২২, আগস্ট, ২০১৯, বৃহস্পতিবার | | ২০ জ্বিলহজ্জ ১৪৪০


উদ্বৃত্ত চাল ব্যবস্থাপনা কৃষকবান্ধব করতে হবে

রিপোর্টার নামঃ ড. মইনুল ইসলাম | আপডেট: ২২ জুন ২০১৯, ০১:২০ এএম

উদ্বৃত্ত চাল ব্যবস্থাপনা কৃষকবান্ধব করতে হবে
উদ্বৃত্ত চাল ব্যবস্থাপনা কৃষকবান্ধব করতে হবে

এবারের বোরো ধানের বাম্পার ফলন বাংলাদেশের কৃষকদের পাশাপাশি সরকারকেও নতুন ধরনের বিপদে ফেলেছে। বাম্পার ফলন হলে বাংলাদেশের মাঝারি, ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা প্রতিবারই ধানের দামে কমবেশি ধসের শিকার হন। এবার এ সমস্যা অনেক বেশি গুরুতর আকার ধারণ করেছে ধান-চালের বাজারে চালকল মালিক ও মজুদদারদের সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে ধানের দামকে ৫০০ টাকারও নিচে নামিয়ে আনার প্রয়াসে সফল (!) হওয়ার কারণে। উল্লিখিত এ সিন্ডিকেট চাতাল মালিক, ব্যাপারী ও ফড়িয়াদের মাধ্যমে সস্তায় ধান কিনে নেয়। পরবর্তীতে যখন সরকার বাফার স্টকের জন্য চাল কিনে, তখন অনেক বেশি দামে চাল বিক্রি করে তারা বিপুল মুনাফা তুলে নিতে সমর্থ হয়। সরকারের খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ব্যাপক দুর্নীতি এ ব্যবস্থাটাকে কায়েমি স্বার্থে পরিণত করেছে অনেকদিন ধরে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বহু বছর ধরে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনার ব্যবস্থা চালু থাকলেও এ দেশের সরকারগুলো সে পদ্ধতি সম্পর্কে খবরাখবর না নিয়ে নিজেদের দুর্নীতি চালিয়ে যাওয়ার স্বার্থে একটা অভিযোগই বারবার করে যাচ্ছে, সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনলে ধান ভেজা থাকে বিধায় ওই ধান গোডাউনে তাড়াতাড়ি পচে যায়। এ সমস্যার সমাধান পশ্চিমবঙ্গ ও কেরালা কীভাবে করেছে, তা সরেজমিন দেখে এসে খাদ্যমন্ত্রী কি ধান সংগ্রহ ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে পারেন না? আসল কথা হলো, বাংলাদেশের খাদ্যশস্য সংগ্রহ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে খাদ্য ঘাটতির দেশ হিসেবে বিদেশ থেকে প্রাপ্ত খাদ্য সাহায্য ব্যবস্থাপনাকে সামনে রেখে। ধান-চাল উদ্বৃত্ত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের বর্তমান উত্তরণে উদ্বৃত্ত খাদ্যশস্যের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি আমাদের খাদ্য মন্ত্রণালয় ও খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তারা এখনো রপ্ত করতে পারেননি! এখন থেকে আগামী বেশ কয়েক বছর যেহেতু অসময়ে অতিবৃষ্টি বা বন্যা না হলে দেশে ধান উদ্বৃত্ত হবে, তাই উদ্বৃত্ত ধান সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে কিনে এর ন্যায্যমূল্য যাতে মাঠ পর্যায়ের কৃষকদের দেয়া যায়, তার ভালো ব্যবস্থা আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে গড়ে তুলতেই হবে।

