২২, সেপ্টেম্বর, ২০১৯, রোববার | | ২২ মুহররম ১৪৪১


আসামের এনআরসি পর্যালোচনা: মশকরা নিজেই লজ্জ্বা পাবে

••ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতির পরিবার ‘রাষ্ট্রহীন’••

রিপোর্টার নামঃ কাফি কামাল | আপডেট: ০২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১১:৫৩ এএম

আসামের এনআরসি পর্যালোচনা: মশকরা নিজেই লজ্জ্বা পাবে
কাফি কামাল, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক মানব জমিন

ভারতের পঞ্চম রাষ্ট্রপতি ছিলেন ফখরুদ্দিন আলি আহমেদ। তিনি ১৯৭৪ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদপড়ার পর ফখরুদ্দিন আলির নাতি সাজিদ আলি আহমেদ (জিয়াউদ্দিন আলী আহমেদ ছেলে) জানান, তাঁর নাম আসাম রাজ্যের চূড়ান্ত নাগরিক তালিকায় নেই। এমনকি তাঁর বাবার নামও নেই সেই তালিকায়।ইন্ডিয়া টুডেকে সাজিদ আলি বলেন, ‘আমার দাদার নাম ইকরামুদ্দিন আলি আহমেদ। এবং তাঁর ভাই ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি ফখরুদ্দিন আলি আহমেদ। আমি তাঁর নাতি। আমরা আসামের কামরূপের রঙ্গিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছি। আমরা এখানকার স্থানীয় বাসিন্দা। চূড়ান্ত নাগরিক তালিকায় আমাদের নাম নেই তাই আমরা চিন্তিত। আমরা সাবেক রাষ্ট্রপতির পরিবারের লোক কিন্তু আমাদেরই নাম নেই নাগরিক তালিকায়।’

কাছাড় জেলার দুবারের বিধায়ক (এমএলএ) আতাউর রহমান এনআরসির কোপে পড়ে ভারতীয় নাগরিকের তালিকায় নাম তুলতে পারেননি। তাঁকে রাখা হয়েছে বিদেশির তালিকায়। 
চূড়ান্ত নাগরিক তালিকায় স্থান হয়নি মোহাম্মদ সানাউল্লাহ নামের এক ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তার। খবর হিন্দুস্তান টাইমসের। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, এনআরসির চূড়ান্ত তালিকায় এই সেনা কর্মকর্তার তিন সন্তান, দুই মেয়ে ও এক ছেলের নাম নেই। কিন্তু স্ত্রীর নাম রয়েছে সেখানে। মোহাম্মদ সানাউল্লাহ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে জুনিয়র কমিশনড অফিসার (জেসিও) পদধারী ছিলেন। তিনি কারগিল যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। রাষ্ট্রপতি পদকও রয়েছে তার। এমন সাবেক সেনা কর্মকর্তার ঠাঁই হয়নি আসামের নাগরিক সনদে। আবার আসামে একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীর ছেলে ভবতোষ চক্রবর্তী নাম তুলতে পারেননি এনআরসির তালিকায়। এমনই হাজারো মানুষ আসামে যুগ যুগ ধরে বাস করলেও তাদের রাখা হয়েছে বিদেশি তালিকায়। এটা আমরা মানব কীভাবে? 
ছোটগুমার বাসিন্দা আসিনা বেওয়া বলেন, “তালিকায় আমার নাম আছে, অথচ তিন ছেলে, দুই বৌমা ও তিন নাতির নাম তালিকায় নেই। অথচ প্রয়োজনীয় কাগজ জমা দিয়েছিলাম। শুনানিও হয়।” এলাকার আরেক বাসিন্দা আক্কেল শেখ বলেন, “কলকাতা থেকে নথি জোগাড় করে জমা দিয়েছিলাম। তা-ও তালিকায় নাম ওঠেনি।” সইদুল হক বলেন, “আমার নাম আছে, কিন্তু স্ত্রীর নাম তালিকায় নেই।” স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, কোচবিহারে আদি বাড়ি, এমন বাসিন্দাদের অনেকেও সমস্যায় পড়েছেন।

