২১, জুলাই, ২০১৯, রোববার | | ১৮ জ্বিলকদ ১৪৪০


আমি ৪১০টা নরমাল ডেলিভারি করিয়েছি

রিপোর্টার নামঃ প্রতিদিনের কাগজ অনলাইন | আপডেট: ১৫ এপ্রিল ২০১৯, ০৭:২৬ পিএম

 আমি ৪১০টা নরমাল ডেলিভারি করিয়েছি
সানজানা ও তার কোলে শিশুরা।

আমি সানজান শিরীন। পেশায় একজন মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট। মানুষের অনেক রকমের শখ থাকে আমার প্রিয় শখই হচ্ছে নরমাল ডেলিভারি করানো। এখন পর্যন্ত আমি ৪১০টা নরমাল ডেলিভারি করিয়েছি।

বাড়ি হবিগঞ্জ জেলায়। বর্তমানে জব করছি মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ থানায় ৫০ শয্যাবিশিষ্ট ক্যামেলিয়া ডানকান ফাউন্ডেশন হাসপাতালে। এটা ১৭টা চা বাগানের শুধুমাত্র চা শ্রমিকের চিকিৎসার জন্য তৈরি।

আমরা ৬ বোন ২ভাই। আমি ৩ নম্বর। বাবা মুদির দোকানদার। বড় ভাই আর বাবা মিলে দোকান চালায়, বড় বোনের বিয়ে হইছে। তারপর আমি, পরের বোনটা প্রাইমারি স্কুলে জব হইছে এ বছর। পরের বোনকে নার্সিং পড়াচ্ছি, পরের বোন ডিগ্রি পড়ে, পরের ভাই এবার SSC দিল, তার পরের বোন ক্লাস সেভেনে পড়ে৷

মা -বাবা ২ জনই পড়াশোনা করেননি। সবার বড় ভাই, তারপরের বোনটা বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ের পর থেকেই পারিবারিক অশান্তি লেগেই আছে। এই অশান্তি দেখে আমরা লাস্ট ৫ বোন ভয় পেয়ে যাই বিয়ে নিয়ে। সবাই এটা বুঝি যে, বাবার যেহেতু টাকা পয়সা নাই সেহেতু ভালো করে পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়ানো ছাড়া আমাদের উপায় নেই।

সবার বড় ভাই আর বোন ছাড়া বাকি ভাইবোনগুলা আমরা সবাই পড়াশোনায় ভালো। বাবা মা কোনোদিন ভুলেও আমাদের পড়তে বসতে বলেনি বরং পড়া থেকে উঠিয়ে নিয়ে গেছে কাজ করাতে। যেহেতু বাবা মা পড়াশোনা জানে না সেহেতু ভালো গাইড পাইনি আমরা কীভাবে কী করব।

SSC পাসের পর কলেজে চান্স পাইলাম কিন্তু বড় ভাই ভর্তি করাবেন না, মহিলাদের কলেজে ভর্তি করাতে চায়। অনেক যুদ্ধ করে বৃন্দাবন কলেজে ভর্তি হলাম। HSC পরীক্ষার সময়ে একটা লিফটলেট পাই MATS কোর্সের। ঘরে সবাইকে দেখানোর পর কেউ রাজি হলো না। আর বেশি পড়াতে চায় না ভাই।

প্রায় ১৫-২০দিন কান্নাকাটি করছি, সিলিংফ্যানে উড়না বেঁধে সুইসাইডের চেষ্টাও করছি, খবর পেয়ে বাবা টিনের দরজা শাবল দিয়ে কেটে দরজা খুলে আমাকে নামায় আর কথা দেয় আমি যা চাই তাই হবে। ভর্তি হলাম মৌলভীবাজার ম্যাটসে, সাথে মৌলভীবাজার সরকারি কলেজে ডিগ্রিতেও ভর্তি হলাম।

