২৫, এপ্রিল, ২০১৯, বৃহস্পতিবার | | ১৯ শা'বান ১৪৪০

নুসরাত হত্যার ভয়াবহ বর্ণনা দিল নুর ও শামীম!

রিপোর্টার নামঃ স্টাফ রিপোর্টার: | আপডেট: ১৫ এপ্রিল ২০১৯, ০১:২১ পিএম

নুসরাত হত্যার ভয়াবহ বর্ণনা দিল নুর ও শামীম!
নুসরাত হত্যার ভয়াবহ বর্ণনা দিল নুর ও শামীম!

ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ও আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার নির্দেশে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়। শেষ পর্যন্ত মা-বাবার আর্তি, সতীর্থসহ সকলের প্রার্থনা আর চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে পাঁচদিন একটানা মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে গত ১০ এপ্রিল রাত সাড়ে ৯টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত মারা যান।

এদিকে, নুসরাত হত্যাকাণ্ডে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আরও অন্তত প্রায়ই ১২ জন জড়িত বলে জানা গেছে। রবিবার (১৫ এপ্রিল) নুসরাত হত্যা মামলার আসামি নুর উদ্দিন ও শাহদাত হোসেন শামীম আদালতে দেয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জড়িতদের নামও উল্লেখ করেছে। এর মধ্যে অন্যতম সোনাগাজী উপজেলা আ’লীগের সভাপতি রুহুল আমিনের নামও রয়েছে। বাকি সবাই ওই মাদ্রাসার আলিম ও ফাজিল শ্রেণির শিক্ষার্থীরা জড়িত বলে জানা যায়।

রবিবার ফেনীর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো: জাকির হোসাইন আসামি নুর উদ্দিন এবং শাহদাত হোসেন শামীমের জবানবন্দি রেকর্ড করেন।

দীর্ঘ ৯ ঘণ্টা ধরে দেয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে নুর ও শামীম নৃশংস ওই পুরো ঘটনাটির ভয়াবহ বর্ণনা দেন।

এর আগে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) প্রধান বনজ কুমার মজুমদার জানান, এজাহারভুক্ত আসামি সহ মোট ১৩ জন হত্যাকাণ্ডের বিভিন্ন পর্যায়ে জড়িত রয়েছেন।

পিবিআই-এর ফেনীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে নুর উদ্দিন ও শাহদাত হোসেন শামীম অনেক তথ্য দিয়েছে। তারা হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছে। অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার নির্দেশে তারা কীভাবে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল এবং তা বাস্তবায়নের জন্য কীভাবে কী করে তা বিস্তারিত বলেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘নুর উদ্দিন ও শামীম আরও কিছু নাম বলেছে। তদন্তের স্বার্থে আমরা তা প্রকাশ করছি না। এসব তথ্য যাচাইবাছাই করে বাকিদেরও গ্রেফতার করা হবে।’ পিবিআই-এর ফেনীর দায়িত্বরত এই কর্মকর্তা এমনটাই জানান।

একটি গোপন সূত্রে জানা যায়, যৌন হয়রানির মামলায় অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা গ্রেফতার হওয়ার পর উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমিনের নির্দেশে নুর উদ্দিন ও শাহদাত হোসেন শামীম অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার মুক্তির জন্য আন্দোলন শুরু করে। আন্দোলন ও নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার জন্য সোনাগাজীর একজন পৌর কাউন্সিলর তাদের ১০ হাজার ও মাদ্রাসার আরেক শিক্ষকও ৫ হাজার টাকা দেন।

নুসরাত হত্যায় সরাসরি অংশ নেয়া শাহদাত হোসেন শামীম স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জানিয়েছেন, নুসরাতের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়ার পর সে দৌড়ে নিচে নেমে মাদ্রাসার উত্তর দিকের প্রাচীর টপকে বের হয়ে যায়। বাইরে গিয়ে সে মোবাইল ফোনে রুহুল আমিনকে বিষয়টি জানায়। এ সময় রুহুল আমিন বলেন, আমি জানি। তোমরা চলে যাও।

শামীম এটাও বলেছে, নুসরাত জাহান রাফির দায়ের করা মামলার পর রুহুল আমিন থানা ম্যানেজ করার দায়িত্ব নিয়েছিল।

নিহত নুসরাতের প্রতি নিজের প্রচণ্ড ক্ষোভের কথা উল্লেখ করে শামীম তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেছে, সে নুসরাতকে দেড় মাস আগেও প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু নুসরাত তা প্রত্যাখান করার পাশাপাশি তাকে অপমান করে। এই কারণে সে নিজেও মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাতের প্রতি ক্ষুদ্ধ ছিল। যার ফলে ওই মাদ্রাসা অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার নির্দেশে অন্যদের সঙ্গে নিয়ে সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়।

মামলার আরেক আসামি নুর উদ্দিন বলেছে, তার সাথে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার ভালো সম্পর্ক ছিল। এ কারণে সিরাজ উদ দৌলার নির্দেশে তারা পরিকল্পনা করে নুসরাতকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার সিদ্ধান্ত নেয়। তিনি এও জানান, ঘটনার সময় সে ভবনের নিচে ছিল। আর পরিকল্পনা অনুযায়ী উম্মে সুলতানা পপি গিয়ে নুসরাতকে ভবনের ছাদে ডেকে নিয়ে যায়। ওই সময় ছাদে কামরুন নাহার মণি ছিল।

নুর উদ্দিন আরও জানিয়েছে, অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা বিভিন্ন সময় ছাত্রীদের নানা প্রলোভন দেখিয়ে তাদের যৌন হয়রানি করতো।

প্রসঙ্গত, ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে যৌন হয়রানি করেছিল ওই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা। পরে এ ঘটনায় নুসরাত থানায় অভিযোগ করলে অধ্যক্ষকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

গত ৬ এপ্রিল তারিখে সকাল বেলা সোনাগাজী ফাজিল মাদরাসা কেন্দ্রে পরীক্ষা দিতে গেলে নুসরাত জাহান রাফিকে পরীক্ষা কেন্দ্রের ছাদে ডেকে নিয়ে শ্লীলতাহানির মামলা তুলে নিতে বলা হয়। এ সময় নুসরাত মামলা তুলে নিতে অস্বীকৃতি জানালে মুখোশ পরা লোকজন তার গায়ে আগুন দিয়ে পালিয়ে যায়। পরে বুধবার (১০ এপ্রিল) রাত সাড়ে ৯টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন নুসরাত মারা যান।