্গ পরগাণার শংকরপুর নামক স্থানে বসতি স্থাপন করেন। বসতি স্থাপনের পর অনেক বাঁধাবিপত্তি অতিক্রম করে সুসঙ্গ মহারাজার কাছ থেকে সাতশ পঞ্চাশ একর জমি বন্দোবস্ত পান। পরে এই জমির দখল নিয়ে পারিবারিক কলহ সৃষ্টি হয়। পারিবারিক কলহ রাজনৈতিক কারণে করমশাহ শংকরপুর ত্যাগ করে কংস নদীর দক্ষিণ তীরে লেটীর কান্দায় আবাস স্থানান্তর করেন। কথিত আছে নতুন আবাস্থলে করমশাহ পাগলপন্থী ফকির লেটা বা জানু পেতে বসে থাকতেন বলে গ্রামের নামকরণ করা হয় লেটীরকান্দা। ডক্টর গৌতম ভদ্রের লিখায় পাই সরকারী দলিলে করিমশাহের বর্ণনা আছে এইভাবে যে, শেরপুরের সাতসিক্কা ও সঙ্গের সীমান্তে ও পাহাড়ের সন্নিহিত অঞ্চলে বসবাসকারী জনগণের মধ্যে অনাচার (ওৎৎবংড়ষঁঃব ঃৎধরঃং) দেখে করিম নামে এক মুসলমান ফকির প্রায় ৫০ বছর আগে এই অঞ্চলে ডেরা গাড়েন। তিনি নিজেকে ধর্ম-সংস্কারক ও ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা বলে ঘোষণা করেন। (জবভড়ৎসবৎধহফ ঝড়ঃযংধুবৎ) তদপেক্ষা উল্লেখযোগ্য সে, তিনি তাঁর পূর্বমত ত্যাগ করে নিজেকে দ্বৈতবাদী (উবরংঃ) বলে দাবী করেন এবং তাঁর এলাকার হবু ভক্তদের কথা ভেবে তদুপযোগী ধর্মমত চালু করেন। করমশাহ পাগলপন্থী ফকির তিনি মূলত সূফী সাধক ছিলেন। পরবর্তী সময়ে সূফীবাদীকে ফুজি করে বাউল সাধনার মাধ্যমে সকল মানুষকে ঐক্য বদ্ধ করে রাজনীতি চালিয়ে যান। তিনি আওয়াজ নামে তিনশ ষাটটি গীতি কাব্য রচনা করেছিলেন। এইগুলির মাধ্যমে সকল ধর্মের মানুষকে একত্রিত করে সংগঠিত করতে পেরেছিলেন। করমশাহ একদিকে বাউল সম্প্রদায় ভূক্ত অন্যদিকে মুসিলিম ঐতিহ্যবাহী ও সংগীতাশ্রয়ী। সংগীত ছিল তাঁর অন্যতম মাধ্যম। করমশাহ পালগপন্থী ফকির আনুমানিক ১৭৭৫ খ্রিষ্টাব্দে সুসঙ্গ ও শেরপুর পরগণার গারো, হাজং, ডালু, বানাই ইত্যাদি আদিবাসী সম্প্রদায়ের লোকজনদের পাগলপন্থী মতবাদে দীক্ষিত করেন। তিনি সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ করে সকল সম্প্রদায়ের মানুষকে ঐক্য বদ্ধ করতে পেরেছিলেন। তিনি ভাই সাহেব বলে সম্বোধন করতেন। করমশাহ পাগলপন্থী ফকির শুধু সূফী সাধকই নন। তিনি সকল শ্রেণীর লোকদের কাছে অধিকার আন্দোলনের নেতা হিসেবে পরিচিত। তাঁর অন্যতম প্রধান অনুসারী ছিলেন তাঁর জেষ্ঠ্য পুত্র ছপাতি শাহ পাগলপন্থী ফকির। করম শাহ পাগলপন্থী ফকিরের অনেক শিষ্যভক্ত হয়েছিল। তিনি একজন যোগ্য নেতৃত্বকারী ব্যক্তি হিসেবে যোগ্যতা অর্জন করতে পেরেছিলেন।