ভর্তি হয়েও বাধা শুরু প্রত্যেক মাসে ক্লাসের বেতনের জন্য কান্নাকাটি করতে হতো, মধ্যবিত্ত ফ্যামিলি, এতগুলা মানুষের পড়াশোনা আর খাওয়ার খরচ হিমশিম খাইতে হতো বাবা আর ভাইকে কোনো মতে ম্যাটস কমপ্লিট করলাম। কমপ্লিট করার পর আরেক টেনশন। সরকারি নিয়োগ বন্ধ, জব নাই। আর মৌলভীবাজার শহরের কোনো ক্লিনিকে ম্যাটসের স্টুডেন্ট নিতে চায় না কাজ পারা সত্ত্বেও। ফ্রেন্ড একজনে একটা ক্লিনিকে মালিকের সাথে কথা বলে ৯ হাজার টাকার বেতনে কথা বলে দিল।প্রসবের পর এভাবেই নবজাতক শিশুকে কােলে নিয়ে সেলফি তোলেন সানজানা। আর সাধারণ প্রসবে জন্ম নেওয়া বাচ্চার নম্বর লিখে রাখেন। ছবি : সানজানার ফেসবুক থেকে।

১৭ অগাস্ট ২০১৬ থেকে ডিউটি শুরু করি। ১৫দিন কাজ করার পর ক্লিনিকের মালিক আমার হাতে ১ হাজার টাকা নোট ধরিয়ে দিয়ে বলল, ‘তুমি কাজ পার কি না টেস্ট করলাম।’

সেদিন অনেক কাঁদছি, অনেক। এত টাকা দিয়ে কোর্স করে এত কম পারিশ্রমিক। বাড়িতে গেলেই বিয়ে দিয়ে দেবে এই ভয়ে বাড়িও যাই না। পরের মাসে আমাকে ৩৫০০টাকা, পরের মাসেও ৪ হাজার টাকা বেতন দিল। লজ্জায় বাড়িতে কিছু বলিনি। ২০ নভেম্বর ২০১৬ পর্যন্ত জব করলাম এই ক্লিনিকে বেতন পেলাম সাড়ে ৮ হাজার। ৩ মাসে বাড়ি ভাড়া বাকি পড়ল।

২০১৬ সালের ২১ তারিখে জয়েন করলাম হবিগঞ্জ নিজামপুর ইউনিয়নের প্যারামেডিক পোস্টে মা মনি Hs প্রজেক্টে। ভালো বেতন। সব চেয়ে ফেভারিট কাজও পেলাম নরমাল ডেলিভারি করানো। বড় ভাই চায়নি আমি জব করি আমি মনে প্রাণে চাই। তাই সে মানা করে দিল তারে যেন আর ভাই না ডাকি। আজ আড়াই বছর ধরে আমার ভাই আমার সাথে কথা বলে না।

সাড়ে ৫ মাসের বেশি কাজ করতে পারলাম না। প্রচুর ব্লাডের রিকুয়েস্ট ফোন ওয়েটিং পায় অফিস থেকে। একদিন হবিগঞ্জ মাতৃমংলের মেডিকেল অফিসার ভিজিট করতে আসলে অফিসের বস বলেই ফেলল ‘এই মেয়েকে রাখা যাবে না এই মেয়ের মেন্টালি প্রবলেম আছে প্রচুর ওয়েটিং থাকে ফোন।’ সেদিন স্যারকে বলেছিলাম, ‘বিশ্বাস করেন স্যার আমি প্রেম টেম করি না ব্লাডের কাজ করি তো তাই ফোন ওয়েটিং থাকে স্যার। সেদিন কেউ বিশ্বাস করেনি।’

অফিসের এসব চাপে চাকরিটা ছেড়ে দিলাম। ছেড়ে দিয়েও টেনশন কারণ আমার বেতন দিয়ে আমার এক বোনকে সিলেট উইমেন্স মেডিকেলে নার্সিং পড়াচ্ছিলাম। এক মাস বেকার থাকার পর জব হলো FIVDB তে প্যারামেডিক পোস্টে সিলেটের জৈন্তাপুর। সেখানেও ভালো বেতন, ফেভারিট কাজ নরমাল ডেলিভারি করানো।

