২২, আগস্ট, ২০১৯, বৃহস্পতিবার | | ২০ জ্বিলহজ্জ ১৪৪০


জাহাঙ্গীর তুই আমাদের ক্ষমা করিস -জুলফিকার আলী শাহীন

অসম্মানের বিষে ভরা আমাদের রাজনীতি

রিপোর্টার নামঃ প্রতিদিনের কাগজ ডেস্ক | আপডেট: ০২ জুন ২০১৯, ০২:২০ পিএম

 জাহাঙ্গীর তুই আমাদের ক্ষমা করিস  -জুলফিকার আলী শাহীন
জাহাঙ্গীর তুই আমাদের ক্ষমা করিস -জুলফিকার আলী শাহীন

২জুন পূর্বধলা উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলমের ১৬ তম মৃত্যু বার্ষিকী। ২০০৩ সানের এই দিনে ক্ষণজন্মা এই আত্মত্যগী পৃথিবীর মায়া ত্যগ করে আমাদের শোকের সাগরে ভাসিয়ে ছিল।
সেদিনের কথা মনে হলে আজো চোখের জলে বুক ভাসে। নিজেকে স্থির রাখতে পারিনা। উপজেলা যুবলীগের সম্মেলনের প্রস্তুতি চলছিলো। আমি সভাপতি, জাহাঙ্গীর সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী। পৃথক ভাবে কার্যক্রম চালালোও আমাদের মাঝে ছিল আঘোষিত প্যানেল। প্রতিদিন রুটিন করে আমরা চলে যেতাম উপজেলার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। সেদিন জাহাঙ্গীর চলে গেলো বাট্টা, সাত্যাটি, বেড়াইল এলাকায় দলীয় কর্মীদের সাথে দেখা করতে। দুপুরের দিকে হঠাৎ খবর এলো জাহাঙ্গীর অসুস্থ হয়ে পূর্বধলা হাসপাতালে ভর্তি। কালবিলম্ব না করে ছুটে গেলাম হাসপাতালে। হাসপাতালের আর.এম.ও ডাঃ সোহেল নবী আমাকে একটু আড়ালে ডেকে নিয়ে জানালেন রোগী অবস্থা খুবই খারপ। হার্টে বড় ধরণের সমস্যা হয়েছে, দ্রুত ময়মনসিংহ হাসপাতালে নিতে হবে। তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল। দুপুরের ট্রেন চলে গেছে। হাসপাতালের এ্যম্বুল্যান্স নষ্ট, রাস্তার অবস্থা খুব খারাপ যানবাহন চলেনা। কোন উপায় না পেয়ে কালাম তালুকদারকে পাঠালাম প্রিন্সিপাল সিরাজুল ইসলাম স্যারের ব্যক্তিগত কারটি নিয়ে আসার জন্য। স্যার আমাকে ডেকে পাঠালেন এবং গাড়িটি দিয়ে দিলেন।
জাহাঙ্গীরের স্ত্রী 'মীতা'কে সাথে নিয়ে ময়মনসিংহ মোডিকেল হাসপাতালে জাহাঙ্গীরকে ভর্তি করি সিসিইউতে। ডাক্তার তাৎক্ষনিক ৬হাজার টাকার ঔষধ লিখে দিলেন। তড়িগড়ি চলে আসায় আমাদের সাথে তখন এতো টাকা ছিল না। ময়মনসিংহে অবস্থানরত নেতাদের কাছে টাকা ধার চাইতে ভরসা পাচ্ছিলাম না। পরে মীতার এক আত্মীয়ের মাধ্যমে ওষুধের ব্যবস্থা হয়েছিল। রাত ৮টার দিকে কেন্দ্রীয় নেতা আহমদ হোসেনের অনুরোধে জাহাঙ্গীরকে দেখতে এলেন ডাঃ সি.