•হিতে বিপরীত• 
চূড়ান্ত এনআরসির ধর্মীয় তাৎপর্যও বিপুল। ‘বিদেশি খেদাওয়ের’ যে উদ্দেশ্য নিয়ে এই প্রক্রিয়া শুরু, তার নেপথ্যে মূল টার্গেট ছিল মুসলিম খেদানো। বিজেপি ও আরএসএস পরিবার এত দিন এনআরসি প্রক্রিয়াকে উৎসাহিত করেছিল এই ভেবে যে, মূলত মুসলমানরাই লাখে লাখে ‘অবৈধ’ হিসেবে শনাক্ত হবে। বিজেপির বরাবরই সম্ভাব্য এই ‘বিদেশি’দের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোকে প্রধান এক জাতীয় রাজনৈতিক অঙ্গীকার হিসেবে প্রচার করছিল। ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনকালে এবং ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারের সময় অমিত শাহ বলেছিলেন, এনআরসিতে যাদের নাম থাকবে না, তাদের বিজেপি ক্ষমতায় এসে অবশ্যই বাংলাদেশে পাঠাবে। চূড়ান্ত তালিকা তা সফল করতে পারেনি। শুধু তা–ই নয়, বিজেপির আশঙ্কা, মুসলমান বাঙালির তুলনায় বাদ পড়া নামের তালিকায় হিন্দু বাঙালি ও উপজাতিদের নাম বেশি। এনআরসি থেকে বাদ পড়াদের মধ্যে রয়েছে ১১ লাখেরও বেশি হিন্দু বাঙালি। ছয় লাখের কিছু বেশি মুসলমান। বাকি দুই লাখের মধ্যে রয়েছে বিহারী, নেপালী, লেপচা প্রভৃতি। এ নিয়ে অস্বস্তিতে পড়েছে বিজেপিশাসিত আসাম রাজ্য সরকার। এই ‘হিতে বিপরীত’ অবস্থার জন্যই বিস্মিত হিমন্ত বলে ফেলেছেন, বাংলাদেশ লাগোয়া জেলা দক্ষিণ সালমারা বা ধুবুরিতে তালিকা থেকে বাদ পড়া মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে কম। তুলনায় কারবি আংলংয়ের মতো ভূমিপুত্র এলাকায় বাদ পড়েছেন বেশি মানুষ। যার কারনে মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল এখন আইনি প্রক্রিয়ার সময় বাড়ানো ও আইনি সহায়তা দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। এনআরসি থেকে বাদ পড়াদের জন্য তাঁর সহানুভূতি তাঁর রাজনৈতিক অতীতের সঙ্গে একদম বেমানান হলেও মুখ্যত বাদ পড়াদের ধর্মীয় পরিচয়ই পরিবর্তিত অবস্থার কারণ।
চূড়ান্ত এনআরসিতে নাগরিকত্বহারাদের মধ্যে হিন্দুদের সংখ্যা মুসলমানদের দ্বিগুণ হওয়ার গোয়েন্দা তথ্যের পরই অমিত শাহ ও সর্বানন্দ সোনোয়াল তাঁদের অবস্থান পাল্টাতে শুরু করেন। জেলাভিত্তিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, হিন্দুপ্রধান তিনশুকিয়া, হোজাই, দরং, কামরূপ মেট্রো ইত্যাদি জেলাগুলোতেই অধিকসংখ্যক মানুষ রাষ্ট্রবিহীন হয়ে পড়েছে। মুসলমানপ্রধান ধুবড়ি, করিমগঞ্জ, হাইলাকান্দি থেকে প্রায় ৯৫ শতাংশ মানুষের নাগরিকত্ব নিশ্চিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ফলে মুসলিম তাড়াতে গিয়ে এখন হিন্দুদের ধুতিতে টান পড়েছে। 
 আবার ১৯ লাখের মধ্যে ১লাখের বেশি আছে গোর্খা। গোর্খাদের বাদ পড়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে গোর্খা জনমু্ক্তি মোর্চার বিনয় তামাংদের অংশও। বিবৃতি জারি বৈষম্যে অভিযোগ তুলে তীব্র প্রতিবাদও করেছেন বিনয়। তিনি জানিয়েছেন, খুব শীঘ্রই গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার একটি প্রতিনিধি দল অসম পরিদর্শন করবে। লোকসভা ভোটের প্রচারে বিজেপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, এনআরসির জন্য ভারতীয় গোর্খাদের এক জনও সমস্যায় পড়বেন না। সেই প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেছেন, ‘দার্জিলিংয়ের সাংসদ রাজু বিস্তা, বিজেপি বিধায়ক নীরজ তামাং জিম্বা, বিমল গুরুং, রোশন গিরিদের এবং বাংলা ও অসমের বিজেপি নেতাদের প্রশ্ন করতে চাই, অসমের এক লাখ গোর্খা সম্প্রদায়ের মানুষের কী হল? বিজেপি এবং তার শরিকদেরই এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।’

•প্রধান বিচারপতি যখন পক্ষপাতদুষ্ট হয়•

ভারতের ২৮টি রাজ্যের মধ্যে একমাত্র আসামেই সম্পন্ন হলো ‘ন্যাশনাল রেজিস্ট্রেশন অব সিটিজেন’ বা এনআরসি। মূলত অসমিয়া তরুণদের একাংশের দীর্ঘদিনের জাতিবাদী রাজনীতির ফল এই নাগরিকপঞ্জি।নিখিল আসাম ছাত্র ইউনিয়ন বা ‘আসু’ ই প্রথম তথাকথিত ‘বিদেশি’ প্রশ্নে আসামে আন্দোলন শুরু করে। পাঁচ বছর স্থায়ী ওই আন্দোলন শেষে ১৯৮৫ সালের আগস্টে রাজীব গান্ধীর সরকার আসুর সঙ্গে চুক্তি করেন এবং ধীরে ধীরে আসামে ‘বিদেশি’ শনাক্ত করার বিবিধ কার্যক্রম শুরু হয়। যার বড় অধ্যায় শেষ হলো প্রায় ৩৪ বছর পর, ২০১৯ সালের আগস্টে এসে। এনআরসির বিষয়ে ভারতের বর্তমান প্রধান বিচারপতির আগ্রহ ও প্রভাব ছিল ব্যাপক। তিনি আসামেরই নাগরিক এবং অসমিয়া পরিবারের সন্তান। কেন্দ্রীয় সরকার, রাজ্য সরকার ও প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈর ত্রিমুখী আগ্রহ থেকেই গত বছর এনআরসির চূড়ান্ত খসড়া প্রকাশ হয়েছিল। তাতে ৪০ লাখ মানুষকে অবৈধ বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করে তাদের আসামের নাগরিকত্বের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। সেই মানুষদের মধ্যে প্রায় ৩৬ লাখ বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য আবেদন করে। সর্বশেষ ৩১ আগস্টের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের মধ্য দিয়ে আসামের ১৯ দশমিক ৬ লাখ মানুষকে নাগরিকত্বহীন এবং রাষ্ট্রীয় পরিচয়হীন ঘোষণা করা হলো।