ও হ্যাঁ বলে রাখি মা মনির যে বস বলেছিল আমার ম্যান্টালি সমস্যা সেই বস-ই ও নেগেটিভ ব্লাডের জন্য ফোন করছিল।

জৈন্তাপুরে একজন প্যারামেডিক মাতৃকালীন ছুটিতে ছিল তার পরিবর্তে আমাকে নিয়োগ দিছিল। সেই প্যারামেডিক চলে আসবে তাই অফিস সরাসরি আমাকে কিছু না বলে মেন্টালি টর্চার শুরু করল।

আমি কেন লিপস্টিক লাগাই? কেন টাইস প্যান্ট পড়ি।
একদিন ফেসবুকে পাসপোর্টও চাইলো।। ৬ জুন ২০০১৭থেকে জব শুরু করছিলাম। ৩১ অগাস্ট ২০১৭ পাশের স্কুলে একটা ফ্রি ব্লাড গ্রুপিং ক্যাম্প আয়োজন করছিলাম৷ অফিস থেকে জেনে গেল, ফোন করে থ্রেড দিল আরেক যদি স্কুলে পা বাড়াই তাহলে আমার পা কেটে ফেলবে।

সেদিনই জব ছেড়ে চলে আসি। হ্যাঁ, অইখানে ৩ মাসে ৯৯টা নরমাল ডেলিভারি করাইছি এটা স্বার্থকতা। জব ছেড়ে আসার দিন অফিসের ৩ জন বস অনেক হাসাহাসি করছিল কারণ তাদের উদ্দেশ্য সফল তাদের মেন্টালি টর্চারের কারণে আমি বাধ্য হইছি জব ছাড়তে। আর হ্যাঁ সেখান থেকে আসার ১ বছর পর যে বস বলছিল পা ভেঙে দিবে সে ফোন করছে ব্লাডের জন্য।

তারপর ডাক পড়ল মৌলভীবাজারের সমসের নগরে চা বাগানের জবের। ইন্টারভিউ দিয়ে জব পেলাম ৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮ সালে সিনিয়র নার্স পোস্টে। থাকা খাওয়া ফ্রি হলেও বেতন মাত্র ১০৮০০।

এত কম বেতন দিয়ে বোনকে পড়াচ্ছি আর কিছু টাকা ফ্যামিলিকে দিচ্ছি। এই হাসপাতালে চিকিৎসা সম্পূর্ণ ফ্রি। নরমাল ডেলিভারি ফ্রিতে করানো হয়। যে রোগীগুলা ক্রিটাল হয়ে যায় রেফার করা হয় তাদের নরমাল ডেলিভারি করতেও টাকা যায়, সিজার করলেও অনেক টাকা যায় । যেহেতু চা শ্রমিকদের টাকা নাই এত তাই অনেক সময় ডিউটি না থাকলেও নিজে আগ্রহ নিয়ে ডেলিভারি করাই।

ভালো কাজটা শুরু আমার যখন আমি ক্লাস নাইনে পড়ি তখন শহরে নান্টু স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়তাম। তখন আমাকে ভাড়ার জন্য ১০টাকা দেওয়া হতো ঘর থেকে। আসা-যাওয়া বাদে ৪/৫টাকা থাকত এক সপ্তাহ জমা করে প্রতি শুক্রবার একজন প্রতিবন্ধী বসত রাস্তায় খুব মায়া হতো উনাকে দিয়ে দিতাম।চিকিৎসা সেবা দিচ্ছেন সানজানা। ছবি : সংগৃহীত

একদিন আমার মায়ের ৫০টাকা চুরি করে দিয়ে এই লোকটাকে। আমি যখন ইন্টারে পড়তাম তখন পাশের বাড়ির খুব গরিব এক মহিলার সারা শরীর ফুলে গেল তখন মেডিকেলের কিছু জানতাম না। দেখে খুব মায়া হলো আমি কাছে গিয়ে জেনে আসলাম তার কী কী খেতে ইচ্ছে করে, যেহেতু তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে পারব না সেহেতু তার শেষ ইচ্ছেগুলা পূরণ করি।

