২২, আগস্ট, ২০১৯, বৃহস্পতিবার | | ২০ জ্বিলহজ্জ ১৪৪০


‘আওয়ামী লীগে আওয়ামী লীগারদের বেইল নাই’ -প্রভাষ আমিন

রিপোর্টার নামঃ প্রতিদিনের কাগজ ডেস্ক | আপডেট: ২২ জুলাই ২০১৯, ০২:০১ এএম

‘আওয়ামী লীগে আওয়ামী লীগারদের বেইল নাই’ -প্রভাষ আমিন
‘আওয়ামী লীগে আওয়ামী লীগারদের বেইল নাই’ -প্রভাষ আমিন

আওয়ামী লীগ একটি ‘মাল্টিক্লাস’ দল। সবার জন্যই এই দলের দরজা খোলা। এমন একটি অলিখিত নীতি বোধহয় গ্রহণ করেছে দলটি। তৃণমূলে অনেক আগে থেকেই বিএনপি-জামায়াতের জন্য আওয়ামী লীগের দরজা খুলে দেওয়া হয়েছে। এখন বোধহয় কেন্দ্রীয়ভাবেও তাই করা হচ্ছে। ক’দিন আগে দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জানিয়ে দিয়েছিলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধীদের পরিবারের সদস্যদের আওয়ামী লীগে যোগ দিতে বাধা নেই। তিনি স্পষ্ট বলে দেন, ‘৪৭ বছর আগে ওই পরিবারের কেউ হয়তো সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে ছিল, জামায়াতে ইসলামী করেছে বা মানবতাবিরোধী অপরাধীদের সঙ্গে যোগসূত্র ছিল। ৪৭ বছর পর এ ধরনের বিষয় দেখার তো যৌক্তিকতা নেই। আমরা যাকে সদস্য করবো, মূলত তার ব্যাকগ্রাউন্ড দেখবো, সে আসলে কী।’ তার এই বক্তব্যে রীতিমতো তোলপাড় সৃষ্টি হয়। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বিভিন্ন সংগঠন ওবায়দুল কাদেরের পদত্যাগ দাবি করেন। অনেকে বলেন, ৪৭ বছর আগের বিষয় দেখার যদি যৌক্তিকতা না থাকে, তবে আর মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের কী দরকার? তবে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে ওবায়দুল কাদের নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। বলেছেন, মানবতাবিরোধী অপরাধীর পরিবারের সদস্যদের ব্যাপারে আওয়ামী লীগের অবস্থান খুব স্পষ্ট।

যত ব্যাখ্যাই দেন, ওবায়দুল কাদের কিন্তু মুখ ফসকে সত্যি কথাটা বলে ফেলেছেন। এর আগে, চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় জামায়াত নেতা মুমিনুল হক চৌধুরীর কন্যা রিজিয়া রেজা চৌধুরীকে মহিলা আওয়ামী লীগে অন্তর্ভুক্তির সময়ও ওবায়দুল কাদের একই ধরনের যুক্তি দিয়ে তার সাফাই গেয়েছিলেন। ১৯৫৫ সালে নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি ছেঁটে ফেলে আজকের অসাম্প্রদায়িক আওয়ামী লীগের নবযাত্রা শুরু হয়েছিল। কিন্তু সেই আওয়ামী লীগের এখন ক্ষমতার স্বার্থে সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে আপস করতেও আটকায় না। আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ঢাকা দখল করতে আসা হেফাজতে ইসলাম আনুষ্ঠানকিভাবে আওয়ামী লগে যোগ দেয়নি বটে, তবে তারা টিকে আছেন আওয়ামী লীগের পকেটেই।

এবারই যে প্রথম আওয়ামী লীগের দরজা খুলে দেওয়া হয়েছে, তা নয়। অনেকে আগে থেকেই দলটির দরজা সবার জন্য খোলা। বিএনপি তো বটেই, জামায়াতের লোকজনও দলে দলে নৌকায় উঠে যাচ্ছেন। না, হঠাৎ করে আওয়ামী লীগে কোনও বদল হয়নি, যে মুগ্ধ হয়ে তারা আসছে।