•প্রোপাগান্ডার মুখোশ খুলে গেছে•

আসামের মোট জনসংখ্যা ৩ কোটি ২০ লাখ এত বছর ধরে প্রোপাগান্ডা চালানো হয়েছে, অর্থাৎ ১৯৭৯ থেকে গত চার দশক এই নেতারা বলেছেন, ৮০ লাখ বাংলাভাষী আসামে অবৈধভাবে বসবাস করছে। যা মোট জনসংখ্যার ২৮ভাগ প্রায়। কল্পিত এসব সংখ্যাই ছিল আসামের রাজনীতিতে তাদের এতদিনকার পুঁজি। রাজ্যপাল নিবাস কুমার সিনহা ১৯৯৮ সালের নভেম্বরে রাষ্ট্রপতি কে আর নারায়ণনকে চিঠি লিখে দাবি করেছিলেন, এই রাজ্য ৪০ লাখ বাংলাদেশি রয়েছে। এই চিঠির পর থেকেই বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতার বসানো শুরু। আসু এ সময়রাজনৈতিক জনসভাগুলোতে আসামে ৮০ লাখ বাংলাদেশির অস্তিত্বের কথা বলেছিল। বহুল আলোচিত নাগরিকপঞ্জি বা এনআরসির ৩১ আগস্টের সর্বশেষ ঘোষণায় সে সংখ্যা নেমে এসেছে ১৯ লাখে। যা ৬-৭ শতাংশের মতো। আইনগত প্রক্রিয়া শেষে এ সংখ্যা নিশ্চিতভাবই আরও কমবে। এর মধ্যদিয়ে প্রোপাগান্ডার মুখোশ খুলে গেছে। আসামে এতদিনকার প্রচারণার বিপরীতে ১৯ লাখ সংখ্যাটি বেশ ছোট। ফলে চূড়ান্ত এনআরসিকে আসুর জন্য নৈতিক ও রাজনৈতিক পরাজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।

•রাষ্ট্রবিহীনদের ভবিষ্যৎ কী হবে•

চূড়ান্ত এনআরসি ঘোষিত হলেও বিষয়টি এখানেই শেষ হচ্ছে না। কেবল রাজনৈতিকভাবে তো নয়ই, এমনকি প্রশাসনিকভাবেও আরও দীর্ঘ সময় এর ধারাবাহিকতা চলবে। এ মুহূর্তে যারা নিজেদের নাম চূড়ান্ত এনআরসিতে খুঁজে পায়নি তারা অনেকেই আবার আইনগত আবেদনের জন্য প্রস্তুত হতে শুরু করেছে। মূলত ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে এই আবেদন যাবে। এইরূপ প্রায় ২০০ ট্রাইব্যুনাল কাজ করতে শুরু করবে আগামী মাসগুলোতে। ট্রাইব্যুনালে প্রত্যাখ্যাতরা গুয়াহাটি হাইকোর্টেও যেতে পারবে।
একেবারে শেষ পর্যায়ে যারা বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যাবে, তাদের কী করা হবে, সে বিষয়ে আসাম কিংবা ভারত সরকার—কেউই স্পষ্টভাবে কিছু বলছে না। তবে আইনগত অনুমান হলো, এরা ডিটেনশন ক্যাম্পে আটক হবে।আসামের রাজনৈতিক ভাষ্যকারদের ধারণা, চূড়ান্তভাবে ‘বিদেশি’ সাব্যস্তদের এক ধরণের বিশেষ ওয়ার্ক পারমিট দিয়ে বিশেষ অঞ্চলে রাখার ব্যবস্থা করা হতে পারে এবং এদের ফেরত নেওয়ার জন্য বাংলাদেশকে চাপে রাখারও চেষ্টা চলবে।

•নজিরবিহীন বৈশ্বিক দৃষ্টান্ত: প্রতি বর্গমাইলে ট্রাইব্যুনাল?•

৩০ হাজার ২৮৫ বর্গমাইল আয়তনের আসামে ইতিমধ্যে কাজ করছে ১০০টি ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল। এ মাস থেকেই কাজ করতে যাচ্ছে আরও ২০০ ট্রাইব্যুনাল । আসাম রাজ্য সরকারের পরিকল্পনা হলো মোট এক হাজার ট্রাইব্যুনাল স্থাপিত হবে সেখানে। তাতে রাজ্যটির প্রতি বর্গমাইলে একটা করে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল বসবে। বৈশ্বিক দৃষ্টান্ত হিসাবে যা হবে এক নজিরবিহীন ঘটনা। আবার ট্রাইব্যুনালে রাজ্য সরকারের প্রভাব ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। কাজ বিচার হলেও আসামের ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালগুলো কার্যত নিয়ন্ত্রণ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ট্রাইব্যুনালের সদস্যদের ওপর সরকারের দৃঢ় ‘নিয়ন্ত্রণ’-এর কারণেই তার কাজে রয়েছে জন–আস্থার সংকট। আইনজীবী এবং তাঁদের মক্কেল- উভয় তরফে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালগুলো নিয়ে রয়েছে বিস্তর অনুযোগ। ট্রাইব্যুনালে যারা সহানুভূতিশীল ছিলেন তাদের ‘অদক্ষতা’র কথা বলে বাদ দেওয়া হয়েছে ট্রাইব্যুনাল থেকে। নিয়োগ দেয়া হচ্ছে পক্ষপাতদুষ্টদের।