ঘর থেকে ২০টাকা দিতো। একদিন কেকে খেতে চাইল।
টাকা জমিয়ে ৪৫ টাকা দিয়ে বড় একটা কেক কেনার সময় বড় ভাই দেখে ফেলে। বাড়িতে যাওয়ার পর জিজ্ঞেস করে কী কিনলাম, বইয়ের মাঝখানে কেক লুকিয়ে রেখে বুকে বই আজিয়ে রাখছিলাম। ভাই বলল দেখাও কী কিনছ? কেক দেখে অনেক রাগ করল, আম্মাকে বলল তুমার মেয়েকে ২০টাকা দেই সে কীভাবে ৪৫টাকার কেক কিনে খুঁজ নিছ??
সেদিন বিশ্বাস করাতে পারিনি।

রক্তদান শুরু হয় যখন আমি মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে ডিউটি করতাম তখন আমি ফেসবুক চালাইতাম না, মানুষ সেচ্ছায় রক্তদান করে এটাও ধারণার বাইরে ছিল। একদিন ডিউটিরত অবস্থায় এক নার্স আপু রোগীর জামাইকে বলতেছিল তুমার রোগীকে রেফার করে দিব যদি ব্লাড না নিয়ে আস। ওয়ার্ডে গিয়ে দেখলাম রোগীর বাচ্চা উলটা হওয়ায় এক হাত বের হয়ে গেছে আর রোগী ব্যথায় চিল্লাচ্ছে। ব্লাড গ্রুপ এ+ মিলে গেল, দৌড়ে গিয়ে ১ম রক্তদান করলাম ২৮ এপ্রিল ২০১৪ সালে। হ্যাঁ সেদিন সিজার হয় এবং মা বাচ্চা দুজনই ভালো থাকে। এ পর্যন্ত ১৪ বার রক্তদান করলাম এবং মানুষকে রক্তদানে উৎসাহিত করার চেষ্টা করি, মানুষ বাঁচে এরকম কাজে পাশে থাকার চেষ্টা করি।

বর্তমানে যেখানে জব করছি সেখানে অনেক যুদ্ধ করতে হয় ভালো কাজ করা নিয়ে। সেখানে আমাকে সাপোর্ট করবে তো দূরে থাক আমার কাজে বাধা দেওয়ার অনেক চেষ্টা করে কিন্তু আল্লাহ আমাকে হেলপ করেন।

আমার অনেক টাকা চাই সেটা পরিশ্রমের। ভালো একটা কাপড়ের অভাবে কারও বিয়েতে যাই না। লাস্ট একটা বিয়েতে গেসিলাম এক আপুর জামা পরে। টাকা চাই আমার নিজের জন্য না। আমি ভালো জামা চাই না, বিলাসী জীবন চাই না।

আমার অনেক ছোট ছোট স্বপ্ন আছে। এগুলা পূরণ করতে হবে। একটা বৃদ্ধাশ্রম বানাব, নিজে বৃদ্ধাদের সেবা করব।
ইতোমধ্যেই একটা এতিম বাচ্চার দায়িত্ব নিছি। তারা খাওয়া-থাকা আর পড়াশোনার সম্পূর্ণ খরচ আমি ব্যবস্থা করি আমার ফ্রেন্ডলিস্টের অনেক ভালো মানুষ টাকা দান করেন।
আমার আশেপাশে অনেক গরিব মানুষ থাকে টাকার অভাবে আমি তাদের হেল্প করতে পারি না।

আমি ভালো বেতনের একটা জব করতে চাই অবশ্যই অনেক পরিশ্রম করে। নরমাল ডেলিভারি নিয়া আমার জ্ঞান খুবই অল্প। যেহেতু আগ্রহ বেশি আমি চাই আরও ট্রেনিং নিতে নরমাল ডেলিভারি বিষয়ে যদিও সেই সুযোগ খুবই কম। ভবিষ্যতে খুব বেশি নরমাল ডেলিভারি হয় এমন জায়গায় কাজ করতে চাই৷ আর অবশ্যই জব প্লেইসে ভালো কাজ করার সাপোর্ট করার মানুষ চাই।