তারা আসছে আসলে প্রথমত মামলা থেকে বাঁচতে, মূলত ক্ষমতার কাছে থাকতে। এখন যেমন চারদিকে আওয়ামী লীগ ছাড়া কাউকেই দেখা যায় না। ৭৫’র পরে কিন্তু আওয়ামী লীগ নামে কাউকে খুঁজে পাওয়া কঠিন ছিল। এখন যে চারদিকে এত আওয়ামী লীগ, ক্ষমতায় না থাকলে এদের খুঁজে পাওয়া যাবে তো? আমার ধারণা যাবে না। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরাও নিশ্চয়ই জানেন। তাহলে তারা কেন, দলের দরজা সবার জন্য খুলে দিয়েছেন? কেন অন্তত একটা ফিল্টারের ব্যবস্থা করেননি। দলে দলে লোক এনে জনপ্রিয়তার যে বেলুন তৈরি করা হচ্ছে, তা চুপসে যেতে কিন্তু একটি আলপিনের ছোঁয়াই যথেষ্ট।

এই যে ৭৫’র পর আওয়ামী লীগ অফিসে বাতি জ্বালানোর মতো কেউ ছিল না। সেই সংগঠন আজ টানা তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায়–এর ম্যাজিকটা কী? শেখ হাসিনার ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্ব তো আছেই, আসল রহস্য দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা তৃণমূল নেতাকর্মীরা। তারাই বিপদে-আপদে, ঝড়-ঝঞ্ঝায় আগলে রেখেছে আওয়ামী লীগকে। এটা জানেন শেখ হাসিনাও। বিভিন্ন সময়ে তিনি তৃণমূলের প্রতি তার কৃতজ্ঞতার কথা জানিয়েছেনও। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই আনস্মার্ট তৃণমূল ক্ষমতার রাজনীতিতে অচল। এখন চকচকে ফ্যাশনেবল মুজিব কোট পরা স্মার্ট নেতারাই আওয়ামী লীগের চারপাশে। তাদের দাপটে এখন পুরনো আওয়ামী লীগাররা ব্যাকবেঞ্চার। তবে, ব্যাকবেঞ্চার হতেও তাদের আপত্তি নেই। কারণ দলের কাছে তাদের চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। তারা শুধু দলকে ভালোবাসেন। আর ‘হাইব্রিড’দের কর্মকাণ্ডে দলের ক্ষতি হলে আক্ষেপ করেন। ২০০৮ সালের পরে আওয়ামী লীগে আসা এই স্মার্ট প্রজন্মকে পুরনো আওয়ামী লীগাররা আদর করে ‘হাইব্রিড’ বলে ডাকেন। ওবায়দুল কাদের তাদের নাম দিয়েছেন ‘কাউয়া’। কিন্তু তাদের ঠেকানোর ব্যবস্থা নেননি।

বরং গত উপজেলা নির্বাচনে হাইব্রিডরাই মনোনয়ন পেয়েছেন বেশি, হেরেছেনও বেশি। অধিকাংশ এলাকায় হাইব্রিডদের বিরুদ্ধে নির্বাচন করেছেন তৃণমূলের কেউ। মনোনয়নে দল ভুল করলেও তৃণমূলের নেতা-কর্মী-সমর্থকরা ভুল করেননি। তারা ‘আনস্মার্ট’ তৃণমূলকেই জিতিয়েছেন। অন্তত ১৪০ উপজেলায় বিদ্রোহী প্রার্থীরাই জিতেছেন। এখন আওয়ামী লীগ পড়েছে বিপদে। বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলে অনেক হম্বিতম্বি করলেও সেটা নিতে পারছে না। ব্যবস্থা নিলে বা বহিষ্কার করলে বিপদের বন্ধু তৃণমূলকে বহিষ্কার করতে হবে। মনোনয়ন না দিয়ে একবার ভুল করেছে, এখন আবার বহিষ্কারের মতো নিষ্ঠুরতা করতে পারছে না আওয়ামী লীগ।

তবে, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত দলের কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকে বিদ্রোহী প্রার্থী এবং তাদের সমর্থক মন্ত্রী-এমপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রাথমিকভাবে তাদের কারণ দর্শাতে বলা হবে। পরে ব্যবস্থা। কিন্তু আমি নিশ্চিত জানি, কারও বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, অন্তত জিতে আসা কারও বিরুদ্ধে তো নয়ই।