•রাজ্যজুড়ে বানাও কারাগার•

এনআরসি থেকে বাদপড়া তথাকথিত বিদেশিদের রাখতে দরকার শত শত ডিটেনশন সেন্টার। নিয়ম অনুযায়ী, এনআরসি থেকে বাদ পড়া ব্যক্তিদের নামে নোটিশ যাবে এবং তাঁরা নির্দিষ্ট দিনে ট্রাইব্যুনালে হাজির হবেন। এরূপ হাজিরার পর সরকারি সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আবেদনের জন্য ১২০ দিন সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের বিবেচনা শেষ পর্যন্ত কেউ যদি বেনাগরিক বিবেচিত হয়ে যান, তখন তাঁর জন্য নির্ধারিত স্থান হবে ‘ডিটেনশন ক্যাম্প’। এগুলোর পরিবেশ কারাগারতুল্য। ১৯ লাখ মানুষের অর্ধেকও যদি শেষ বিচারে বিদেশি বেনাগরিক সাব্যস্ত হয়ে যান, তাহলে এত মানুষকে রাখার মতো ডিটেনশন ক্যাম্প আসাম কোথায় পাবে? বর্তমানে ছয়টি ডিটেনশন সেন্টারসহ আসামে ৩১টি কারাগার রয়েছে। এগুলোর ধারণক্ষমতা ৮ হাজার ৯৩৮ জন। এরই মধ্যে সেখানে ১০ হাজারের অধিক বন্দী অবস্থান করছে।আইনগতভাবে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে বিদেশি সাব্যস্ত ব্যক্তিদের জন্য ন্যায়বিচার পাওয়ার সর্বশেষ স্তর হলো ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। সেখানে একটা মামলা পেশ করতে কাগজপত্র তৈরির প্রক্রিয়ায় অন্তত দেড় দুইমাস সময় লাগবে। এই সময়টিতে ট্রাইব্যুনাল থেকে ঘোষিত প্রত্যেক বেনাগরিককে যদি ডিটেনশন সেন্টারে রাখতে হয়, তাহলে আসামকে আসন্ন দিনগুলোয় শত শত কারাগারতুল্য কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। ফলে আসামে এক সম্ভাব্য নজিরবিহীন অবস্থা অপেক্ষা করছে।

•পশ্চিমবঙ্গে মিশ্রপ্রতিক্রিয়া•

ভারতের আসাম রাজ্যে এনআরসি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিবিদেরা। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শনিবার এনআরসি প্রকাশের পর এক টুইটে বলেন, ‘রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে চেয়েছিল ওরা। এবার তাদের মুখোশ খুলে দিয়েছে এই এনআরসি বিপর্যয়। দেশের কাছে এবার জবাব দিতে হবে তাদের। দেশ ও সমাজের স্বার্থ পরিহার করে অসৎ উদ্দেশ্যে কাজ করলে এমনটাই ঘটে।’
কংগ্রেস নেতা ও সাংসদ অধীর চৌধুরী বলেছেন, ‘আমরা চাই কোনো ভারতীয় নাগরিক যেন এনআরসির কোপে বাদ না পড়েন। ওদের সরকার, ওরা যেখানে ইচ্ছে সেখানে এনআরসি চালু করতে পারে। ওরা সংসদেও এনআরসি চালু করতে পারে। আমার বাবাও বাংলাদেশে থাকতেন। সেই হিসাবে আমিও বহিরাগত।’ 
সিপিএম বলেছে, দেশে বিজেপি সরকারের লক্ষ্য বিভাজন ও মেরুকরণের রাজনীতি।
এনআরসিকে সমর্থন দিয়ে বিজেপির পশ্চিমবঙ্গের সভাপতি দিলীপ ঘোষ বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশি মুসলিম অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে ফেরত পাঠাবেন। আর নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করে হিন্দু অনুপ্রবেশকারীদের শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় দেবেন।
বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতা ও পশ্চিমবঙ্গের বিজেপির ভারপ্রাপ্ত পর্যবেক্ষক কৈলাশ বিজয়বর্গীয় বলেছেন, ‘শুধু আসাম নয়, পশ্চিমবঙ্গসহ সারা দেশেই চালু করা হবে এনআরসি। তবে এনআরসিতে যাঁদের নাম বাদ গিয়েছে অথচ তাঁরা ভারতীয়, তাঁদের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে।’

•ভারতজুড়ে হুক্কা হুয়া•

দিল্লির বিজেপি সভাপতি মনোজ তেওয়ারি বলেছেন, ‘দিল্লিতে এই নিয়ে পরিস্থিতি বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। তাই দিল্লিতেও এনআরসি চালু করা প্রয়োজন।’
তেলেঙ্গানার বিজেপির পরিষদীয় দলের নেতা রাজা সিং বলেছেন- ‘এবার তেলেঙ্গানাতেও এনআরসি হোক। আসাদউদ্দিন ওয়েসি(হায়দরাবাদের এমআইএম দলের নেতা ও স্থানীয় সাংসদ) ভোট ব্যাংক বাড়াতে এখন বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা মুসলিমদের আশ্রয় দিচ্ছেন।’
আসাউদ্দিন এর জবাবে বলেছেন, ‘অমিত শাহ ব্যাখ্যা দিক তিনি খসড়া তালিকায় কীভাবে ৪০ লাখ অনুপ্রবেশকারীর সন্ধান পেয়েছিলেন? এবার কেন কমে ১৯ লাখ হলো? বিজেপি যদি শুধু হিন্দুদের শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় দেয়, তা সমান অধিকারের বিরোধী হবে।’