এন সরকার, সাথে জেলা আওয়ামীলীগ নেতা এডভোকেট পীযুষ দা। তখন পুরোদমে চিকৎসা চলছে। জাহাঙ্গীর আগের চেয়ে অনেক সুস্থ। পাশের বেডে রোগীর সংগ্রহে থাকা দৈনিক সংবাদ পত্রিকাটি নাড়িয়েচাড়িয়ে দেখছে। স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে সবার সাথে কথাও বলছে। আমরা তার আচরণ দেখে আনেকটা আশ্বস্ত হলাম। মনিটরের দিকে তাকিয়ে ডাঃ সি.এন সরকার আমাকে বললেন রোগীর সাথে কে কে আছেন। আমি বললাম স্ত্রী আছে, ভাইয়েরা রাস্তায় অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে চলে আসবে। তিনি আমাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে বললেন, রোগীর অবস্থা ভালো না। যে কোন সময়....। কথাটি শোনার পর বুকে পাথর নেমে এলো। তখনো জাহাঙ্গীর সাবলিল, কথা বলে যাচ্ছে। আমি অনাগত পরিস্থিতির কথা কাউকে বলতে পারছি না। স্যারের গাড়িটি রাতেই পৌঁছে দিতে হবে, তাই জাহাঙ্গীরের ছোট ভাই টিটুকে রেখে ভোর রাতে চলে আসার প্রস্তুতি নিলাম। আসার সময় বলে আসলাম কোন প্রকার সমস্যা হলে আমাদের সাবেক এমপি মোশাররফ হোসেন এডভোকেট মহোদয় এর যেনো সাহায্য নেয়। কিন্তু কিছুতেই দুঃসংবাদটি কাউকে বলতে পারলাম না। পূর্বধলা এসে শুধুমাত্র বিষয়টি রাজ্জাক সরকারকে জানালাম এবং পরবর্তী প্রস্তুতির জন্য তৈরি থাকতে বললাম। হৃদয় স্পন্দনে তখন জাহাঙ্গীরের জীবন-মৃত্যু সন্ধিক্ষণের ক্রাউনডাউন চলছে। সকাল সূর্যবেলায় অস্তমিত হলো একটি সংগ্রামী নক্ষত্রের।
সৃষ্টিকর্তা মৃত্যুর শোক বইবার ক্ষমতা মানুষকে দিয়েছেন ঠিকই কিন্তু কিছু কিছু মৃত্যু স্মৃতি এখনো কাঁদায়। জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর পর ক'বছর ঘটা করে মৃত্যু বার্ষিকী পালন করা হলেও আজ আর কেউ খবর রাখেনা।
হয়তো রাজনীতির পালা বদলের কারণে পূর্বধলা আওয়ামীলীগের রাজনীতিতে এ হীন সংস্কৃতি চালু হয়েছে। প্রয়াত সাবেক এমপি নাজমুল হুদা, মোশাররফ হোসেন এডভোকেট, উপজেলা আওয়ামীলীগের সাবেক সভাপতি আবুসিদ্দিক আহমেদ, সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবুল হাসিম মাস্টার, জেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি বাবু স্বপন জোয়ারদার, ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি নূর আহাম্মদ খান বাবুল, জাহাঙ্গীরের মতো নেতাদের কথা পূর্বধলা উপজেলা আওয়ামীলীগ স্মরণ করেনা। ভয় একটাই যাদের শ্রম আর ঘামে আজকের আওয়ামীলীগ তাদেরকে আড়াল করে রাখা। তা নাহলে নতুন প্রজন্ম সঠিক ইতিহাস জেনে যাবে।
আপনাদের জেনে রাখা ভালো রাজনীতিতে যে বিষবাষ্প আপনারা ঢেলেছেন, আপনাদের দম্ভও ধ্বংস হবে একদিন আপনাদেরই দেখিয়ে দেয়া অসম্মানের বিষে।
লেখক: সাবেক যুগ্ম আহবায়ক, পূর্বধলা উপজেলা ছাত্রলীগ।