আওয়ামী লীগের প্রয়াত সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘আওয়ামী লীগ একটি অনুভূতির নাম’। আসলেই তিনি আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মনের কথাটাই বলেছিলেন। আসলেই দলবদল করে সরকারি দল হওয়া যায়, আওয়ামী লীগার হওয়া যায় না। এই অনুভূতি আসলে ধারণ করতে হয়।

গত সপ্তাহে এক পুরোনো আওয়ামী লীগার আক্ষেপ করে বলছিলেন, ‘আওয়ামী লীগে এখন আর আওয়ামী লীগারদের বেইল নাই।’ ইনাম আহমেদ চৌধুরীর আওয়ামী লগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হওয়ার খবর শুনেই তার এই আক্ষেপ।

ইনাম আহমেদ চৌধুরী আমলা। চাকরি শেষ করে রাজনীতিতে যোগ দিয়েছেন। সর্বশেষ তিনি ছিলেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান। আশা ছিল, গত নির্বাচনে তিনি অতি গুরুত্বপূর্ণ সিলেট-১ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়ন পাবেন। মনোনয়নের জন্য শেষ পর্যন্ত চেষ্টাও করেছেন। মনোনয়ন পাচ্ছেন না, এটা নিশ্চিত হওয়ার পর নির্বাচনের মাত্র ১১ দিন আগে ১৯ ডিসেম্বর তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন। বুঝতে অসুবিধা হয় না, মনোনয়ন না পাওয়ার অভিমানেই তিনি বিএনপি ছেড়েছেন। কিন্তু এটা তিনি বলতে চান না। আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়ার পর তিনি বিবিসিকে বলেছিলেন, ‘আমার যে অভিজ্ঞতা ও পারদর্শিতা রয়েছে, তা আমি কাজে লাগাতে চাই। আমার যে আদর্শিক অবস্থান, সেটাও আমি প্রমাণ করতে চাই। তারই জন্যে আমি সিদ্ধান্তটা নিলাম বিএনপি ছেড়ে আওয়ামী লীগে যোগদানের।’ ৮২ বছর বয়সে কেউ আদর্শিক ভুল বুঝতে পারে, আদর্শিক অবস্থান প্রমাণ করতে কেউ বিপরীত মেরুর দলে যোগ দিতে পারে? এটা বললেই কি কেউ বিশ্বাস করবেন? আর ইনাম আহমেদ চৌধুরী আর দশ জন বিএনপি নেতার মতো হুজুগে নেতা নন। তিনি বুঝে-শুনেই বিএনপির জাতীয়তাবাদী চেতনার ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছিলেন। বিএনপির রাজনীতিটা তিনি শুধু নিজে বোঝেননি, সবাইকে বোঝাতেও চেয়েছেন। তাই তো তিনি লিখেছেন।

তার বইগুলো হলো: প্রেসিডেন্ট জিয়া, আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা, চিরঞ্জীব জিয়া এবং ছোটদের জিয়াউর রহমান ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদ।

আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়ার ৭ মাসের মাথায় তিনি দলের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হয়েছেন। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ইনাম আহমেদ চৌধুরীর লেখা এই বইগুলো কিন্তু এখনও বাজারে আছে, তিনি কোনও প্রত্যাহারের ঘোষণা দেননি। তার বই পড়ে নতুন প্রজন্ম জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বিএনপিতে যোগ দেবে, আর তিনি উপদেশ দেবেন আওয়ামী লীগকে!

রাজনীতিতে দলবদল নতুন কিছু নয়। কিন্তু এমন বৈপরীত্য সহজে দেখা যায় না। তোফায়েল আহমেদ, আমির হোসেন আমু, এইচটি ইমামরা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য। গত শুক্রবার (১৯ ‍জুলাই) অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে নিশ্চয়ই তাদের পাশেই বসেছিলেন সারাজীবন জাতীয়তাবাদী চেতনার ধারক এবং সেটা ছড়িয়ে দিতে নিজের মেধা কাজে লাগানো ইনাম আহমেদ চৌধুরী। আসলেই রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। বছরের পর বছর আওয়ামী লীগ করেও কত নেতা কোনও পদ-পদবি পাননি। আর ইনাম আহমেদ চৌধুরী মাত্র ৭ মাসেই পেয়ে গেছেন ইনাম। সব দেখেশুনে সেই তৃণমূল নেতার আক্ষেপটাই কানে বাজছে, ‘আওয়ামী লীগে এখন আর আওয়ামী লীগারদের বেইল নাই!’