সূত্র: প্রথম আলো, আনন্দবাজার, যুগশঙ্খ

আসামের এনআরসি পর্যালোচনা: মশকরা নিজেই লজ্জ্বা পাবে

প্রতিবেদক নাম: কাফি কামাল ,

প্রকাশের সময়ঃ ০২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১১:৫৩ এএম

ভারতের পঞ্চম রাষ্ট্রপতি ছিলেন ফখরুদ্দিন আলি আহমেদ। তিনি ১৯৭৪ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদপড়ার পর ফখরুদ্দিন আলির নাতি সাজিদ আলি আহমেদ (জিয়াউদ্দিন আলী আহমেদ ছেলে) জানান, তাঁর নাম আসাম রাজ্যের চূড়ান্ত নাগরিক তালিকায় নেই। এমনকি তাঁর বাবার নামও নেই সেই তালিকায়।ইন্ডিয়া টুডেকে সাজিদ আলি বলেন, ‘আমার দাদার নাম ইকরামুদ্দিন আলি আহমেদ। এবং তাঁর ভাই ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি ফখরুদ্দিন আলি আহমেদ। আমি তাঁর নাতি। আমরা আসামের কামরূপের রঙ্গিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছি। আমরা এখানকার স্থানীয় বাসিন্দা। চূড়ান্ত নাগরিক তালিকায় আমাদের নাম নেই তাই আমরা চিন্তিত। আমরা সাবেক রাষ্ট্রপতির পরিবারের লোক কিন্তু আমাদেরই নাম নেই নাগরিক তালিকায়।’

কাছাড় জেলার দুবারের বিধায়ক (এমএলএ) আতাউর রহমান এনআরসির কোপে পড়ে ভারতীয় নাগরিকের তালিকায় নাম তুলতে পারেননি। তাঁকে রাখা হয়েছে বিদেশির তালিকায়। 
চূড়ান্ত নাগরিক তালিকায় স্থান হয়নি মোহাম্মদ সানাউল্লাহ নামের এক ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তার। খবর হিন্দুস্তান টাইমসের। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, এনআরসির চূড়ান্ত তালিকায় এই সেনা কর্মকর্তার তিন সন্তান, দুই মেয়ে ও এক ছেলের নাম নেই। কিন্তু স্ত্রীর নাম রয়েছে সেখানে। মোহাম্মদ সানাউল্লাহ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে জুনিয়র কমিশনড অফিসার (জেসিও) পদধারী ছিলেন। তিনি কারগিল যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। রাষ্ট্রপতি পদকও রয়েছে তার। এমন সাবেক সেনা কর্মকর্তার ঠাঁই হয়নি আসামের নাগরিক সনদে। আবার আসামে একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীর ছেলে ভবতোষ চক্রবর্তী নাম তুলতে পারেননি এনআরসির তালিকায়। এমনই হাজারো মানুষ আসামে যুগ যুগ ধরে বাস করলেও তাদের রাখা হয়েছে বিদেশি তালিকায়। এটা আমরা মানব কীভাবে? 
ছোটগুমার বাসিন্দা আসিনা বেওয়া বলেন, “তালিকায় আমার নাম আছে, অথচ তিন ছেলে, দুই বৌমা ও তিন নাতির নাম তালিকায় নেই। অথচ প্রয়োজনীয় কাগজ জমা দিয়েছিলাম। শুনানিও হয়।” এলাকার আরেক বাসিন্দা আক্কেল শেখ বলেন, “কলকাতা থেকে নথি জোগাড় করে জমা দিয়েছিলাম। তা-ও তালিকায় নাম ওঠেনি।” সইদুল হক বলেন, “আমার নাম আছে, কিন্তু স্ত্রীর নাম তালিকায় নেই।” স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, কোচবিহারে আদি বাড়ি, এমন বাসিন্দাদের অনেকেও সমস্যায় পড়েছেন।

