২৫, এপ্রিল, ২০১৯, বৃহস্পতিবার | | ১৯ শা'বান ১৪৪০

গ্রাম বাংলায় বিলুপ্তির পথে পরিবেশ বান্ধব লাঙ্গল জোয়াল দিয়ে হালচাষ

রিপোর্টার নামঃ আবুবকর রানা,প্রতিদিনের কাগজ' | আপডেট: ১০ এপ্রিল ২০১৯, ০৮:৪৪ পিএম

গ্রাম বাংলায় বিলুপ্তির পথে পরিবেশ বান্ধব লাঙ্গল জোয়াল দিয়ে হালচাষ
গ্রাম বাংলায় বিলুপ্তির পথে পরিবেশ বান্ধব লাঙ্গল জোয়াল দিয়ে হালচাষ

বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। এদেশে প্রায় ৮০ ভাগ লোক কৃষক। আর কৃষি কাজে তারা কামারের তৈরি এক টুকরো লোহার ফাল দিয়ে কাঠমিস্ত্রির হাতে তৈরি কাঠের লাঙল, জোয়াল আর বাঁশের তৈরি মই ব্যবহার করে জমির চাষাবাদ করতেন। কৃষিকাজে ব্যবহৃত এসব স্বল্প মূল্যের কৃষি উপকরণ এবং গরু দিয়ে হালচাষ করে তারা যুগের পর যুগ ধরে ফসল ফলিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। দুই দশক আগেও বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে এমনই চিত্র চোখে পড়তো। জমি চাষাবাদে বৈজ্ঞানিক কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহারের ফলে এবং অল্প সময়ের মধ্যে অধিক জমি চাষাবাদের কারণে কালের আর্বতে হারিয়ে গেছে লাঙ্গল দিয়ে জমি চাষাবাদ"।" 

যান্ত্রিক আগ্রাসনে দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে গরুর হাল লাঙল জোয়াল। জমি চাষের কাজে কৃষক এক সময় কাঠের তৈরি লাঙল, জোয়াল, মই ও হালের বলদ ব্যবহার করতো। চাষাবাদের এসব কৃষি উপকরণ মানুষ হাজার বছর ধরে ব্যবহার করে এসেছে। কিন্তু কালের বিবর্তনে এসবের ব্যবহার আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে। পরিবেশ বান্ধব লাঙল-জোয়ালের জায়গা দখল করে নিয়েছে যান্ত্রিক পাওয়ারটিলার আর ট্রাক্টর। আগে লাঙল ছাড়া চাষাবাদের কথা চিন্তা করা যেত না। কিন্তু আধুনিক যুগে চাষাবাদের জন্য ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলারের মতো যান্ত্রিক সব উপকরণ আবিষ্কৃত হয়েছে। এসব আধুনিক যন্ত্রের সাহায্যে চাষাবাদে আগের তুলনায় সময়, শ্রম এবং অর্থের সাশ্রয় হচ্ছে। ফলে কৃষক আধুনিক যন্ত্র ব্যবহার করে চাষাবাদ করছে। এতে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী লাঙল, জোয়াল, মই ও হালের বলদ।" 

বর্তমানে গ্রাম বাংলার প্রায় সব কৃষক জমি চাষের জন্য ট্রাক্টর ব্যবহার করেন। ব্যাপক চাহিদা থাকায় কেউ কেউ যন্ত্রটি ভাড়া দিয়ে ব্যবসাও করছেন। লাঙল-মইসহ কৃষি সরঞ্জাম তৈরি করা যাদের পেশা তারা এখন বেশির ভাগ সময় বেকার বসে থাকছেন। ফলে অনেকেই এই পেশা ছেড়ে নতুন পেশায় চলে যাওয়ার কথা ভাবছেন। এভাবে হয়তো একদিন লাঙল তৈরির পেশায় থাকা ব্যক্তিরা তাদের পরবর্তী প্রজন্মকে এই কাজ আর শেখাবেন না। নতুন পেশা খুঁজে নেবেন তারা। তখন হাজার বছরের লাঙল-জোয়ালের স্থান হবে জাদুঘরে। মানুষের সভ্যতার ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে চিরবিশ্রামে থাকবে এই লাঙল- জোয়াল। কৃষক মোঃ যুয়াদ আলী প্রতিদিনের কাগজ’কে বলেন, এক সময় লাঙল, জোয়াল, মই ও বলদ ছাড়া চাষাবাদ কল্পনা করা যেত না। কিন্তু যান্ত্রিকতার এ যুগে সব হারিয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া আগের মতো লাঙল দিয়ে চাষাবাদও করছে না মানুষ। কৃষক অভিজিত চন্দ্র জানান, বর্তমানে গরু-বাছুরের রোগ বালাই আগের তুলনায় বেশি হয়। বাজারে হালের বলদের দামও চড়া। এসবের কারণে এলাকার কৃষক লাঙল- জোয়ালের ব্যবহার কমে দিয়েছে। কৃষক মমতাজ উদ্দিন বলেন,  আমি আগে গরুর হাল চাষি ছিলাম কিন্তু এখন ট্রক্টর দিয়ে জমি চাষ করছি। কৃষিবিদদের মতে, লাঙল-জোয়াল বলদের কাঁধে বসিয়ে হালচাষ পদ্ধতি পরিবেশ বান্ধব। কারণ গরুর গোবর থেকে নির্ভেজাল জৈব সার পাওয়া যায়। এই সার জমির উর্বরা শক্তি ও পুষ্টিগুণ বৃদ্ধি করে। তাই এই পদ্ধতি কৃষকের জন্য লাভজনক ও পরিবেশ সহায়ক ছিল। তবে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে হালচাষের সময় কম লাগে। এছাড়া অতিরিক্ত জনবলের প্রয়োজন হয় না। এছাড়া এ পদ্ধতির হালচাষে কৃষক অনেকটাই ঝামেলামুক্ত বলে মনে করেন।"