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

‘আওয়ামী লীগে আওয়ামী লীগারদের বেইল নাই’ -প্রভাষ আমিন

প্রতিবেদক নাম: প্রতিদিনের কাগজ ডেস্ক ,

প্রকাশের সময়ঃ ২২ জুলাই ২০১৯, ০২:০১ এএম

আওয়ামী লীগ একটি ‘মাল্টিক্লাস’ দল। সবার জন্যই এই দলের দরজা খোলা। এমন একটি অলিখিত নীতি বোধহয় গ্রহণ করেছে দলটি। তৃণমূলে অনেক আগে থেকেই বিএনপি-জামায়াতের জন্য আওয়ামী লীগের দরজা খুলে দেওয়া হয়েছে। এখন বোধহয় কেন্দ্রীয়ভাবেও তাই করা হচ্ছে। ক’দিন আগে দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জানিয়ে দিয়েছিলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধীদের পরিবারের সদস্যদের আওয়ামী লীগে যোগ দিতে বাধা নেই। তিনি স্পষ্ট বলে দেন, ‘৪৭ বছর আগে ওই পরিবারের কেউ হয়তো সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে ছিল, জামায়াতে ইসলামী করেছে বা মানবতাবিরোধী অপরাধীদের সঙ্গে যোগসূত্র ছিল। ৪৭ বছর পর এ ধরনের বিষয় দেখার তো যৌক্তিকতা নেই। আমরা যাকে সদস্য করবো, মূলত তার ব্যাকগ্রাউন্ড দেখবো, সে আসলে কী।’ তার এই বক্তব্যে রীতিমতো তোলপাড় সৃষ্টি হয়। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বিভিন্ন সংগঠন ওবায়দুল কাদেরের পদত্যাগ দাবি করেন। অনেকে বলেন, ৪৭ বছর আগের বিষয় দেখার যদি যৌক্তিকতা না থাকে, তবে আর মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের কী দরকার? তবে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে ওবায়দুল কাদের নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। বলেছেন, মানবতাবিরোধী অপরাধীর পরিবারের সদস্যদের ব্যাপারে আওয়ামী লীগের অবস্থান খুব স্পষ্ট।

যত ব্যাখ্যাই দেন, ওবায়দুল কাদের কিন্তু মুখ ফসকে সত্যি কথাটা বলে ফেলেছেন। এর আগে, চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় জামায়াত নেতা মুমিনুল হক চৌধুরীর কন্যা রিজিয়া রেজা চৌধুরীকে মহিলা আওয়ামী লীগে অন্তর্ভুক্তির সময়ও ওবায়দুল কাদের একই ধরনের যুক্তি দিয়ে তার সাফাই গেয়েছিলেন। ১৯৫৫ সালে নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি ছেঁটে ফেলে আজকের অসাম্প্রদায়িক আওয়ামী লীগের নবযাত্রা শুরু হয়েছিল। কিন্তু সেই আওয়ামী লীগের এখন ক্ষমতার স্বার্থে সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে আপস করতেও আটকায় না। আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ঢাকা দখল করতে আসা হেফাজতে ইসলাম আনুষ্ঠানকিভাবে আওয়ামী লগে যোগ দেয়নি বটে, তবে তারা টিকে আছেন আওয়ামী লীগের পকেটেই।

এবারই যে প্রথম আওয়ামী লীগের দরজা খুলে দেওয়া হয়েছে, তা নয়। অনেকে আগে থেকেই দলটির দরজা সবার জন্য খোলা। বিএনপি তো বটেই, জামায়াতের লোকজনও দলে দলে নৌকায় উঠে যাচ্ছেন। না, হঠাৎ করে আওয়ামী লীগে কোনও বদল হয়নি, যে মুগ্ধ হয়ে তারা আসছে।