সুত্র; আজকের পত্রিকা

আমি ৪১০টা নরমাল ডেলিভারি করিয়েছি

প্রতিবেদক নাম: প্রতিদিনের কাগজ অনলাইন ,

প্রকাশের সময়ঃ ১৫ এপ্রিল ২০১৯, ০৭:২৬ পিএম

আমি সানজান শিরীন। পেশায় একজন মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট। মানুষের অনেক রকমের শখ থাকে আমার প্রিয় শখই হচ্ছে নরমাল ডেলিভারি করানো। এখন পর্যন্ত আমি ৪১০টা নরমাল ডেলিভারি করিয়েছি।

বাড়ি হবিগঞ্জ জেলায়। বর্তমানে জব করছি মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ থানায় ৫০ শয্যাবিশিষ্ট ক্যামেলিয়া ডানকান ফাউন্ডেশন হাসপাতালে। এটা ১৭টা চা বাগানের শুধুমাত্র চা শ্রমিকের চিকিৎসার জন্য তৈরি।

আমরা ৬ বোন ২ভাই। আমি ৩ নম্বর। বাবা মুদির দোকানদার। বড় ভাই আর বাবা মিলে দোকান চালায়, বড় বোনের বিয়ে হইছে। তারপর আমি, পরের বোনটা প্রাইমারি স্কুলে জব হইছে এ বছর। পরের বোনকে নার্সিং পড়াচ্ছি, পরের বোন ডিগ্রি পড়ে, পরের ভাই এবার SSC দিল, তার পরের বোন ক্লাস সেভেনে পড়ে৷

মা -বাবা ২ জনই পড়াশোনা করেননি। সবার বড় ভাই, তারপরের বোনটা বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ের পর থেকেই পারিবারিক অশান্তি লেগেই আছে। এই অশান্তি দেখে আমরা লাস্ট ৫ বোন ভয় পেয়ে যাই বিয়ে নিয়ে। সবাই এটা বুঝি যে, বাবার যেহেতু টাকা পয়সা নাই সেহেতু ভালো করে পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়ানো ছাড়া আমাদের উপায় নেই।

সবার বড় ভাই আর বোন ছাড়া বাকি ভাইবোনগুলা আমরা সবাই পড়াশোনায় ভালো। বাবা মা কোনোদিন ভুলেও আমাদের পড়তে বসতে বলেনি বরং পড়া থেকে উঠিয়ে নিয়ে গেছে কাজ করাতে। যেহেতু বাবা মা পড়াশোনা জানে না সেহেতু ভালো গাইড পাইনি আমরা কীভাবে কী করব।

SSC পাসের পর কলেজে চান্স পাইলাম কিন্তু বড় ভাই ভর্তি করাবেন না, মহিলাদের কলেজে ভর্তি করাতে চায়। অনেক যুদ্ধ করে বৃন্দাবন কলেজে ভর্তি হলাম। HSC পরীক্ষার সময়ে একটা লিফটলেট পাই MATS কোর্সের। ঘরে সবাইকে দেখানোর পর কেউ রাজি হলো না। আর বেশি পড়াতে চায় না ভাই।

প্রায় ১৫-২০দিন কান্নাকাটি করছি, সিলিংফ্যানে উড়না বেঁধে সুইসাইডের চেষ্টাও করছি, খবর পেয়ে বাবা টিনের দরজা শাবল দিয়ে কেটে দরজা খুলে আমাকে নামায় আর কথা দেয় আমি যা চাই তাই হবে। ভর্তি হলাম মৌলভীবাজার ম্যাটসে, সাথে মৌলভীবাজার সরকারি কলেজে ডিগ্রিতেও ভর্তি হলাম।