পাগলপন্থী কৃষক বিদ্রোহের জনক করমশাহ পাগলপন্থী ফকির পিতার স্বাভাবিক আত্মগোপন এবং অস্বাভাবিক মৃত্যুকে তিনি মেনে নিতে পারেননি। এক্ষেত্রে পাগলপন্থী করমশাহ সাধারণ মানুষের স্বার্থ আদায়ের পাশাপাশি পিতার জমিদারী উদ্ধার এবং জমিদারীচ্যুত্যের প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য সম্ভবত তিনি সূফীবাদী হয়েও রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। অপরদিকে পাঠান স্থানীয় আফগান বংশদ্ভুত জমিদারী রক্ত প্রবাহিত ছিল করশাহের শরীরে। তাই তিনি সূফীবাদী লোক হয়েও রাজনৈতিক চেতনাকে বাদ দিতে পারেন নি।

ইংরেজরা এ বিদ্রোহীদের দস্যু, ডাকাত বলে অপবাদ দিত। ১৭৯৩ খ্রিষ্টাব্দে লর্ড কর্ণওয়ালিশের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তকে তরান্বিত করতে ইংরেজ সেনাবাহিনী করমশাহ সহ তাঁর অনুসারীদের তাড়িয়ে বেড়ায়। তিনি নেপালে, ভুটানে আশ্রয় গ্রহণ করেন, ভুটানে আশ্রয় গ্রহণ করেন। নেপালরাজ স্বহৃদয়তার সংগে করম শাহসহ অন্যান্য আশ্রিতদের নেপাল রাজ্য ত্যাগের অনুরোধ জানিয়েছিল। এ সম্পর্কে সেই সময়কার কালেক্টর মি. বজের্স মুবংস্থিত কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে নেপালী সুবার উকীল দেওসিং উপাধ্যায় ২৪ অক্টোবর ১৭৯৪ খ্রিষ্টাব্দে দুখানা পত্র লিখেন। এর মধ্যে করমশাহ-র উদ্দেশ্য পত্রটির বঙ্গানুবাদ এরূপ:-

“পেয়ারে দোস্ত শ্রীকরীম শাহজী বরাবর- দেওসিং উকীল আপনাকে সালাম পাঠাচ্ছে। আমি ভাল আছি রোজই আপনার সুন্দর স্বাস্থ্য ও সুখী জীবনের জন্য প্রার্থনা করি। বড় সাহেব (কালেক্টর সাহেব) আমাকে নিম্নরূপ নির্দেশ দিয়েছেন। করীমশাহ-কে বন্দী করে পাঠিয়ে দাও। উভয় পক্ষে বড় কঠোর উত্তর-প্রত্যুত্তর হয়েছে। অবশেষে ভদ্রলোক আশা করেছেন যে, আমি যদি করীমশাহকে ধরে না দেই, তবে তারা তাকে ধরবার জন্য সৈন্য পাঠাবেন।” অতএব আপনাকে জানানো যাচ্ছে যে, মি. স্মিত গোলাগুলি সংগ্রহ করছেন, ভোপালার কাছে সিপাহীর জন্য লোক পাঠিয়েছেন। তাই আপনি সবাধান হোন। মহারাজের সংগে পরামর্শ করুন, তিনি যদি আপনাকে সাহায্য করেন এবং আপনি যদি নিজেকে তাঁর সমকক্ষ মনে করেন, যুদ্ধের জন্য তৈরী হোন, এখানে আমি জন সংযোগের চেষ্টা করি। অবশ্য যদি পেটপালাই আপনার একমাত্র লক্ষ্য হয়, তাহলে অন্য কোন দেশে গমণ করুন। এখানকার লোকেরা আত্মশক্তির বলে (উযধশ) চলে না বরং পরের নামের পরে (ঐধহশ) চলে। মহারাজের প্রজাদের কপালে অশেষ দুঃখ আছে। কেননা, নিশ্চয়ই সৈন্যদল এখানে হানা দেবে।