তারা আসছে আসলে প্রথমত মামলা থেকে বাঁচতে, মূলত ক্ষমতার কাছে থাকতে। এখন যেমন চারদিকে আওয়ামী লীগ ছাড়া কাউকেই দেখা যায় না। ৭৫’র পরে কিন্তু আওয়ামী লীগ নামে কাউকে খুঁজে পাওয়া কঠিন ছিল। এখন যে চারদিকে এত আওয়ামী লীগ, ক্ষমতায় না থাকলে এদের খুঁজে পাওয়া যাবে তো? আমার ধারণা যাবে না। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরাও নিশ্চয়ই জানেন। তাহলে তারা কেন, দলের দরজা সবার জন্য খুলে দিয়েছেন? কেন অন্তত একটা ফিল্টারের ব্যবস্থা করেননি। দলে দলে লোক এনে জনপ্রিয়তার যে বেলুন তৈরি করা হচ্ছে, তা চুপসে যেতে কিন্তু একটি আলপিনের ছোঁয়াই যথেষ্ট।

এই যে ৭৫’র পর আওয়ামী লীগ অফিসে বাতি জ্বালানোর মতো কেউ ছিল না। সেই সংগঠন আজ টানা তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায়–এর ম্যাজিকটা কী? শেখ হাসিনার ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্ব তো আছেই, আসল রহস্য দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা তৃণমূল নেতাকর্মীরা। তারাই বিপদে-আপদে, ঝড়-ঝঞ্ঝায় আগলে রেখেছে আওয়ামী লীগকে। এটা জানেন শেখ হাসিনাও। বিভিন্ন সময়ে তিনি তৃণমূলের প্রতি তার কৃতজ্ঞতার কথা জানিয়েছেনও। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই আনস্মার্ট তৃণমূল ক্ষমতার রাজনীতিতে অচল। এখন চকচকে ফ্যাশনেবল মুজিব কোট পরা স্মার্ট নেতারাই আওয়ামী লীগের চারপাশে। তাদের দাপটে এখন পুরনো আওয়ামী লীগাররা ব্যাকবেঞ্চার। তবে, ব্যাকবেঞ্চার হতেও তাদের আপত্তি নেই। কারণ দলের কাছে তাদের চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। তারা শুধু দলকে ভালোবাসেন। আর ‘হাইব্রিড’দের কর্মকাণ্ডে দলের ক্ষতি হলে আক্ষেপ করেন। ২০০৮ সালের পরে আওয়ামী লীগে আসা এই স্মার্ট প্রজন্মকে পুরনো আওয়ামী লীগাররা আদর করে ‘হাইব্রিড’ বলে ডাকেন। ওবায়দুল কাদের তাদের নাম দিয়েছেন ‘কাউয়া’। কিন্তু তাদের ঠেকানোর ব্যবস্থা নেননি।

বরং গত উপজেলা নির্বাচনে হাইব্রিডরাই মনোনয়ন পেয়েছেন বেশি, হেরেছেনও বেশি। অধিকাংশ এলাকায় হাইব্রিডদের বিরুদ্ধে নির্বাচন করেছেন তৃণমূলের কেউ। মনোনয়নে দল ভুল করলেও তৃণমূলের নেতা-কর্মী-সমর্থকরা ভুল করেননি। তারা ‘আনস্মার্ট’ তৃণমূলকেই জিতিয়েছেন। অন্তত ১৪০ উপজেলায় বিদ্রোহী প্রার্থীরাই জিতেছেন। এখন আওয়ামী লীগ পড়েছে বিপদে। বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলে অনেক হম্বিতম্বি করলেও সেটা নিতে পারছে না। ব্যবস্থা নিলে বা বহিষ্কার করলে বিপদের বন্ধু তৃণমূলকে বহিষ্কার করতে হবে। মনোনয়ন না দিয়ে একবার ভুল করেছে, এখন আবার বহিষ্কারের মতো নিষ্ঠুরতা করতে পারছে না আওয়ামী লীগ।

তবে, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত দলের কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকে বিদ্রোহী প্রার্থী এবং তাদের সমর্থক মন্ত্রী-এমপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রাথমিকভাবে তাদের কারণ দর্শাতে বলা হবে। পরে ব্যবস্থা। কিন্তু আমি নিশ্চিত জানি, কারও বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, অন্তত জিতে আসা কারও বিরুদ্ধে তো নয়ই।

আওয়ামী লীগের প্রয়াত সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘আওয়ামী লীগ একটি অনুভূতির নাম’। আসলেই তিনি আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মনের কথাটাই বলেছিলেন। আসলেই দলবদল করে সরকারি দল হওয়া যায়, আওয়ামী লীগার হওয়া যায় না। এই অনুভূতি আসলে ধারণ করতে হয়।