টেলিভিশন সংবাদে দেখলাম, মাননীয় কৃষিমন্ত্রী বাংলাদেশ থেকে ১০-১৫ লাখ টন চাল রফতানি করার ব্যাপারে সরকার চিন্তাভাবনা করছে বলে জানালেন। খবরটায় খুশি হওয়ার কথা হলেও একটা অজানা শঙ্কায় মনটা ভরে উঠেছে। খুশি এজন্য, আমাদের দেশের কৃষকরা খাদ্যশস্য উৎপাদনে চলমান বিপ্লবের মাধ্যমে এমন একটা অবস্থায় আমাদের নিয়ে এসেছেন যে এখন আমরা উদ্বৃত্ত চাল রফতানির সক্ষমতা অর্জন করেছি। স্বাধীনতার ঊষালগ্নে এ দেশটা ‘একটা তলাবিহীন ভিক্ষার ঝুলি’ হতে যাচ্ছে বলে মার্কিন নীতিপ্রণেতা ও মার্কিন সংবাদপত্রগুলো ব্যাপক আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল। তাদের ওই আশঙ্কা অযৌক্তিক ছিল বলা যাবে না। ওই সময়ে সাড়ে সাত কোটি জনগণের জন্য যে দেড় কোটি টন চাল প্রয়োজন হতো, তার মধ্যে আমরা উৎপাদন করতে পারতাম মাত্র ১ কোটি ১০ লাখ টন। বাকি ৪০ লাখ টন খাদ্যশস্য জোগাড় করার জন্য আমাদের বিশ্বের অন্যান্য দেশ ও আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলোর কাছে ভিক্ষার হাত পাততে হতো। কারণ ওই ঘাটতি পূরণের জন্য খাদ্যশস্য আমদানির সামর্থ্য আমাদের ছিল না, বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার ছিল বড়ই অকিঞ্চিত্কর। সেখান থেকে গত ৪৮ বছরে দেশের জনসংখ্যা বেড়ে প্রায় ১৭ কোটিতে পৌঁছে গেছে, চাষযোগ্য জমির পরিমাণও কমে গেছে প্রায় ১৫ শতাংশ। কিন্তু শস্য উৎপাদনের জমি বারবার ব্যবহার করে, সেচযোগ্য জমির পরিমাণ বাড়িয়ে, উচ্চফলনশীল প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসারের মাধ্যমে একরপ্রতি জমির উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে এবং কৃষকদের কাছে সার-সেচের পানি-কীটনাশক-বালাইনাশক সহজলভ্য করে একটা কৃষি বিপ্লব সফল করতে সমর্থ হওয়ায় ২০১১ সাল থেকে বাংলাদেশ খাদ্যশস্য উৎপাদনে শুধু স্বয়ম্ভরতা অর্জন নয়, এখন খাদ্যশস্যে উদ্বৃত্ত দেশে পরিণত হয়েছে (অবশ্য ২০১৭ সালের আগাম বন্যায় বোরো ধান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ওই বছর আবার খাদ্য ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছিল)। ২০১৮ সালে দেশে ৩ কোটি ৬২ লাখ টন ধান, ৩০ লাখ টন ভুট্টা, ১৫ লাখ টন গমসহ ৪ কোটি ১৩ লাখ টন খাদ্যশস্য উৎপাদন হয়েছে বলে মাননীয় কৃষিমন্ত্রী আমাদের জানিয়েছেন। ২০১৯ সালে ধান উৎপাদন প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ টনে পৌঁছাবে বলে প্রাক্কলন করা হচ্ছে। এর সঙ্গে আরো ১ কোটি ৫ লাখ টন আলু উৎপাদন করে আলুতেও প্রায় ৩০ লাখ টন উদ্বৃত্ত সৃষ্টি করেছেন আমাদের কৃষকরা। অতএব, উদ্বৃত্ত চাল ও আলু রফতানির আবশ্যকতা সৃষ্টি হয়েছে কৃষকদের ফসলের ন্যায্য মূল্য পেতে সহায়তা করার তাগিদে। বিশেষত ঘূর্ণিঝড় ফণীর তাণ্ডব থেকে আল্লাহর রহমতে বাংলাদেশ অনেকখানি রেহাই পাওয়ায় মাঠে থাকা বোরো ফসলের উৎপাদন তেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। তাই এবারের বাম্পার বোরো ধান উৎপাদন মাঠ পর্যায়ের কৃষকদের ধানের ভালো দাম পেতে বাধা সৃষ্টি করেছে। কিন্তু বাম্পার ফসলের বোরো ধান যেহেতু মোটা চাল উৎপাদন বাড়িয়েছে, তাই এ চাল আন্তর্জাতিক বাজারে ভালো বাজার পাবে না। উপরন্তু, ধান যেহেতু এখন আর তেমন বেশি কৃষকের ঘরে নেই, তাই রফতানির সুফল কৃষক পাবেন না; চালকল মালিকরা রফতানির মুনাফা কুক্ষিগত করবেন। অতএব, সারা দেশ থেকে দ্রুত তথ্য সংগ্রহ করে নিশ্চিত হয়ে রফতানির পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান নিতে হবে সরকারকে। সেজন্যই নীতিপ্রণেতাদের বিবেচনার জন্য কয়েকটি বিষয় তুলে ধরছি আজকের কলামে।