১৭৯৫ খ্রিষ্টাব্দে পূর্ণিয়ার কালেক্টরের কাছ থেকে রেভিনিউ বোর্ড ও তার প্রেসিডেন্টের কাছে পাঠানে সংবাদে সংবাদটি ছিল এরূপ:-
 “করিম শাহ নামে একজন ফকীর নেতা পঞ্চাশজন ঘোড়াসাওয়ার ও প্রায় তিনশ বরকন্দাজসহ এখানে এসে পৌঁছেছেন। তাঁরা পশ্চিম দিক থেকে এসেছেন। তাদের সংগে সামরিক চিহ্নযুক্ত পতাকাদি কয়েকজন উষ্টারোহী ও অশ্বারোহী লোকজনও আছে। প্রতিদিনই তার দলে লোকসংখ্যা বাড়ছে। প্রতি পদাতিকের জন্য তিনি পাঁচ টাকা করে মাসিক মাহিনা দেন এবং ঘোড় সাওয়ারের বাবদ পনেরো টাকা। এরা ফরকিয়া, বলিয়া ইত্যাদি পরগণার লোক। ফকীর সাহেব তাদের এক মাসের বেতন আগাম দিয়ে থাকেন এবং তিনি যে গ্রামের মধ্যে দিয়ে যান গ্রামবাসীরা গ্রাম প্রতি তাঁকে এক টাকা করে সালামী দিয়ে থাকে।”

নেপালে, ভুটানে আশ্রিত অবস্থায় থেকেও তিনি কর্তব্যকর্ম থেকে নিজেকে বিরত রাখেননি। সাধারণ মানুষকে শিষ্য করে তাদেরকে যুদ্ধ বিদ্যায় পারদর্শি করে তুলেছিলেন। সারাটি জীবন তিনি সাধারণ মানুষের পাশে থেকে অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম করে গেছেন। তাঁর দেশ প্রেমের আদর্শকে ধরে রাখেন তাঁর ঔরসজাত সন্তান ছপাতিশাহ পাগলপন্থী ফকির ও টিপুশাহ পাগলপন্থী ফকির।  

এই মানব দরদী চির স্বাধীন চেতা পাগলপন্থী কৃষক বিদ্রোহের নেতা করমশাহ পাগলপন্থী ফকির ১৮১৩ খ্রিষ্টাব্দে পরলোক গমন করেন। উনাকে সমাহিত করা হয় লেটীর কান্দা পাগল বাড়ীতে। উনার মাজারে প্রতিদিনই লোকজন আসে এবং মাজার জিয়ারত করে। প্রতি বছর মাঘ মাসে সপ্তাহ ব্যাপী ওরস পালিত হয়। সকল শ্রেণীর লোকদের নিয়ে দোয়া মাফিল অনুষ্ঠিত হয়। আমরা যেন দোয়া মাফিলে শরিক হয়ে উনার আত্মার মাগফেরাত কামনা করি।

লেখক; শিরীন আক্তার।

রাজনীতিতে করমশাহ পাগলপন্থী ফকির

প্রতিবেদক নাম: স্টাফ রিপোর্টার ,

প্রকাশের সময়ঃ ১৭ মে ২০১৮, ১২:৪৫ পিএম

১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর আম্রকাননে যখন নবাব সিরাজ-দৌল্লার সূচনীয় পরাজয় নেমে আসে, তখনই ইংরেজ কোম্পানীর হাতে শাসন ক্ষমতা চলে যায়। ইংরেজ কোম্পানীর বিরোদ্ধে সর্ব প্রথম ফকির মজনুশাহ (নবাব নূর উদ্দীন বাকের মোহাম্মদ জঙ্গ বাহাদুর) সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য বিদ্রোহ আরম্ভ করেন। এই বিদ্রোহের সময়কাল হল ১৭৬৩ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৭৮০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত। ইতিহাসে এই আন্দোলনকে ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ বলা হয়। ১৭৮৮ খ্রিস্টাব্দে জানুয়ারি মাসে ভারতের মাখনপুরের যুদ্ধাহত ফকির মজনু শাহের কর্মময় জীবনের অবসান ঘটে। উনার বিস্বস্ত সংগ্রামী সাথী ছিলেন করশাহ পাগলপন্থী ফকির। ফকির মজনুশাহের মৃত্যুর পর ইংরেজ কোম্পানীর বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে যান পাগলপন্থী কৃষক বিদ্রোহের জনক করম শাহ পাগলপন্থী ফকির। তিনি শেরপুর, ধোবাউড়া, নেত্রকোণা অঞ্চলের গারো, হাজং, বানাই ও সাধারণ মানুষদেরকে নিয়েই এ আন্দোলন সংগঠিত করেছিলেন। কোন কোন গ্রন্থে তাঁকে করিম শাহ বাবজী বলে অভিহিত করেছেন।  