ভর্তি হয়েও বাধা শুরু প্রত্যেক মাসে ক্লাসের বেতনের জন্য কান্নাকাটি করতে হতো, মধ্যবিত্ত ফ্যামিলি, এতগুলা মানুষের পড়াশোনা আর খাওয়ার খরচ হিমশিম খাইতে হতো বাবা আর ভাইকে কোনো মতে ম্যাটস কমপ্লিট করলাম। কমপ্লিট করার পর আরেক টেনশন। সরকারি নিয়োগ বন্ধ, জব নাই। আর মৌলভীবাজার শহরের কোনো ক্লিনিকে ম্যাটসের স্টুডেন্ট নিতে চায় না কাজ পারা সত্ত্বেও। ফ্রেন্ড একজনে একটা ক্লিনিকে মালিকের সাথে কথা বলে ৯ হাজার টাকার বেতনে কথা বলে দিল।প্রসবের পর এভাবেই নবজাতক শিশুকে কােলে নিয়ে সেলফি তোলেন সানজানা। আর সাধারণ প্রসবে জন্ম নেওয়া বাচ্চার নম্বর লিখে রাখেন। ছবি : সানজানার ফেসবুক থেকে।

১৭ অগাস্ট ২০১৬ থেকে ডিউটি শুরু করি। ১৫দিন কাজ করার পর ক্লিনিকের মালিক আমার হাতে ১ হাজার টাকা নোট ধরিয়ে দিয়ে বলল, ‘তুমি কাজ পার কি না টেস্ট করলাম।’

সেদিন অনেক কাঁদছি, অনেক। এত টাকা দিয়ে কোর্স করে এত কম পারিশ্রমিক। বাড়িতে গেলেই বিয়ে দিয়ে দেবে এই ভয়ে বাড়িও যাই না। পরের মাসে আমাকে ৩৫০০টাকা, পরের মাসেও ৪ হাজার টাকা বেতন দিল। লজ্জায় বাড়িতে কিছু বলিনি। ২০ নভেম্বর ২০১৬ পর্যন্ত জব করলাম এই ক্লিনিকে বেতন পেলাম সাড়ে ৮ হাজার। ৩ মাসে বাড়ি ভাড়া বাকি পড়ল।

২০১৬ সালের ২১ তারিখে জয়েন করলাম হবিগঞ্জ নিজামপুর ইউনিয়নের প্যারামেডিক পোস্টে মা মনি Hs প্রজেক্টে। ভালো বেতন। সব চেয়ে ফেভারিট কাজও পেলাম নরমাল ডেলিভারি করানো। বড় ভাই চায়নি আমি জব করি আমি মনে প্রাণে চাই। তাই সে মানা করে দিল তারে যেন আর ভাই না ডাকি। আজ আড়াই বছর ধরে আমার ভাই আমার সাথে কথা বলে না।

সাড়ে ৫ মাসের বেশি কাজ করতে পারলাম না। প্রচুর ব্লাডের রিকুয়েস্ট ফোন ওয়েটিং পায় অফিস থেকে। একদিন হবিগঞ্জ মাতৃমংলের মেডিকেল অফিসার ভিজিট করতে আসলে অফিসের বস বলেই ফেলল ‘এই মেয়েকে রাখা যাবে না এই মেয়ের মেন্টালি প্রবলেম আছে প্রচুর ওয়েটিং থাকে ফোন।’ সেদিন স্যারকে বলেছিলাম, ‘বিশ্বাস করেন স্যার আমি প্রেম টেম করি না ব্লাডের কাজ করি তো তাই ফোন ওয়েটিং থাকে স্যার। সেদিন কেউ বিশ্বাস করেনি।’

অফিসের এসব চাপে চাকরিটা ছেড়ে দিলাম। ছেড়ে দিয়েও টেনশন কারণ আমার বেতন দিয়ে আমার এক বোনকে সিলেট উইমেন্স মেডিকেলে নার্সিং পড়াচ্ছিলাম। এক মাস বেকার থাকার পর জব হলো FIVDB তে প্যারামেডিক পোস্টে সিলেটের জৈন্তাপুর। সেখানেও ভালো বেতন, ফেভারিট কাজ নরমাল ডেলিভারি করানো।

ও হ্যাঁ বলে রাখি মা মনির যে বস বলেছিল আমার ম্যান্টালি সমস্যা সেই বস-ই ও নেগেটিভ ব্লাডের জন্য ফোন করছিল।