দেশের চালের বাজারে বড় বড় বেশ কয়েকটি অটোমেটিক রাইস মিলের মালিকদের একটা সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করে ফেলেছে বলে ওয়াকিবহাল মহলের ধারণা। গত বছর তারা যোগসাজশকারী অলিগোপলি সৃষ্টি করে চালের বাজারদামকে কয়েক মাস ধরে কৃত্রিমভাবে বেশ খানিকটা বাড়াতে সমর্থ হয়েছিলেন। ওই সময় চালের কোনো উৎপাদন ঘাটতি না থাকা সত্ত্বেও ২০১৭ সালের তুলনায় ২০১৮ সালে চাল আমদানি অনেক কম হওয়ায় মুনাফাবাজির উদ্দেশ্যে বাজারে তাদের এক ধরনের কার্টেল পাওয়ার খাটাতে সমর্থ হয়েছিলেন তারা। এ মালিকদের নেতৃস্থানীয় কয়েকজন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় ওই পর্যায়ে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির পেছনে রাজনৈতিক ষড়ষন্ত্রের অপপ্রয়াসও থাকতে পারে বলে ওয়াকিবহাল মহলে এবং মিডিয়ায় আলোচনার সূত্রপাত হয়েছিল। বড় চালকল মালিকদের ওই সিন্ডিকেট কিন্তু এখনো বহাল তবিয়তে রয়ে গেছে। এর সঙ্গে দেশের চালের বাজারের বড় বড় মোকামের বৃহৎ আড়তদারদের যোগসূত্রকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে। মুনাফাবাজির সুযোগ সৃষ্টি হলে সংঘবদ্ধ মজুদদারির মাধ্যমে পাইকারি ও খুচরা চালের বাজারে আগুন লাগাতে এরা মোটেই দেরি করবেন না। সামনে যেহেতু বর্ষাকাল আসছে, তাই আষাঢ় ও শ্রাবণ মাসের অতিবৃষ্টির সময় বন্যার আশঙ্কা দেখা দিলেই উল্লিখিত সিন্ডিকেট ও মজুদদারদের গোপন সমঝোতায় চালের বাজারকে অস্থিতিশীল করার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়ে যেতে পারে। ১০-১৫ লাখ টন চাল দেশের চালের বাজারের একটি উল্লেখযোগ্য শতাংশ হওয়ায় কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের হাতে এই পরিমাণ জোগানের ঘাটতি বড়সড় অস্ত্র তুলে দেবে কিনা, ভেবে দেখা প্রয়োজন। ১০-১৫ লাখ টন চাল রফতানি করে বাংলাদেশ খুব বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করবে না কিন্তু কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতে পারলে অভ্যন্তরীণ চালের বাজারে বর্ষাকালে আগুন লেগে গেলে অন্যান্য পণ্যের দামেও ওই আগুন ছড়াতে দেরি হবে না। এটা অবশ্যই ঠিক যে চাল রফতানির বিষয়টির একটা রাজনৈতিক তাত্পর্য রয়েছে। চাল রফতানিকারক দেশের তালিকায় নাম উঠলে ‘তলাবিহীন ভিক্ষার ঝুলি’ ইমেজ কাটানোর আরো একটি ডাইমেনশন সৃষ্টি হবে, সন্দেহ নেই। কিন্তু এখন আওয়ামী লীগের সামনে তেমন কোনো নির্বাচন বা অন্য ধরনের রাজনৈতিক তাগিদ নেই চাল রফতানির রাজনৈতিক ফায়দা তোলার। অতএব, সিদ্ধান্তটি নিতে হবে মাঠ পর্যায়ের কৃষকদের ন্যায্যমূল্য পাওয়াকে অগ্রাধিকার দিয়ে। রফতানি না করেও সরকার যদি ন্যায্যমূল্যে বাজার থেকে বেশকিছু পরিমাণ বোরো ধান সংগ্রহ করে বাফার স্টক জোরদার করার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে ওই ধানের চাল শহরের গার্মেন্ট শ্রমিক ও গ্রামের প্রান্তিক অবস্থানের হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে ভর্তুকি দামে বিক্রয় করে সরকার রাজনৈতিকভাবে বেশি লাভবান হবে। এ বিকল্প ব্যবস্থার সুফল হলো, বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির কোনো সুযোগ পাবে না কোনো সিন্ডিকেট বা মজুদদারগোষ্ঠী।