স্বাধীনচেতা এই সূফী সাধক পাগলপন্থী কৃষক বিদ্রোহের জনক করমশাহের জন্ম ১৭১০ খ্রিষ্টাব্দে। তাঁর বাল্য নাম চাঁন খাঁ গাজী / চাঁন গাজী। তিনি ছিলেন দশকাহনীয়া পরগনার মুসলিম শাসক শের খাঁ গাজী / শের আলী গাজীর পুত্র। শের আলী গাজী হিন্দু নন্দী ও মুর্শিদকুলী খাঁর ষড়যন্ত্রের স্বীকার হয়ে জমিদারী হারান। জমিদারী হারিয়ে রিক্ত হস্তে স্ত্রী সন্তান নিয়ে অজ্ঞাত বাসে চলে যান সেখানেও তাঁকে বাঁচতে দেয়নি নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ ও হিন্দু নন্দীরা। শের আলী গাজীর মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী শিশু পুত্রকে নিয়ে শেরপুরের প্রান্ত সীমায় শালকোনা নামক স্থানে নিরাপদ আশ্রয় গ্রহণ করেন। (এটি ধোবাউড়া উপজেলার মুন্সিরহাট বাজারের কাছে।) আত্মগোপন অবস্থাতেই শের আলী গাজীর স্ত্রী মারা যান। উনাকে সমাহিত করা হয় দূর্গাপুর উপজেলার পুকুরাকান্দা গ্রামে। পরে পাগলপন্থী কৃষক বিদ্রোহের জনক করম শাহ পাগলপন্থী ফকির সুসঙ্গ পরগাণার শংকরপুর নামক স্থানে বসতি স্থাপন করেন। বসতি স্থাপনের পর অনেক বাঁধাবিপত্তি অতিক্রম করে সুসঙ্গ মহারাজার কাছ থেকে সাতশ পঞ্চাশ একর জমি বন্দোবস্ত পান। পরে এই জমির দখল নিয়ে পারিবারিক কলহ সৃষ্টি হয়। পারিবারিক কলহ রাজনৈতিক কারণে করমশাহ শংকরপুর ত্যাগ করে কংস নদীর দক্ষিণ তীরে লেটীর কান্দায় আবাস স্থানান্তর করেন। কথিত আছে নতুন আবাস্থলে করমশাহ পাগলপন্থী ফকির লেটা বা জানু পেতে বসে থাকতেন বলে গ্রামের নামকরণ করা হয় লেটীরকান্দা। ডক্টর গৌতম ভদ্রের লিখায় পাই সরকারী দলিলে করিমশাহের বর্ণনা আছে এইভাবে যে, শেরপুরের সাতসিক্কা ও সঙ্গের সীমান্তে ও পাহাড়ের সন্নিহিত অঞ্চলে বসবাসকারী জনগণের মধ্যে অনাচার (ওৎৎবংড়ষঁঃব ঃৎধরঃং) দেখে করিম নামে এক মুসলমান ফকির প্রায় ৫০ বছর আগে এই অঞ্চলে ডেরা গাড়েন। তিনি নিজেকে ধর্ম-সংস্কারক ও ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা বলে ঘোষণা করেন। (জবভড়ৎসবৎধহফ ঝড়ঃযংধুবৎ) তদপেক্ষা উল্লেখযোগ্য সে, তিনি তাঁর পূর্বমত ত্যাগ করে নিজেকে দ্বৈতবাদী (উবরংঃ) বলে দাবী করেন এবং তাঁর এলাকার হবু ভক্তদের কথা ভেবে তদুপযোগী ধর্মমত চালু করেন। করমশাহ পাগলপন্থী ফকির তিনি মূলত সূফী সাধক ছিলেন। পরবর্তী সময়ে সূফীবাদীকে ফুজি করে বাউল সাধনার মাধ্যমে সকল মানুষকে ঐক্য বদ্ধ করে রাজনীতি চালিয়ে যান। তিনি আওয়াজ নামে তিনশ ষাটটি গীতি কাব্য রচনা করেছিলেন। এইগুলির মাধ্যমে সকল ধর্মের মানুষকে একত্রিত করে সংগঠিত করতে পেরেছিলেন। করমশাহ একদিকে বাউল সম্প্রদায় ভূক্ত অন্যদিকে মুসিলিম ঐতিহ্যবাহী ও সংগীতাশ্রয়ী। সংগীত ছিল তাঁর অন্যতম মাধ্যম। করমশাহ পালগপন্থী ফকির আনুমানিক ১৭৭৫ খ্রিষ্টাব্দে সুসঙ্গ ও শেরপুর পরগণার গারো, হাজং, ডালু, বানাই ইত্যাদি আদিবাসী সম্প্রদায়ের লোকজনদের পাগলপন্থী মতবাদে দীক্ষিত করেন। তিনি সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ করে সকল সম্প্রদায়ের মানুষকে ঐক্য বদ্ধ করতে পেরেছিলেন। তিনি ভাই সাহেব বলে সম্বোধন করতেন। করমশাহ পাগলপন্থী ফকির শুধু সূফী সাধকই নন। তিনি সকল শ্রেণীর লোকদের কাছে অধিকার আন্দোলনের নেতা হিসেবে পরিচিত। তাঁর অন্যতম প্রধান অনুসারী ছিলেন তাঁর জেষ্ঠ্য পুত্র ছপাতি শাহ পাগলপন্থী ফকির। করম শাহ পাগলপন্থী ফকিরের অনেক শিষ্যভক্ত হয়েছিল। তিনি একজন যোগ্য নেতৃত্বকারী ব্যক্তি হিসেবে যোগ্যতা অর্জন করতে পেরেছিলেন।