গত সপ্তাহে এক পুরোনো আওয়ামী লীগার আক্ষেপ করে বলছিলেন, ‘আওয়ামী লীগে এখন আর আওয়ামী লীগারদের বেইল নাই।’ ইনাম আহমেদ চৌধুরীর আওয়ামী লগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হওয়ার খবর শুনেই তার এই আক্ষেপ।

ইনাম আহমেদ চৌধুরী আমলা। চাকরি শেষ করে রাজনীতিতে যোগ দিয়েছেন। সর্বশেষ তিনি ছিলেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান। আশা ছিল, গত নির্বাচনে তিনি অতি গুরুত্বপূর্ণ সিলেট-১ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়ন পাবেন। মনোনয়নের জন্য শেষ পর্যন্ত চেষ্টাও করেছেন। মনোনয়ন পাচ্ছেন না, এটা নিশ্চিত হওয়ার পর নির্বাচনের মাত্র ১১ দিন আগে ১৯ ডিসেম্বর তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন। বুঝতে অসুবিধা হয় না, মনোনয়ন না পাওয়ার অভিমানেই তিনি বিএনপি ছেড়েছেন। কিন্তু এটা তিনি বলতে চান না। আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়ার পর তিনি বিবিসিকে বলেছিলেন, ‘আমার যে অভিজ্ঞতা ও পারদর্শিতা রয়েছে, তা আমি কাজে লাগাতে চাই। আমার যে আদর্শিক অবস্থান, সেটাও আমি প্রমাণ করতে চাই। তারই জন্যে আমি সিদ্ধান্তটা নিলাম বিএনপি ছেড়ে আওয়ামী লীগে যোগদানের।’ ৮২ বছর বয়সে কেউ আদর্শিক ভুল বুঝতে পারে, আদর্শিক অবস্থান প্রমাণ করতে কেউ বিপরীত মেরুর দলে যোগ দিতে পারে? এটা বললেই কি কেউ বিশ্বাস করবেন? আর ইনাম আহমেদ চৌধুরী আর দশ জন বিএনপি নেতার মতো হুজুগে নেতা নন। তিনি বুঝে-শুনেই বিএনপির জাতীয়তাবাদী চেতনার ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছিলেন। বিএনপির রাজনীতিটা তিনি শুধু নিজে বোঝেননি, সবাইকে বোঝাতেও চেয়েছেন। তাই তো তিনি লিখেছেন।

তার বইগুলো হলো: প্রেসিডেন্ট জিয়া, আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা, চিরঞ্জীব জিয়া এবং ছোটদের জিয়াউর রহমান ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদ।

আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়ার ৭ মাসের মাথায় তিনি দলের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হয়েছেন। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ইনাম আহমেদ চৌধুরীর লেখা এই বইগুলো কিন্তু এখনও বাজারে আছে, তিনি কোনও প্রত্যাহারের ঘোষণা দেননি। তার বই পড়ে নতুন প্রজন্ম জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বিএনপিতে যোগ দেবে, আর তিনি উপদেশ দেবেন আওয়ামী লীগকে!

রাজনীতিতে দলবদল নতুন কিছু নয়। কিন্তু এমন বৈপরীত্য সহজে দেখা যায় না। তোফায়েল আহমেদ, আমির হোসেন আমু, এইচটি ইমামরা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য। গত শুক্রবার (১৯ ‍জুলাই) অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে নিশ্চয়ই তাদের পাশেই বসেছিলেন সারাজীবন জাতীয়তাবাদী চেতনার ধারক এবং সেটা ছড়িয়ে দিতে নিজের মেধা কাজে লাগানো ইনাম আহমেদ চৌধুরী। আসলেই রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। বছরের পর বছর আওয়ামী লীগ করেও কত নেতা কোনও পদ-পদবি পাননি। আর ইনাম আহমেদ চৌধুরী মাত্র ৭ মাসেই পেয়ে গেছেন ইনাম। সব দেখেশুনে সেই তৃণমূল নেতার আক্ষেপটাই কানে বাজছে, ‘আওয়ামী লীগে এখন আর আওয়ামী লীগারদের বেইল নাই!’

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