আমার এ প্রস্তাবটির আসলে একটি সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য রয়েছে। ভারতের কেরালা, তামিলনাড়ু, পশ্চিমবঙ্গসহ অনেক রাজ্যে সফলভাবে খাদ্যশস্য রেশনিং ব্যবস্থা চালু রয়েছে। বাংলাদেশে মুক্ত বাজার অর্থনীতির ডামাডোলে শরিক হয়ে বিশ শতকের আশি ও নব্বইয়ের দশকে আমরা রেশনিং ব্যবস্থাকে প্রায় গুটিয়ে ফেলেছি। এর পরিবর্তে ভিজিডি ও ভিজিএফের মতো যে কয়েকটি সেফটি নেট কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, সেগুলোর প্রকৃত ফায়দাভোগী ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান-মেম্বার থেকে শুরু করে রাজনৈতিক নেতাকর্মী এবং পাইপলাইনের আমলা কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। রেশন ব্যবস্থাও চরম দুর্নীতিগ্রস্ত ছিল। তবু বলব, সমাজের বিত্তহীন ও দারিদ্র্যপীড়িত জনগোষ্ঠীর খাদ্যনিরাপত্তার জন্য বাজার ব্যবস্থার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীলতা বিপদ ডেকে আনতে পারে। বাজার ব্যবস্থার পাশাপাশি শহর ও গ্রামের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে ভর্তুকি দামে খাদ্যশস্য পৌঁছানোর একটা ‘কার্যকর সিস্টেম’ সরকারের রুটিন দায়িত্বের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা এখনো অগ্রাধিকারের দাবি রাখে। মুক্ত বাজার অর্থনীতির অহিফেনের মৌতাতে  মশগুল হয়ে প্রয়াত অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান ২০০১-০৬ মেয়াদে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় যেভাবে দেশের খাদ্য মজুদকে বিপজ্জনক পর্যায়ে নামিয়ে ফেলেছিলেন, সেটা আরেকটু হলে বাংলাদেশকে ২০০৭ সালে আবার দুর্ভিক্ষাবস্থার সম্মুখীন করে ফেলেছিল, তা যেন আমরা বিস্মৃত না হই! ২০০৬-০৮ সালে সরকারের খাদ্যশস্যের বাফার স্টকের মারাত্মক ক্ষীণকায় অবস্থা ২০০৭ সালের শেষ দিকে চালের বাজারে যে কৃত্রিম সংকট এবং বিপজ্জনক ‘প্যানিক বায়িং’ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল, এর পুনরাবৃত্তি যেন আর না হয়। ওই সময় সামরিক বাহিনীর সমর্থনপুষ্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতাসীন থাকায় মজুদদাররা কিছুটা ভয়ে ছিল, তাই পরিস্থিতি কোনোমতে সামাল দেয়া গেছে। ভবিষ্যতে এ রকম অজুহাত পেলে সরকার ও জনগণকে বিপদে ফেলবে মজুদদাররা। আমরা ১৯৭৪ সালের কথা যেন বিস্মৃত না হই। চালের দাম আড়াই টাকা কেজি থেকে এক লাফে দুই মাসের মধ্যে ১০ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছিলেন এ দেশের মজুদদাররা। নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের পেছনে চালের এই অতিদ্রুত আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতিকেই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর খাদ্যের ওপর ক্রয়ক্ষমতা হারানোর মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। তিনি দেখিয়েছেন, ১৯৭৩ সালের তুলনায় ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে ধান উৎপাদন প্রকৃতপক্ষে বেড়ে গিয়েছিল। তাই উৎপাদন ঘাটতির জন্য দুর্ভিক্ষ হয়েছিল, সেটা পুরোপুরি ঠিক নয়। বর্ষাকালে এখনো এ দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশ মৌসুমি বেকারত্বের শিকার হয়, কথাটি যেন আমরা ভুলে না যাই। আমি রফতানির বিপক্ষে বলছি অতীতের এই দুঃখজনক কাহিনীগুলো স্মরণ করে। রফতানির ভালো বিকল্প হবে একটি দরিদ্রবান্ধব রেশনিং ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রাম ও শহরের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সারা বছরের খাদ্যশস্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