•হিতে বিপরীত• 
চূড়ান্ত এনআরসির ধর্মীয় তাৎপর্যও বিপুল। ‘বিদেশি খেদাওয়ের’ যে উদ্দেশ্য নিয়ে এই প্রক্রিয়া শুরু, তার নেপথ্যে মূল টার্গেট ছিল মুসলিম খেদানো। বিজেপি ও আরএসএস পরিবার এত দিন এনআরসি প্রক্রিয়াকে উৎসাহিত করেছিল এই ভেবে যে, মূলত মুসলমানরাই লাখে লাখে ‘অবৈধ’ হিসেবে শনাক্ত হবে। বিজেপির বরাবরই সম্ভাব্য এই ‘বিদেশি’দের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোকে প্রধান এক জাতীয় রাজনৈতিক অঙ্গীকার হিসেবে প্রচার করছিল। ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনকালে এবং ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারের সময় অমিত শাহ বলেছিলেন, এনআরসিতে যাদের নাম থাকবে না, তাদের বিজেপি ক্ষমতায় এসে অবশ্যই বাংলাদেশে পাঠাবে। চূড়ান্ত তালিকা তা সফল করতে পারেনি। শুধু তা–ই নয়, বিজেপির আশঙ্কা, মুসলমান বাঙালির তুলনায় বাদ পড়া নামের তালিকায় হিন্দু বাঙালি ও উপজাতিদের নাম বেশি। এনআরসি থেকে বাদ পড়াদের মধ্যে রয়েছে ১১ লাখেরও বেশি হিন্দু বাঙালি। ছয় লাখের কিছু বেশি মুসলমান। বাকি দুই লাখের মধ্যে রয়েছে বিহারী, নেপালী, লেপচা প্রভৃতি। এ নিয়ে অস্বস্তিতে পড়েছে বিজেপিশাসিত আসাম রাজ্য সরকার। এই ‘হিতে বিপরীত’ অবস্থার জন্যই বিস্মিত হিমন্ত বলে ফেলেছেন, বাংলাদেশ লাগোয়া জেলা দক্ষিণ সালমারা বা ধুবুরিতে তালিকা থেকে বাদ পড়া মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে কম। তুলনায় কারবি আংলংয়ের মতো ভূমিপুত্র এলাকায় বাদ পড়েছেন বেশি মানুষ। যার কারনে মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল এখন আইনি প্রক্রিয়ার সময় বাড়ানো ও আইনি সহায়তা দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। এনআরসি থেকে বাদ পড়াদের জন্য তাঁর সহানুভূতি তাঁর রাজনৈতিক অতীতের সঙ্গে একদম বেমানান হলেও মুখ্যত বাদ পড়াদের ধর্মীয় পরিচয়ই পরিবর্তিত অবস্থার কারণ।
চূড়ান্ত এনআরসিতে নাগরিকত্বহারাদের মধ্যে হিন্দুদের সংখ্যা মুসলমানদের দ্বিগুণ হওয়ার গোয়েন্দা তথ্যের পরই অমিত শাহ ও সর্বানন্দ সোনোয়াল তাঁদের অবস্থান পাল্টাতে শুরু করেন। জেলাভিত্তিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, হিন্দুপ্রধান তিনশুকিয়া, হোজাই, দরং, কামরূপ মেট্রো ইত্যাদি জেলাগুলোতেই অধিকসংখ্যক মানুষ রাষ্ট্রবিহীন হয়ে পড়েছে। মুসলমানপ্রধান ধুবড়ি, করিমগঞ্জ, হাইলাকান্দি থেকে প্রায় ৯৫ শতাংশ মানুষের নাগরিকত্ব নিশ্চিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ফলে মুসলিম তাড়াতে গিয়ে এখন হিন্দুদের ধুতিতে টান পড়েছে। 
 আবার ১৯ লাখের মধ্যে ১লাখের বেশি আছে গোর্খা। গোর্খাদের বাদ পড়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে গোর্খা জনমু্ক্তি মোর্চার বিনয় তামাংদের অংশও। বিবৃতি জারি বৈষম্যে অভিযোগ তুলে তীব্র প্রতিবাদও করেছেন বিনয়। তিনি জানিয়েছেন, খুব শীঘ্রই গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার একটি প্রতিনিধি দল অসম পরিদর্শন করবে। লোকসভা ভোটের প্রচারে বিজেপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, এনআরসির জন্য ভারতীয় গোর্খাদের এক জনও সমস্যায় পড়বেন না। সেই প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেছেন, ‘দার্জিলিংয়ের সাংসদ রাজু বিস্তা, বিজেপি বিধায়ক নীরজ তামাং জিম্বা, বিমল গুরুং, রোশন গিরিদের এবং বাংলা ও অসমের বিজেপি নেতাদের প্রশ্ন করতে চাই, অসমের এক লাখ গোর্খা সম্প্রদায়ের মানুষের কী হল? বিজেপি এবং তার শরিকদেরই এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।’

•প্রধান বিচারপতি যখন পক্ষপাতদুষ্ট হয়•

ভারতের ২৮টি রাজ্যের মধ্যে একমাত্র আসামেই সম্পন্ন হলো ‘ন্যাশনাল রেজিস্ট্রেশন অব সিটিজেন’ বা এনআরসি। মূলত অসমিয়া তরুণদের একাংশের দীর্ঘদিনের জাতিবাদী রাজনীতির ফল এই নাগরিকপঞ্জি।নিখিল আসাম ছাত্র ইউনিয়ন বা ‘আসু’ ই প্রথম তথাকথিত ‘বিদেশি’ প্রশ্নে আসামে আন্দোলন শুরু করে। পাঁচ বছর স্থায়ী ওই আন্দোলন শেষে ১৯৮৫ সালের আগস্টে রাজীব গান্ধীর সরকার আসুর সঙ্গে চুক্তি করেন এবং ধীরে ধীরে আসামে ‘বিদেশি’ শনাক্ত করার বিবিধ কার্যক্রম শুরু হয়। যার বড় অধ্যায় শেষ হলো প্রায় ৩৪ বছর পর, ২০১৯ সালের আগস্টে এসে। এনআরসির বিষয়ে ভারতের বর্তমান প্রধান বিচারপতির আগ্রহ ও প্রভাব ছিল ব্যাপক। তিনি আসামেরই নাগরিক এবং অসমিয়া পরিবারের সন্তান। কেন্দ্রীয় সরকার, রাজ্য সরকার ও প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈর ত্রিমুখী আগ্রহ থেকেই গত বছর এনআরসির চূড়ান্ত খসড়া প্রকাশ হয়েছিল। তাতে ৪০ লাখ মানুষকে অবৈধ বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করে তাদের আসামের নাগরিকত্বের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। সেই মানুষদের মধ্যে প্রায় ৩৬ লাখ বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য আবেদন করে। সর্বশেষ ৩১ আগস্টের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের মধ্য দিয়ে আসামের ১৯ দশমিক ৬ লাখ মানুষকে নাগরিকত্বহীন এবং রাষ্ট্রীয় পরিচয়হীন ঘোষণা করা হলো।