জৈন্তাপুরে একজন প্যারামেডিক মাতৃকালীন ছুটিতে ছিল তার পরিবর্তে আমাকে নিয়োগ দিছিল। সেই প্যারামেডিক চলে আসবে তাই অফিস সরাসরি আমাকে কিছু না বলে মেন্টালি টর্চার শুরু করল।

আমি কেন লিপস্টিক লাগাই? কেন টাইস প্যান্ট পড়ি।
একদিন ফেসবুকে পাসপোর্টও চাইলো।। ৬ জুন ২০০১৭থেকে জব শুরু করছিলাম। ৩১ অগাস্ট ২০১৭ পাশের স্কুলে একটা ফ্রি ব্লাড গ্রুপিং ক্যাম্প আয়োজন করছিলাম৷ অফিস থেকে জেনে গেল, ফোন করে থ্রেড দিল আরেক যদি স্কুলে পা বাড়াই তাহলে আমার পা কেটে ফেলবে।

সেদিনই জব ছেড়ে চলে আসি। হ্যাঁ, অইখানে ৩ মাসে ৯৯টা নরমাল ডেলিভারি করাইছি এটা স্বার্থকতা। জব ছেড়ে আসার দিন অফিসের ৩ জন বস অনেক হাসাহাসি করছিল কারণ তাদের উদ্দেশ্য সফল তাদের মেন্টালি টর্চারের কারণে আমি বাধ্য হইছি জব ছাড়তে। আর হ্যাঁ সেখান থেকে আসার ১ বছর পর যে বস বলছিল পা ভেঙে দিবে সে ফোন করছে ব্লাডের জন্য।

তারপর ডাক পড়ল মৌলভীবাজারের সমসের নগরে চা বাগানের জবের। ইন্টারভিউ দিয়ে জব পেলাম ৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮ সালে সিনিয়র নার্স পোস্টে। থাকা খাওয়া ফ্রি হলেও বেতন মাত্র ১০৮০০।

এত কম বেতন দিয়ে বোনকে পড়াচ্ছি আর কিছু টাকা ফ্যামিলিকে দিচ্ছি। এই হাসপাতালে চিকিৎসা সম্পূর্ণ ফ্রি। নরমাল ডেলিভারি ফ্রিতে করানো হয়। যে রোগীগুলা ক্রিটাল হয়ে যায় রেফার করা হয় তাদের নরমাল ডেলিভারি করতেও টাকা যায়, সিজার করলেও অনেক টাকা যায় । যেহেতু চা শ্রমিকদের টাকা নাই এত তাই অনেক সময় ডিউটি না থাকলেও নিজে আগ্রহ নিয়ে ডেলিভারি করাই।

ভালো কাজটা শুরু আমার যখন আমি ক্লাস নাইনে পড়ি তখন শহরে নান্টু স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়তাম। তখন আমাকে ভাড়ার জন্য ১০টাকা দেওয়া হতো ঘর থেকে। আসা-যাওয়া বাদে ৪/৫টাকা থাকত এক সপ্তাহ জমা করে প্রতি শুক্রবার একজন প্রতিবন্ধী বসত রাস্তায় খুব মায়া হতো উনাকে দিয়ে দিতাম।চিকিৎসা সেবা দিচ্ছেন সানজানা। ছবি : সংগৃহীত

একদিন আমার মায়ের ৫০টাকা চুরি করে দিয়ে এই লোকটাকে। আমি যখন ইন্টারে পড়তাম তখন পাশের বাড়ির খুব গরিব এক মহিলার সারা শরীর ফুলে গেল তখন মেডিকেলের কিছু জানতাম না। দেখে খুব মায়া হলো আমি কাছে গিয়ে জেনে আসলাম তার কী কী খেতে ইচ্ছে করে, যেহেতু তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে পারব না সেহেতু তার শেষ ইচ্ছেগুলা পূরণ করি।