 

লেখক: একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

উদ্বৃত্ত চাল ব্যবস্থাপনা কৃষকবান্ধব করতে হবে

প্রতিবেদক নাম: ড. মইনুল ইসলাম ,

প্রকাশের সময়ঃ ২২ জুন ২০১৯, ০১:২০ এএম

এবারের বোরো ধানের বাম্পার ফলন বাংলাদেশের কৃষকদের পাশাপাশি সরকারকেও নতুন ধরনের বিপদে ফেলেছে। বাম্পার ফলন হলে বাংলাদেশের মাঝারি, ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা প্রতিবারই ধানের দামে কমবেশি ধসের শিকার হন। এবার এ সমস্যা অনেক বেশি গুরুতর আকার ধারণ করেছে ধান-চালের বাজারে চালকল মালিক ও মজুদদারদের সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে ধানের দামকে ৫০০ টাকারও নিচে নামিয়ে আনার প্রয়াসে সফল (!) হওয়ার কারণে। উল্লিখিত এ সিন্ডিকেট চাতাল মালিক, ব্যাপারী ও ফড়িয়াদের মাধ্যমে সস্তায় ধান কিনে নেয়। পরবর্তীতে যখন সরকার বাফার স্টকের জন্য চাল কিনে, তখন অনেক বেশি দামে চাল বিক্রি করে তারা বিপুল মুনাফা তুলে নিতে সমর্থ হয়। সরকারের খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ব্যাপক দুর্নীতি এ ব্যবস্থাটাকে কায়েমি স্বার্থে পরিণত করেছে অনেকদিন ধরে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বহু বছর ধরে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনার ব্যবস্থা চালু থাকলেও এ দেশের সরকারগুলো সে পদ্ধতি সম্পর্কে খবরাখবর না নিয়ে নিজেদের দুর্নীতি চালিয়ে যাওয়ার স্বার্থে একটা অভিযোগই বারবার করে যাচ্ছে, সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনলে ধান ভেজা থাকে বিধায় ওই ধান গোডাউনে তাড়াতাড়ি পচে যায়। এ সমস্যার সমাধান পশ্চিমবঙ্গ ও কেরালা কীভাবে করেছে, তা সরেজমিন দেখে এসে খাদ্যমন্ত্রী কি ধান সংগ্রহ ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে পারেন না? আসল কথা হলো, বাংলাদেশের খাদ্যশস্য সংগ্রহ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে খাদ্য ঘাটতির দেশ হিসেবে বিদেশ থেকে প্রাপ্ত খাদ্য সাহায্য ব্যবস্থাপনাকে সামনে রেখে। ধান-চাল উদ্বৃত্ত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের বর্তমান উত্তরণে উদ্বৃত্ত খাদ্যশস্যের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি আমাদের খাদ্য মন্ত্রণালয় ও খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তারা এখনো রপ্ত করতে পারেননি! এখন থেকে আগামী বেশ কয়েক বছর যেহেতু অসময়ে অতিবৃষ্টি বা বন্যা না হলে দেশে ধান উদ্বৃত্ত হবে, তাই উদ্বৃত্ত ধান সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে কিনে এর ন্যায্যমূল্য যাতে মাঠ পর্যায়ের কৃষকদের দেয়া যায়, তার ভালো ব্যবস্থা আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে গড়ে তুলতেই হবে।