জাহাঙ্গীর তুই আমাদের ক্ষমা করিস -জুলফিকার আলী শাহীন

প্রতিবেদক নাম: প্রতিদিনের কাগজ ডেস্ক ,

প্রকাশের সময়ঃ ০২ জুন ২০১৯, ০২:২০ পিএম

২জুন পূর্বধলা উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলমের ১৬ তম মৃত্যু বার্ষিকী। ২০০৩ সানের এই দিনে ক্ষণজন্মা এই আত্মত্যগী পৃথিবীর মায়া ত্যগ করে আমাদের শোকের সাগরে ভাসিয়ে ছিল।
সেদিনের কথা মনে হলে আজো চোখের জলে বুক ভাসে। নিজেকে স্থির রাখতে পারিনা। উপজেলা যুবলীগের সম্মেলনের প্রস্তুতি চলছিলো। আমি সভাপতি, জাহাঙ্গীর সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী। পৃথক ভাবে কার্যক্রম চালালোও আমাদের মাঝে ছিল আঘোষিত প্যানেল। প্রতিদিন রুটিন করে আমরা চলে যেতাম উপজেলার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। সেদিন জাহাঙ্গীর চলে গেলো বাট্টা, সাত্যাটি, বেড়াইল এলাকায় দলীয় কর্মীদের সাথে দেখা করতে। দুপুরের দিকে হঠাৎ খবর এলো জাহাঙ্গীর অসুস্থ হয়ে পূর্বধলা হাসপাতালে ভর্তি। কালবিলম্ব না করে ছুটে গেলাম হাসপাতালে। হাসপাতালের আর.এম.ও ডাঃ সোহেল নবী আমাকে একটু আড়ালে ডেকে নিয়ে জানালেন রোগী অবস্থা খুবই খারপ। হার্টে বড় ধরণের সমস্যা হয়েছে, দ্রুত ময়মনসিংহ হাসপাতালে নিতে হবে। তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল। দুপুরের ট্রেন চলে গেছে। হাসপাতালের এ্যম্বুল্যান্স নষ্ট, রাস্তার অবস্থা খুব খারাপ যানবাহন চলেনা। কোন উপায় না পেয়ে কালাম তালুকদারকে পাঠালাম প্রিন্সিপাল সিরাজুল ইসলাম স্যারের ব্যক্তিগত কারটি নিয়ে আসার জন্য। স্যার আমাকে ডেকে পাঠালেন এবং গাড়িটি দিয়ে দিলেন।
জাহাঙ্গীরের স্ত্রী 'মীতা'কে সাথে নিয়ে ময়মনসিংহ মোডিকেল হাসপাতালে জাহাঙ্গীরকে ভর্তি করি সিসিইউতে। ডাক্তার তাৎক্ষনিক ৬হাজার টাকার ঔষধ লিখে দিলেন। তড়িগড়ি চলে আসায় আমাদের সাথে তখন এতো টাকা ছিল না। ময়মনসিংহে অবস্থানরত নেতাদের কাছে টাকা ধার চাইতে ভরসা পাচ্ছিলাম না। পরে মীতার এক আত্মীয়ের মাধ্যমে ওষুধের ব্যবস্থা হয়েছিল। রাত ৮টার দিকে কেন্দ্রীয় নেতা আহমদ হোসেনের অনুরোধে জাহাঙ্গীরকে দেখতে এলেন ডাঃ সি.এন সরকার, সাথে জেলা আওয়ামীলীগ নেতা এডভোকেট পীযুষ দা। তখন পুরোদমে চিকৎসা চলছে। জাহাঙ্গীর আগের চেয়ে অনেক সুস্থ। পাশের বেডে রোগীর সংগ্রহে থাকা দৈনিক সংবাদ পত্রিকাটি নাড়িয়েচাড়িয়ে দেখছে। স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে সবার সাথে কথাও বলছে। আমরা তার আচরণ দেখে আনেকটা আশ্বস্ত হলাম। মনিটরের দিকে তাকিয়ে ডাঃ সি.এন সরকার আমাকে বললেন রোগীর সাথে কে কে আছেন। আমি বললাম স্ত্রী আছে, ভাইয়েরা রাস্তায় অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে চলে আসবে। তিনি আমাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে বললেন, রোগীর অবস্থা ভালো না। যে কোন সময়....। কথাটি শোনার পর বুকে পাথর নেমে এলো। তখনো জাহাঙ্গীর সাবলিল, কথা বলে যাচ্ছে। আমি অনাগত পরিস্থিতির কথা কাউকে বলতে পারছি না। স্যারের গাড়িটি রাতেই পৌঁছে দিতে হবে, তাই জাহাঙ্গীরের ছোট ভাই টিটুকে রেখে ভোর রাতে চলে আসার প্রস্তুতি নিলাম। আসার সময় বলে আসলাম কোন প্রকার সমস্যা হলে আমাদের সাবেক এমপি মোশাররফ হোসেন এডভোকেট মহোদয় এর যেনো সাহায্য নেয়। কিন্তু কিছুতেই দুঃসংবাদটি কাউকে বলতে পারলাম না। পূর্বধলা এসে শুধুমাত্র বিষয়টি রাজ্জাক সরকারকে জানালাম এবং পরবর্তী প্রস্তুতির জন্য তৈরি থাকতে বললাম। হৃদয় স্পন্দনে তখন জাহাঙ্গীরের জীবন-মৃত্যু সন্ধিক্ষণের ক্রাউনডাউন চলছে। সকাল সূর্যবেলায় অস্তমিত হলো একটি সংগ্রামী নক্ষত্রের।
সৃষ্টিকর্তা মৃত্যুর শোক বইবার ক্ষমতা মানুষকে দিয়েছেন ঠিকই কিন্তু কিছু কিছু মৃত্যু স্মৃতি এখনো কাঁদায়। জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর পর ক'বছর ঘটা করে মৃত্যু বার্ষিকী পালন করা হলেও আজ আর কেউ খবর রাখেনা।
হয়তো রাজনীতির পালা বদলের কারণে পূর্বধলা আওয়ামীলীগের রাজনীতিতে এ হীন সংস্কৃতি চালু হয়েছে। প্রয়াত সাবেক এমপি নাজমুল হুদা, মোশাররফ হোসেন এডভোকেট, উপজেলা আওয়ামীলীগের সাবেক সভাপতি আবুসিদ্দিক আহমেদ, সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবুল হাসিম মাস্টার, জেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি বাবু স্বপন জোয়ারদার, ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি নূর আহাম্মদ খান বাবুল, জাহাঙ্গীরের মতো নেতাদের কথা পূর্বধলা উপজেলা আওয়ামীলীগ স্মরণ করেনা। ভয় একটাই যাদের শ্রম আর ঘামে আজকের আওয়ামীলীগ তাদেরকে আড়াল করে রাখা। তা নাহলে নতুন প্রজন্ম সঠিক ইতিহাস জেনে যাবে।
আপনাদের জেনে রাখা ভালো রাজনীতিতে যে বিষবাষ্প আপনারা ঢেলেছেন, আপনাদের দম্ভও ধ্বংস হবে একদিন আপনাদেরই দেখিয়ে দেয়া অসম্মানের বিষে।
লেখক: সাবেক যুগ্ম আহবায়ক, পূর্বধলা উপজেলা ছাত্রলীগ।