•প্রোপাগান্ডার মুখোশ খুলে গেছে•

আসামের মোট জনসংখ্যা ৩ কোটি ২০ লাখ এত বছর ধরে প্রোপাগান্ডা চালানো হয়েছে, অর্থাৎ ১৯৭৯ থেকে গত চার দশক এই নেতারা বলেছেন, ৮০ লাখ বাংলাভাষী আসামে অবৈধভাবে বসবাস করছে। যা মোট জনসংখ্যার ২৮ভাগ প্রায়। কল্পিত এসব সংখ্যাই ছিল আসামের রাজনীতিতে তাদের এতদিনকার পুঁজি। রাজ্যপাল নিবাস কুমার সিনহা ১৯৯৮ সালের নভেম্বরে রাষ্ট্রপতি কে আর নারায়ণনকে চিঠি লিখে দাবি করেছিলেন, এই রাজ্য ৪০ লাখ বাংলাদেশি রয়েছে। এই চিঠির পর থেকেই বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতার বসানো শুরু। আসু এ সময়রাজনৈতিক জনসভাগুলোতে আসামে ৮০ লাখ বাংলাদেশির অস্তিত্বের কথা বলেছিল। বহুল আলোচিত নাগরিকপঞ্জি বা এনআরসির ৩১ আগস্টের সর্বশেষ ঘোষণায় সে সংখ্যা নেমে এসেছে ১৯ লাখে। যা ৬-৭ শতাংশের মতো। আইনগত প্রক্রিয়া শেষে এ সংখ্যা নিশ্চিতভাবই আরও কমবে। এর মধ্যদিয়ে প্রোপাগান্ডার মুখোশ খুলে গেছে। আসামে এতদিনকার প্রচারণার বিপরীতে ১৯ লাখ সংখ্যাটি বেশ ছোট। ফলে চূড়ান্ত এনআরসিকে আসুর জন্য নৈতিক ও রাজনৈতিক পরাজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।

•রাষ্ট্রবিহীনদের ভবিষ্যৎ কী হবে•

চূড়ান্ত এনআরসি ঘোষিত হলেও বিষয়টি এখানেই শেষ হচ্ছে না। কেবল রাজনৈতিকভাবে তো নয়ই, এমনকি প্রশাসনিকভাবেও আরও দীর্ঘ সময় এর ধারাবাহিকতা চলবে। এ মুহূর্তে যারা নিজেদের নাম চূড়ান্ত এনআরসিতে খুঁজে পায়নি তারা অনেকেই আবার আইনগত আবেদনের জন্য প্রস্তুত হতে শুরু করেছে। মূলত ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে এই আবেদন যাবে। এইরূপ প্রায় ২০০ ট্রাইব্যুনাল কাজ করতে শুরু করবে আগামী মাসগুলোতে। ট্রাইব্যুনালে প্রত্যাখ্যাতরা গুয়াহাটি হাইকোর্টেও যেতে পারবে।
একেবারে শেষ পর্যায়ে যারা বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যাবে, তাদের কী করা হবে, সে বিষয়ে আসাম কিংবা ভারত সরকার—কেউই স্পষ্টভাবে কিছু বলছে না। তবে আইনগত অনুমান হলো, এরা ডিটেনশন ক্যাম্পে আটক হবে।আসামের রাজনৈতিক ভাষ্যকারদের ধারণা, চূড়ান্তভাবে ‘বিদেশি’ সাব্যস্তদের এক ধরণের বিশেষ ওয়ার্ক পারমিট দিয়ে বিশেষ অঞ্চলে রাখার ব্যবস্থা করা হতে পারে এবং এদের ফেরত নেওয়ার জন্য বাংলাদেশকে চাপে রাখারও চেষ্টা চলবে।

•নজিরবিহীন বৈশ্বিক দৃষ্টান্ত: প্রতি বর্গমাইলে ট্রাইব্যুনাল?•

৩০ হাজার ২৮৫ বর্গমাইল আয়তনের আসামে ইতিমধ্যে কাজ করছে ১০০টি ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল। এ মাস থেকেই কাজ করতে যাচ্ছে আরও ২০০ ট্রাইব্যুনাল । আসাম রাজ্য সরকারের পরিকল্পনা হলো মোট এক হাজার ট্রাইব্যুনাল স্থাপিত হবে সেখানে। তাতে রাজ্যটির প্রতি বর্গমাইলে একটা করে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল বসবে। বৈশ্বিক দৃষ্টান্ত হিসাবে যা হবে এক নজিরবিহীন ঘটনা। আবার ট্রাইব্যুনালে রাজ্য সরকারের প্রভাব ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। কাজ বিচার হলেও আসামের ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালগুলো কার্যত নিয়ন্ত্রণ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ট্রাইব্যুনালের সদস্যদের ওপর সরকারের দৃঢ় ‘নিয়ন্ত্রণ’-এর কারণেই তার কাজে রয়েছে জন–আস্থার সংকট। আইনজীবী এবং তাঁদের মক্কেল- উভয় তরফে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালগুলো নিয়ে রয়েছে বিস্তর অনুযোগ। ট্রাইব্যুনালে যারা সহানুভূতিশীল ছিলেন তাদের ‘অদক্ষতা’র কথা বলে বাদ দেওয়া হয়েছে ট্রাইব্যুনাল থেকে। নিয়োগ দেয়া হচ্ছে পক্ষপাতদুষ্টদের।