টেলিভিশন সংবাদে দেখলাম, মাননীয় কৃষিমন্ত্রী বাংলাদেশ থেকে ১০-১৫ লাখ টন চাল রফতানি করার ব্যাপারে সরকার চিন্তাভাবনা করছে বলে জানালেন। খবরটায় খুশি হওয়ার কথা হলেও একটা অজানা শঙ্কায় মনটা ভরে উঠেছে। খুশি এজন্য, আমাদের দেশের কৃষকরা খাদ্যশস্য উৎপাদনে চলমান বিপ্লবের মাধ্যমে এমন একটা অবস্থায় আমাদের নিয়ে এসেছেন যে এখন আমরা উদ্বৃত্ত চাল রফতানির সক্ষমতা অর্জন করেছি। স্বাধীনতার ঊষালগ্নে এ দেশটা ‘একটা তলাবিহীন ভিক্ষার ঝুলি’ হতে যাচ্ছে বলে মার্কিন নীতিপ্রণেতা ও মার্কিন সংবাদপত্রগুলো ব্যাপক আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল। তাদের ওই আশঙ্কা অযৌক্তিক ছিল বলা যাবে না। ওই সময়ে সাড়ে সাত কোটি জনগণের জন্য যে দেড় কোটি টন চাল প্রয়োজন হতো, তার মধ্যে আমরা উৎপাদন করতে পারতাম মাত্র ১ কোটি ১০ লাখ টন। বাকি ৪০ লাখ টন খাদ্যশস্য জোগাড় করার জন্য আমাদের বিশ্বের অন্যান্য দেশ ও আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলোর কাছে ভিক্ষার হাত পাততে হতো। কারণ ওই ঘাটতি পূরণের জন্য খাদ্যশস্য আমদানির সামর্থ্য আমাদের ছিল না, বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার ছিল বড়ই অকিঞ্চিত্কর। সেখান থেকে গত ৪৮ বছরে দেশের জনসংখ্যা বেড়ে প্রায় ১৭ কোটিতে পৌঁছে গেছে, চাষযোগ্য জমির পরিমাণও কমে গেছে প্রায় ১৫ শতাংশ। কিন্তু শস্য উৎপাদনের জমি বারবার ব্যবহার করে, সেচযোগ্য জমির পরিমাণ বাড়িয়ে, উচ্চফলনশীল প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসারের মাধ্যমে একরপ্রতি জমির উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে এবং কৃষকদের কাছে সার-সেচের পানি-কীটনাশক-বালাইনাশক সহজলভ্য করে একটা কৃষি বিপ্লব সফল করতে সমর্থ হওয়ায় ২০১১ সাল থেকে বাংলাদেশ খাদ্যশস্য উৎপাদনে শুধু স্বয়ম্ভরতা অর্জন নয়, এখন খাদ্যশস্যে উদ্বৃত্ত দেশে পরিণত হয়েছে (অবশ্য ২০১৭ সালের আগাম বন্যায় বোরো ধান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ওই বছর আবার খাদ্য ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছিল)। ২০১৮ সালে দেশে ৩ কোটি ৬২ লাখ টন ধান, ৩০ লাখ টন ভুট্টা, ১৫ লাখ টন গমসহ ৪ কোটি ১৩ লাখ টন খাদ্যশস্য উৎপাদন হয়েছে বলে মাননীয় কৃষিমন্ত্রী আমাদের জানিয়েছেন। ২০১৯ সালে ধান উৎপাদন প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ টনে পৌঁছাবে বলে প্রাক্কলন করা হচ্ছে। এর সঙ্গে আরো ১ কোটি ৫ লাখ টন আলু উৎপাদন করে আলুতেও প্রায় ৩০ লাখ টন উদ্বৃত্ত সৃষ্টি করেছেন আমাদের কৃষকরা। অতএব, উদ্বৃত্ত চাল ও আলু রফতানির আবশ্যকতা সৃষ্টি হয়েছে কৃষকদের ফসলের ন্যায্য মূল্য পেতে সহায়তা করার তাগিদে। বিশেষত ঘূর্ণিঝড় ফণীর তাণ্ডব থেকে আল্লাহর রহমতে বাংলাদেশ অনেকখানি রেহাই পাওয়ায় মাঠে থাকা বোরো ফসলের উৎপাদন তেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। তাই এবারের বাম্পার বোরো ধান উৎপাদন মাঠ পর্যায়ের কৃষকদের ধানের ভালো দাম পেতে বাধা সৃষ্টি করেছে। কিন্তু বাম্পার ফসলের বোরো ধান যেহেতু মোটা চাল উৎপাদন বাড়িয়েছে, তাই এ চাল আন্তর্জাতিক বাজারে ভালো বাজার পাবে না। উপরন্তু, ধান যেহেতু এখন আর তেমন বেশি কৃষকের ঘরে নেই, তাই রফতানির সুফল কৃষক পাবেন না; চালকল মালিকরা রফতানির মুনাফা কুক্ষিগত করবেন। অতএব, সারা দেশ থেকে দ্রুত তথ্য সংগ্রহ করে নিশ্চিত হয়ে রফতানির পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান নিতে হবে সরকারকে। সেজন্যই নীতিপ্রণেতাদের বিবেচনার জন্য কয়েকটি বিষয় তুলে ধরছি আজকের কলামে।

