১৮, আগস্ট, ২০১৯, রোববার | | ১৬ জ্বিলহজ্জ ১৪৪০


নিমতলী থেকে চকবাজার, দুর্ঘটনা নাকি দায়িত্বহীনতা

রিপোর্টার নামঃ সিলভিয়া পারভিন লেনি | আপডেট: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০৬:২১ পিএম

নিমতলী থেকে চকবাজার, দুর্ঘটনা নাকি দায়িত্বহীনতা
নিমতলী থেকে চকবাজার, দুর্ঘটনা নাকি দায়িত্বহীনতা

এক দোকানের দুই কর্মচারী, তারা দুই ভাই। এক ভাইয়ের ৬ মাসের সন্তান, আরেক ভাইয়ের বউ ৬ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। দোকান বন্ধ করতে গিয়ে আগুনে পুড়ে নিহত দুজনই। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির চার বন্ধু পুরান ঢাকায় এসেছিল খেতে। তদের দুই জনই মারা গেল আগুনে পুড়ে। চারজন শিক্ষানবিশ ডাক্তার, মেডিকেল কলেজের ছাত্র, চারজনই নিহত। মাদ্রাসা শিক্ষক, সাথে পার্ট টাইম চাকরি করেন, আগুনে পুড়েননি তিনি। কিন্তু ভাগ্য ততোটা সহায় ছিল না তার। আতংকে বা অন্য কোন কারণে মারা মারা যান তিনি।

এক পরিবারের একজনই সন্তান, সেও চলে গেছে। আর ৪ বছরের শিশু জানিনা এ রকম আরো কতজনের কথা বের হয়ে আসবে। এতো ভয়াবহতা এর আগে নিমতলীতে হয়েছিল ২০১০ সালে। আগুনে পুড়ে মারা গিয়েছিল ১২৪টা তাজা প্রাণ।

২০১০ থেকে আজ ২০১৯, পুরান ঢাকার বয়সটাই শুধু বেড়েছে কিন্তু “সাবধানতা” শব্দটার ওজন বুঝতে পারেনি ঐ এলাকার মানুষ আর সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা। আজ তাদের অবহেলাতেই কত স্বপ্ন, কত অবলম্বনের মৃত্যু হলো।

আমরা কিছুদিন ফেসবুকে লিখবো। টিভি মিভিয়ায় কিছুদিন রিপোর্ট হবে। কিছু গুরুগম্ভীর সম্পাদকীয় ছাপা হবে খবরের কাগজে। কিছু চাপা কষ্ট, কিছু আহাজারি, কিছু কান্না তারপর... তারপর আমরা আবার সব ভুলে যাবো। আমরা নিমতলী ভুলে গিয়েছি, চকবাজারও ভুলে যাবো।

কিন্তু আমরা সচেতন হবো কি? অত্যন্ত দাহ্য রাসায়নিকের গোডাউন গুলো পুরান ঢাকা থেকে সরাতে কোন ব্যবস্থা নিব কি?

যে কোন দুর্ঘটনার পর আমরা সবচেয়ে দ্রুত যা পাই তা হলো তদন্ত কমিটি। আমাদের কর্তা ব্যক্তিরা সম্ভবত সব সময় প্রস্তুতই থাকেন কখন কোন তদন্ত কমিটিতে নাম চলে আসে তা দেখার জন্য। আর আশ্বাসের ফুলঝুড়িও প্রস্তুতই থাকে মিডিয়াতে বলার জন্য। কিন্তু কেন তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হয় না? কেন আশ্বাস শুধু ফাঁকা বুলি হয়েই থাকে? কাদের স্বার্থে লক্ষ লক্ষ মানুষকে ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরিতে রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছি আমরা? কাদের স্বার্থে?

আজ চকবাজার শোকবাজারে রুপ নিল। আমরাও শোক পালন করবো। যে কয়দিন আলোচনায় থাকবে চকবাজার, আমাদের শোকও টিকবে সে কয়দিন। তারপর প্রতিবছর ফুল দিব। শুধুই আনুষ্ঠানিকতার জন্য। কিছু এরপর আর কিছুই হবে না।

বার্ন ইউনিটে জায়গা নেই। ফায়ার সার্ভিস তাদের সর্বোচ্চটা দিয়ে কাজ করে গেছে। আজ বার্ন ইউনিট-ফায়ার সার্ভিস কোন কিছুরই প্রয়োজন হতো না আমরা যদি সচেতন হতাম। আমরা যদি একটু কম লোভী হতাম। আমরাই তো কয়েকটা টাকা বেশি ভাড়া পাবো বলে কয়েকশ প্রাণের সওদা করে ফেলছি ৫০০টাকার ষ্ট্যাম্প পেপারে। এই আমরাই তো ব্যাবসায়িক খরচ কমাতে বাড়িওয়ালাদের লোভ দেখাচ্ছি বেশী টাকার, আর একেকটা গোডাউন এর আড়ালে বানিয়ে রাখছি জীবন্ত টাইম বম্ব। আমরা নিজেরা সচেতন না হলে সরকার একা কখনই এই সমস্যার সমাধান করতে পারবে না।