এতে করে একদিকে যেমন পরিবেশ রক্ষা হয়, অন্যদিকে কৃষকের অর্থ ব্যয় হয় কম। লাঙল, জোয়াল ও বাঁশের মই ছাড়াও হালচাষিরা অতিগুরুত্বপূর্ণ যে জিনিসটি ব্যবহার করেন তা হলো টোয়া বা কাফাইর, ফসলের পাশের কিংবা ঘাসপূর্ণ জমিতে চাষের সময় গরু যাতে কোনো খাদ্য খেতে না পারে, সেদিক লক্ষ্য রেখে পাট, বেত, বাঁশের কঞ্চি অথবা লতা জাতীয় এক ধরনের গাছ দিয়ে তৈরি টোয়া বা কাফাইর গরুর মুখে বেঁধে দেওয়া হয়। আর জোরে জোরে হাল চালানোর জন্য ব্যবহার করেন বাঁশের পাজইুন এবং পাজুইনের ( বাশেঁর লাঠির) অগ্রভাগে ছোট লোহার খইর লাগানো থাকতো, এতে করে গরুর পাছায় গুতা দিলে গরু তাড়াতাড়ি হাঁটতো। এটি খুব বেশি দিনের কথা নয়,  প্রায় বিশ বছর আগে এসব গরুর হালে লাঙল-জোয়াল আর মই গ্রামগঞ্জের জমিতে হরহামেশাই দেখা যেত। চাষিদের অনেকে নিজের জমিতে হালচাষ করার পাশাপাশি অন্যের জমি চাষিয়ে পারিশ্রমিক হিসেবে কিছু অর্থও উপার্জন করতেন।"

"তারা হাজারো কর্মব্যস্ততার মধ্যেও কখনো কখনো ফুরফুরে আনন্দে মনের সুখে বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের চাষিরা ভাওয়াইয়া বাটিয়ালী গান গেয়ে গেয়ে জমি চাষ দিতেন। ভোররাত থেকে শুরু করে প্রায় দুপুর পর্যন্ত জমিতে হালচাষ করতেন তারা। চাষিরা জমিতে হাল নিয়ে আসার আগে চিড়া-গুড় অথবা মুড়ি-মুড়কি দিয়ে হালকা জল খাবার খেয়ে নিতেন। পরে একটানা হট হট, ডাইনে যা, বাঁয়ে যা, বস বস আর উঠ উঠ করে যখন ক্লান্তি আসত, তখন সূর্য প্রায় মাথার উপর খাড়া হয়ে উঠতো। "

এ সময় চাষিরা সকালের নাশতার জন্য হালচাষে বিরতি রেখে জমির আইলের ওপর বসতেন। তাদের নাশতার ধরনটাও ছিল ঐতিহ্যবাহী। এক থাল পান্তা ভাতের সঙ্গে কাঁচা অথবা শুকনো মরিচ, সর্ষে খাঁটি তেল আর আলু ভর্তা। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো জমিতে হালচাষ দিতে দিতে এক চাষি আরেক চাষিকে হাস্যোজ্জ্বল ভঙ্গিতে গানে গানে বলতেন, জান চলে না’রে আর জান চলে না”।“

“বর্ষাকালে কারো জমির চাষাবাদ পিছিয়ে গেছে সবার শেষে হাল চাষিরা নিজে থেকে হাল গরু নিয়ে এসে পিছিয়ে পড়া চাষিদের জমি চাষ দিতেন। হাল চাষিদের সঙ্গে আরো যোগ দিতেন রোপার চারা লাগার লোকজন। সকলে অংশগ্রহণে উৎসবমুখর এই কাজটিকে বলা হতো- কিষ্যাণ। কিষ্যাণে অংশ নেওয়া কিষাণদের জন্য জমিওয়ালা গেরস্থরা বড় বড় মোরগ, হাঁস কিংবা খাসি জবাই করে ভোজ করাতেন।"

কিন্তু আজকাল সময়ের আবর্তে এসব গরুর হাল, কৃষি উপকরণ কাঠের লাঙল, জোয়াল, বাঁশের মই হারিয়ে যেতে বসেছে এবং হাল-কিষ্যাণ প্রায় বিলুপ্তির পথে। কেনইবা হবে না। এ যুগে মানুষের অসীম চাহিদা আর অভাবময় জীবনে উন্নয়নের ছোঁয়া দিতে আবির্ভূত হয়েছে দামি দামি যান্ত্রিক হাল। সঙ্গে এসেছে ফসলের বীজ, বপন- রোপণ এবং ফসল কাটামাড়াই করার যন্ত্র। আর এসব যন্ত্র চালাতে মাত্র এক থেকে দুজন লোক প্রয়োজন। ফলে বিত্তবান কৃষকরা ওই যন্ত্র কিনে মজুরের ভূমিকায় কাজ করলেও গ্রামের অধিকাংশ মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত ও দিনমজুরের জীবন থেকে ওই সব ঐতিহ্যময় স্মরণীয় দিন চিরতরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে"।