দেশের চালের বাজারে বড় বড় বেশ কয়েকটি অটোমেটিক রাইস মিলের মালিকদের একটা সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করে ফেলেছে বলে ওয়াকিবহাল মহলের ধারণা। গত বছর তারা যোগসাজশকারী অলিগোপলি সৃষ্টি করে চালের বাজারদামকে কয়েক মাস ধরে কৃত্রিমভাবে বেশ খানিকটা বাড়াতে সমর্থ হয়েছিলেন। ওই সময় চালের কোনো উৎপাদন ঘাটতি না থাকা সত্ত্বেও ২০১৭ সালের তুলনায় ২০১৮ সালে চাল আমদানি অনেক কম হওয়ায় মুনাফাবাজির উদ্দেশ্যে বাজারে তাদের এক ধরনের কার্টেল পাওয়ার খাটাতে সমর্থ হয়েছিলেন তারা। এ মালিকদের নেতৃস্থানীয় কয়েকজন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় ওই পর্যায়ে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির পেছনে রাজনৈতিক ষড়ষন্ত্রের অপপ্রয়াসও থাকতে পারে বলে ওয়াকিবহাল মহলে এবং মিডিয়ায় আলোচনার সূত্রপাত হয়েছিল। বড় চালকল মালিকদের ওই সিন্ডিকেট কিন্তু এখনো বহাল তবিয়তে রয়ে গেছে। এর সঙ্গে দেশের চালের বাজারের বড় বড় মোকামের বৃহৎ আড়তদারদের যোগসূত্রকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে। মুনাফাবাজির সুযোগ সৃষ্টি হলে সংঘবদ্ধ মজুদদারির মাধ্যমে পাইকারি ও খুচরা চালের বাজারে আগুন লাগাতে এরা মোটেই দেরি করবেন না। সামনে যেহেতু বর্ষাকাল আসছে, তাই আষাঢ় ও শ্রাবণ মাসের অতিবৃষ্টির সময় বন্যার আশঙ্কা দেখা দিলেই উল্লিখিত সিন্ডিকেট ও মজুদদারদের গোপন সমঝোতায় চালের বাজারকে অস্থিতিশীল করার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়ে যেতে পারে। ১০-১৫ লাখ টন চাল দেশের চালের বাজারের একটি উল্লেখযোগ্য শতাংশ হওয়ায় কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের হাতে এই পরিমাণ জোগানের ঘাটতি বড়সড় অস্ত্র তুলে দেবে কিনা, ভেবে দেখা প্রয়োজন। ১০-১৫ লাখ টন চাল রফতানি করে বাংলাদেশ খুব বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করবে না কিন্তু কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতে পারলে অভ্যন্তরীণ চালের বাজারে বর্ষাকালে আগুন লেগে গেলে অন্যান্য পণ্যের দামেও ওই আগুন ছড়াতে দেরি হবে না। এটা অবশ্যই ঠিক যে চাল রফতানির বিষয়টির একটা রাজনৈতিক তাত্পর্য রয়েছে। চাল রফতানিকারক দেশের তালিকায় নাম উঠলে ‘তলাবিহীন ভিক্ষার ঝুলি’ ইমেজ কাটানোর আরো একটি ডাইমেনশন সৃষ্টি হবে, সন্দেহ নেই। কিন্তু এখন আওয়ামী লীগের সামনে তেমন কোনো নির্বাচন বা অন্য ধরনের রাজনৈতিক তাগিদ নেই চাল রফতানির রাজনৈতিক ফায়দা তোলার। অতএব, সিদ্ধান্তটি নিতে হবে মাঠ পর্যায়ের কৃষকদের ন্যায্যমূল্য পাওয়াকে অগ্রাধিকার দিয়ে। রফতানি না করেও সরকার যদি ন্যায্যমূল্যে বাজার থেকে বেশকিছু পরিমাণ বোরো ধান সংগ্রহ করে বাফার স্টক জোরদার করার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে ওই ধানের চাল শহরের গার্মেন্ট শ্রমিক ও গ্রামের প্রান্তিক অবস্থানের হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে ভর্তুকি দামে বিক্রয় করে সরকার রাজনৈতিকভাবে বেশি লাভবান হবে। এ বিকল্প ব্যবস্থার সুফল হলো, বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির কোনো সুযোগ পাবে না কোনো সিন্ডিকেট বা মজুদদারগোষ্ঠী।