ঘর থেকে ২০টাকা দিতো। একদিন কেকে খেতে চাইল।
টাকা জমিয়ে ৪৫ টাকা দিয়ে বড় একটা কেক কেনার সময় বড় ভাই দেখে ফেলে। বাড়িতে যাওয়ার পর জিজ্ঞেস করে কী কিনলাম, বইয়ের মাঝখানে কেক লুকিয়ে রেখে বুকে বই আজিয়ে রাখছিলাম। ভাই বলল দেখাও কী কিনছ? কেক দেখে অনেক রাগ করল, আম্মাকে বলল তুমার মেয়েকে ২০টাকা দেই সে কীভাবে ৪৫টাকার কেক কিনে খুঁজ নিছ??
সেদিন বিশ্বাস করাতে পারিনি।

রক্তদান শুরু হয় যখন আমি মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে ডিউটি করতাম তখন আমি ফেসবুক চালাইতাম না, মানুষ সেচ্ছায় রক্তদান করে এটাও ধারণার বাইরে ছিল। একদিন ডিউটিরত অবস্থায় এক নার্স আপু রোগীর জামাইকে বলতেছিল তুমার রোগীকে রেফার করে দিব যদি ব্লাড না নিয়ে আস। ওয়ার্ডে গিয়ে দেখলাম রোগীর বাচ্চা উলটা হওয়ায় এক হাত বের হয়ে গেছে আর রোগী ব্যথায় চিল্লাচ্ছে। ব্লাড গ্রুপ এ+ মিলে গেল, দৌড়ে গিয়ে ১ম রক্তদান করলাম ২৮ এপ্রিল ২০১৪ সালে। হ্যাঁ সেদিন সিজার হয় এবং মা বাচ্চা দুজনই ভালো থাকে। এ পর্যন্ত ১৪ বার রক্তদান করলাম এবং মানুষকে রক্তদানে উৎসাহিত করার চেষ্টা করি, মানুষ বাঁচে এরকম কাজে পাশে থাকার চেষ্টা করি।

বর্তমানে যেখানে জব করছি সেখানে অনেক যুদ্ধ করতে হয় ভালো কাজ করা নিয়ে। সেখানে আমাকে সাপোর্ট করবে তো দূরে থাক আমার কাজে বাধা দেওয়ার অনেক চেষ্টা করে কিন্তু আল্লাহ আমাকে হেলপ করেন।

আমার অনেক টাকা চাই সেটা পরিশ্রমের। ভালো একটা কাপড়ের অভাবে কারও বিয়েতে যাই না। লাস্ট একটা বিয়েতে গেসিলাম এক আপুর জামা পরে। টাকা চাই আমার নিজের জন্য না। আমি ভালো জামা চাই না, বিলাসী জীবন চাই না।

আমার অনেক ছোট ছোট স্বপ্ন আছে। এগুলা পূরণ করতে হবে। একটা বৃদ্ধাশ্রম বানাব, নিজে বৃদ্ধাদের সেবা করব।
ইতোমধ্যেই একটা এতিম বাচ্চার দায়িত্ব নিছি। তারা খাওয়া-থাকা আর পড়াশোনার সম্পূর্ণ খরচ আমি ব্যবস্থা করি আমার ফ্রেন্ডলিস্টের অনেক ভালো মানুষ টাকা দান করেন।
আমার আশেপাশে অনেক গরিব মানুষ থাকে টাকার অভাবে আমি তাদের হেল্প করতে পারি না।

আমি ভালো বেতনের একটা জব করতে চাই অবশ্যই অনেক পরিশ্রম করে। নরমাল ডেলিভারি নিয়া আমার জ্ঞান খুবই অল্প। যেহেতু আগ্রহ বেশি আমি চাই আরও ট্রেনিং নিতে নরমাল ডেলিভারি বিষয়ে যদিও সেই সুযোগ খুবই কম। ভবিষ্যতে খুব বেশি নরমাল ডেলিভারি হয় এমন জায়গায় কাজ করতে চাই৷ আর অবশ্যই জব প্লেইসে ভালো কাজ করার সাপোর্ট করার মানুষ চাই।

সুত্র; আজকের পত্রিকা