•রাজ্যজুড়ে বানাও কারাগার•

এনআরসি থেকে বাদপড়া তথাকথিত বিদেশিদের রাখতে দরকার শত শত ডিটেনশন সেন্টার। নিয়ম অনুযায়ী, এনআরসি থেকে বাদ পড়া ব্যক্তিদের নামে নোটিশ যাবে এবং তাঁরা নির্দিষ্ট দিনে ট্রাইব্যুনালে হাজির হবেন। এরূপ হাজিরার পর সরকারি সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আবেদনের জন্য ১২০ দিন সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের বিবেচনা শেষ পর্যন্ত কেউ যদি বেনাগরিক বিবেচিত হয়ে যান, তখন তাঁর জন্য নির্ধারিত স্থান হবে ‘ডিটেনশন ক্যাম্প’। এগুলোর পরিবেশ কারাগারতুল্য। ১৯ লাখ মানুষের অর্ধেকও যদি শেষ বিচারে বিদেশি বেনাগরিক সাব্যস্ত হয়ে যান, তাহলে এত মানুষকে রাখার মতো ডিটেনশন ক্যাম্প আসাম কোথায় পাবে? বর্তমানে ছয়টি ডিটেনশন সেন্টারসহ আসামে ৩১টি কারাগার রয়েছে। এগুলোর ধারণক্ষমতা ৮ হাজার ৯৩৮ জন। এরই মধ্যে সেখানে ১০ হাজারের অধিক বন্দী অবস্থান করছে।আইনগতভাবে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে বিদেশি সাব্যস্ত ব্যক্তিদের জন্য ন্যায়বিচার পাওয়ার সর্বশেষ স্তর হলো ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। সেখানে একটা মামলা পেশ করতে কাগজপত্র তৈরির প্রক্রিয়ায় অন্তত দেড় দুইমাস সময় লাগবে। এই সময়টিতে ট্রাইব্যুনাল থেকে ঘোষিত প্রত্যেক বেনাগরিককে যদি ডিটেনশন সেন্টারে রাখতে হয়, তাহলে আসামকে আসন্ন দিনগুলোয় শত শত কারাগারতুল্য কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। ফলে আসামে এক সম্ভাব্য নজিরবিহীন অবস্থা অপেক্ষা করছে।

•পশ্চিমবঙ্গে মিশ্রপ্রতিক্রিয়া•

ভারতের আসাম রাজ্যে এনআরসি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিবিদেরা। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শনিবার এনআরসি প্রকাশের পর এক টুইটে বলেন, ‘রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে চেয়েছিল ওরা। এবার তাদের মুখোশ খুলে দিয়েছে এই এনআরসি বিপর্যয়। দেশের কাছে এবার জবাব দিতে হবে তাদের। দেশ ও সমাজের স্বার্থ পরিহার করে অসৎ উদ্দেশ্যে কাজ করলে এমনটাই ঘটে।’
কংগ্রেস নেতা ও সাংসদ অধীর চৌধুরী বলেছেন, ‘আমরা চাই কোনো ভারতীয় নাগরিক যেন এনআরসির কোপে বাদ না পড়েন। ওদের সরকার, ওরা যেখানে ইচ্ছে সেখানে এনআরসি চালু করতে পারে। ওরা সংসদেও এনআরসি চালু করতে পারে। আমার বাবাও বাংলাদেশে থাকতেন। সেই হিসাবে আমিও বহিরাগত।’ 
সিপিএম বলেছে, দেশে বিজেপি সরকারের লক্ষ্য বিভাজন ও মেরুকরণের রাজনীতি।
এনআরসিকে সমর্থন দিয়ে বিজেপির পশ্চিমবঙ্গের সভাপতি দিলীপ ঘোষ বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশি মুসলিম অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে ফেরত পাঠাবেন। আর নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করে হিন্দু অনুপ্রবেশকারীদের শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় দেবেন।
বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতা ও পশ্চিমবঙ্গের বিজেপির ভারপ্রাপ্ত পর্যবেক্ষক কৈলাশ বিজয়বর্গীয় বলেছেন, ‘শুধু আসাম নয়, পশ্চিমবঙ্গসহ সারা দেশেই চালু করা হবে এনআরসি। তবে এনআরসিতে যাঁদের নাম বাদ গিয়েছে অথচ তাঁরা ভারতীয়, তাঁদের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে।’

•ভারতজুড়ে হুক্কা হুয়া•

দিল্লির বিজেপি সভাপতি মনোজ তেওয়ারি বলেছেন, ‘দিল্লিতে এই নিয়ে পরিস্থিতি বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। তাই দিল্লিতেও এনআরসি চালু করা প্রয়োজন।’
তেলেঙ্গানার বিজেপির পরিষদীয় দলের নেতা রাজা সিং বলেছেন- ‘এবার তেলেঙ্গানাতেও এনআরসি হোক। আসাদউদ্দিন ওয়েসি(হায়দরাবাদের এমআইএম দলের নেতা ও স্থানীয় সাংসদ) ভোট ব্যাংক বাড়াতে এখন বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা মুসলিমদের আশ্রয় দিচ্ছেন।’
আসাউদ্দিন এর জবাবে বলেছেন, ‘অমিত শাহ ব্যাখ্যা দিক তিনি খসড়া তালিকায় কীভাবে ৪০ লাখ অনুপ্রবেশকারীর সন্ধান পেয়েছিলেন? এবার কেন কমে ১৯ লাখ হলো? বিজেপি যদি শুধু হিন্দুদের শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় দেয়, তা সমান অধিকারের বিরোধী হবে।’

সূত্র: প্রথম আলো, আনন্দবাজার, যুগশঙ্খ