আমার এ প্রস্তাবটির আসলে একটি সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য রয়েছে। ভারতের কেরালা, তামিলনাড়ু, পশ্চিমবঙ্গসহ অনেক রাজ্যে সফলভাবে খাদ্যশস্য রেশনিং ব্যবস্থা চালু রয়েছে। বাংলাদেশে মুক্ত বাজার অর্থনীতির ডামাডোলে শরিক হয়ে বিশ শতকের আশি ও নব্বইয়ের দশকে আমরা রেশনিং ব্যবস্থাকে প্রায় গুটিয়ে ফেলেছি। এর পরিবর্তে ভিজিডি ও ভিজিএফের মতো যে কয়েকটি সেফটি নেট কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, সেগুলোর প্রকৃত ফায়দাভোগী ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান-মেম্বার থেকে শুরু করে রাজনৈতিক নেতাকর্মী এবং পাইপলাইনের আমলা কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। রেশন ব্যবস্থাও চরম দুর্নীতিগ্রস্ত ছিল। তবু বলব, সমাজের বিত্তহীন ও দারিদ্র্যপীড়িত জনগোষ্ঠীর খাদ্যনিরাপত্তার জন্য বাজার ব্যবস্থার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীলতা বিপদ ডেকে আনতে পারে। বাজার ব্যবস্থার পাশাপাশি শহর ও গ্রামের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে ভর্তুকি দামে খাদ্যশস্য পৌঁছানোর একটা ‘কার্যকর সিস্টেম’ সরকারের রুটিন দায়িত্বের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা এখনো অগ্রাধিকারের দাবি রাখে। মুক্ত বাজার অর্থনীতির অহিফেনের মৌতাতে  মশগুল হয়ে প্রয়াত অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান ২০০১-০৬ মেয়াদে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় যেভাবে দেশের খাদ্য মজুদকে বিপজ্জনক পর্যায়ে নামিয়ে ফেলেছিলেন, সেটা আরেকটু হলে বাংলাদেশকে ২০০৭ সালে আবার দুর্ভিক্ষাবস্থার সম্মুখীন করে ফেলেছিল, তা যেন আমরা বিস্মৃত না হই! ২০০৬-০৮ সালে সরকারের খাদ্যশস্যের বাফার স্টকের মারাত্মক ক্ষীণকায় অবস্থা ২০০৭ সালের শেষ দিকে চালের বাজারে যে কৃত্রিম সংকট এবং বিপজ্জনক ‘প্যানিক বায়িং’ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল, এর পুনরাবৃত্তি যেন আর না হয়। ওই সময় সামরিক বাহিনীর সমর্থনপুষ্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতাসীন থাকায় মজুদদাররা কিছুটা ভয়ে ছিল, তাই পরিস্থিতি কোনোমতে সামাল দেয়া গেছে। ভবিষ্যতে এ রকম অজুহাত পেলে সরকার ও জনগণকে বিপদে ফেলবে মজুদদাররা। আমরা ১৯৭৪ সালের কথা যেন বিস্মৃত না হই। চালের দাম আড়াই টাকা কেজি থেকে এক লাফে দুই মাসের মধ্যে ১০ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছিলেন এ দেশের মজুদদাররা। নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের পেছনে চালের এই অতিদ্রুত আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতিকেই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর খাদ্যের ওপর ক্রয়ক্ষমতা হারানোর মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। তিনি দেখিয়েছেন, ১৯৭৩ সালের তুলনায় ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে ধান উৎপাদন প্রকৃতপক্ষে বেড়ে গিয়েছিল। তাই উৎপাদন ঘাটতির জন্য দুর্ভিক্ষ হয়েছিল, সেটা পুরোপুরি ঠিক নয়। বর্ষাকালে এখনো এ দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশ মৌসুমি বেকারত্বের শিকার হয়, কথাটি যেন আমরা ভুলে না যাই। আমি রফতানির বিপক্ষে বলছি অতীতের এই দুঃখজনক কাহিনীগুলো স্মরণ করে। রফতানির ভালো বিকল্প হবে একটি দরিদ্রবান্ধব রেশনিং ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রাম ও শহরের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সারা বছরের খাদ্যশস্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

 

লেখক: একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়