পাগলপন্থী কৃষক বিদ্রোহের জনক করমশাহ পাগলপন্থী ফকির পিতার স্বাভাবিক আত্মগোপন এবং অস্বাভাবিক মৃত্যুকে তিনি মেনে নিতে পারেননি। এক্ষেত্রে পাগলপন্থী করমশাহ সাধারণ মানুষের স্বার্থ আদায়ের পাশাপাশি পিতার জমিদারী উদ্ধার এবং জমিদারীচ্যুত্যের প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য সম্ভবত তিনি সূফীবাদী হয়েও রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। অপরদিকে পাঠান স্থানীয় আফগান বংশদ্ভুত জমিদারী রক্ত প্রবাহিত ছিল করশাহের শরীরে। তাই তিনি সূফীবাদী লোক হয়েও রাজনৈতিক চেতনাকে বাদ দিতে পারেন নি।

ইংরেজরা এ বিদ্রোহীদের দস্যু, ডাকাত বলে অপবাদ দিত। ১৭৯৩ খ্রিষ্টাব্দে লর্ড কর্ণওয়ালিশের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তকে তরান্বিত করতে ইংরেজ সেনাবাহিনী করমশাহ সহ তাঁর অনুসারীদের তাড়িয়ে বেড়ায়। তিনি নেপালে, ভুটানে আশ্রয় গ্রহণ করেন, ভুটানে আশ্রয় গ্রহণ করেন। নেপালরাজ স্বহৃদয়তার সংগে করম শাহসহ অন্যান্য আশ্রিতদের নেপাল রাজ্য ত্যাগের অনুরোধ জানিয়েছিল। এ সম্পর্কে সেই সময়কার কালেক্টর মি. বজের্স মুবংস্থিত কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে নেপালী সুবার উকীল দেওসিং উপাধ্যায় ২৪ অক্টোবর ১৭৯৪ খ্রিষ্টাব্দে দুখানা পত্র লিখেন। এর মধ্যে করমশাহ-র উদ্দেশ্য পত্রটির বঙ্গানুবাদ এরূপ:-

“পেয়ারে দোস্ত শ্রীকরীম শাহজী বরাবর- দেওসিং উকীল আপনাকে সালাম পাঠাচ্ছে। আমি ভাল আছি রোজই আপনার সুন্দর স্বাস্থ্য ও সুখী জীবনের জন্য প্রার্থনা করি। বড় সাহেব (কালেক্টর সাহেব) আমাকে নিম্নরূপ নির্দেশ দিয়েছেন। করীমশাহ-কে বন্দী করে পাঠিয়ে দাও। উভয় পক্ষে বড় কঠোর উত্তর-প্রত্যুত্তর হয়েছে। অবশেষে ভদ্রলোক আশা করেছেন যে, আমি যদি করীমশাহকে ধরে না দেই, তবে তারা তাকে ধরবার জন্য সৈন্য পাঠাবেন।” অতএব আপনাকে জানানো যাচ্ছে যে, মি. স্মিত গোলাগুলি সংগ্রহ করছেন, ভোপালার কাছে সিপাহীর জন্য লোক পাঠিয়েছেন। তাই আপনি সবাধান হোন। মহারাজের সংগে পরামর্শ করুন, তিনি যদি আপনাকে সাহায্য করেন এবং আপনি যদি নিজেকে তাঁর সমকক্ষ মনে করেন, যুদ্ধের জন্য তৈরী হোন, এখানে আমি জন সংযোগের চেষ্টা করি। অবশ্য যদি পেটপালাই আপনার একমাত্র লক্ষ্য হয়, তাহলে অন্য কোন দেশে গমণ করুন। এখানকার লোকেরা আত্মশক্তির বলে (উযধশ) চলে না বরং পরের নামের পরে (ঐধহশ) চলে। মহারাজের প্রজাদের কপালে অশেষ দুঃখ আছে। কেননা, নিশ্চয়ই সৈন্যদল এখানে হানা দেবে।

১৭৯৫ খ্রিষ্টাব্দে পূর্ণিয়ার কালেক্টরের কাছ থেকে রেভিনিউ বোর্ড ও তার প্রেসিডেন্টের কাছে পাঠানে সংবাদে সংবাদটি ছিল এরূপ:-
 “করিম শাহ নামে একজন ফকীর নেতা পঞ্চাশজন ঘোড়াসাওয়ার ও প্রায় তিনশ বরকন্দাজসহ এখানে এসে পৌঁছেছেন। তাঁরা পশ্চিম দিক থেকে এসেছেন। তাদের সংগে সামরিক চিহ্নযুক্ত পতাকাদি কয়েকজন উষ্টারোহী ও অশ্বারোহী লোকজনও আছে। প্রতিদিনই তার দলে লোকসংখ্যা বাড়ছে। প্রতি পদাতিকের জন্য তিনি পাঁচ টাকা করে মাসিক মাহিনা দেন এবং ঘোড় সাওয়ারের বাবদ পনেরো টাকা। এরা ফরকিয়া, বলিয়া ইত্যাদি পরগণার লোক। ফকীর সাহেব তাদের এক মাসের বেতন আগাম দিয়ে থাকেন এবং তিনি যে গ্রামের মধ্যে দিয়ে যান গ্রামবাসীরা গ্রাম প্রতি তাঁকে এক টাকা করে সালামী দিয়ে থাকে।”

নেপালে, ভুটানে আশ্রিত অবস্থায় থেকেও তিনি কর্তব্যকর্ম থেকে নিজেকে বিরত রাখেননি। সাধারণ মানুষকে শিষ্য করে তাদেরকে যুদ্ধ বিদ্যায় পারদর্শি করে তুলেছিলেন। সারাটি জীবন তিনি সাধারণ মানুষের পাশে থেকে অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম করে গেছেন। তাঁর দেশ প্রেমের আদর্শকে ধরে রাখেন তাঁর ঔরসজাত সন্তান ছপাতিশাহ পাগলপন্থী ফকির ও টিপুশাহ পাগলপন্থী ফকির।  

এই মানব দরদী চির স্বাধীন চেতা পাগলপন্থী কৃষক বিদ্রোহের নেতা করমশাহ পাগলপন্থী ফকির ১৮১৩ খ্রিষ্টাব্দে পরলোক গমন করেন। উনাকে সমাহিত করা হয় লেটীর কান্দা পাগল বাড়ীতে। উনার মাজারে প্রতিদিনই লোকজন আসে এবং মাজার জিয়ারত করে। প্রতি বছর মাঘ মাসে সপ্তাহ ব্যাপী ওরস পালিত হয়। সকল শ্রেণীর লোকদের নিয়ে দোয়া মাফিল অনুষ্ঠিত হয়। আমরা যেন দোয়া মাফিলে শরিক হয়ে উনার আত্মার মাগফেরাত কামনা করি।

লেখক; শিরীন আক্তার।