বাতাসে পোড়া লাশের গন্ধ, বার্ন ইউনিটে দগ্ধ মানুষের আহাজারি। টিভিতে ভেসে বেড়াচ্ছে হাজারো প্রিয়জনের কান্না। নিমতলি আমাদের কিছু শিখায়নি, চকবাজারের শোকেরও একই পরিণতি না হোক।

লেখক: পরিচালক, রেডিও ঢোল

নিমতলী থেকে চকবাজার, দুর্ঘটনা নাকি দায়িত্বহীনতা

প্রতিবেদক নাম: সিলভিয়া পারভিন লেনি ,

প্রকাশের সময়ঃ ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০৬:২১ পিএম

এক দোকানের দুই কর্মচারী, তারা দুই ভাই। এক ভাইয়ের ৬ মাসের সন্তান, আরেক ভাইয়ের বউ ৬ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। দোকান বন্ধ করতে গিয়ে আগুনে পুড়ে নিহত দুজনই। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির চার বন্ধু পুরান ঢাকায় এসেছিল খেতে। তদের দুই জনই মারা গেল আগুনে পুড়ে। চারজন শিক্ষানবিশ ডাক্তার, মেডিকেল কলেজের ছাত্র, চারজনই নিহত। মাদ্রাসা শিক্ষক, সাথে পার্ট টাইম চাকরি করেন, আগুনে পুড়েননি তিনি। কিন্তু ভাগ্য ততোটা সহায় ছিল না তার। আতংকে বা অন্য কোন কারণে মারা মারা যান তিনি।

এক পরিবারের একজনই সন্তান, সেও চলে গেছে। আর ৪ বছরের শিশু জানিনা এ রকম আরো কতজনের কথা বের হয়ে আসবে। এতো ভয়াবহতা এর আগে নিমতলীতে হয়েছিল ২০১০ সালে। আগুনে পুড়ে মারা গিয়েছিল ১২৪টা তাজা প্রাণ।

২০১০ থেকে আজ ২০১৯, পুরান ঢাকার বয়সটাই শুধু বেড়েছে কিন্তু “সাবধানতা” শব্দটার ওজন বুঝতে পারেনি ঐ এলাকার মানুষ আর সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা। আজ তাদের অবহেলাতেই কত স্বপ্ন, কত অবলম্বনের মৃত্যু হলো।

আমরা কিছুদিন ফেসবুকে লিখবো। টিভি মিভিয়ায় কিছুদিন রিপোর্ট হবে। কিছু গুরুগম্ভীর সম্পাদকীয় ছাপা হবে খবরের কাগজে। কিছু চাপা কষ্ট, কিছু আহাজারি, কিছু কান্না তারপর... তারপর আমরা আবার সব ভুলে যাবো। আমরা নিমতলী ভুলে গিয়েছি, চকবাজারও ভুলে যাবো।

কিন্তু আমরা সচেতন হবো কি? অত্যন্ত দাহ্য রাসায়নিকের গোডাউন গুলো পুরান ঢাকা থেকে সরাতে কোন ব্যবস্থা নিব কি?

যে কোন দুর্ঘটনার পর আমরা সবচেয়ে দ্রুত যা পাই তা হলো তদন্ত কমিটি। আমাদের কর্তা ব্যক্তিরা সম্ভবত সব সময় প্রস্তুতই থাকেন কখন কোন তদন্ত কমিটিতে নাম চলে আসে তা দেখার জন্য। আর আশ্বাসের ফুলঝুড়িও প্রস্তুতই থাকে মিডিয়াতে বলার জন্য। কিন্তু কেন তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হয় না? কেন আশ্বাস শুধু ফাঁকা বুলি হয়েই থাকে? কাদের স্বার্থে লক্ষ লক্ষ মানুষকে ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরিতে রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছি আমরা? কাদের স্বার্থে?

আজ চকবাজার শোকবাজারে রুপ নিল। আমরাও শোক পালন করবো। যে কয়দিন আলোচনায় থাকবে চকবাজার, আমাদের শোকও টিকবে সে কয়দিন। তারপর প্রতিবছর ফুল দিব। শুধুই আনুষ্ঠানিকতার জন্য। কিছু এরপর আর কিছুই হবে না।

বার্ন ইউনিটে জায়গা নেই। ফায়ার সার্ভিস তাদের সর্বোচ্চটা দিয়ে কাজ করে গেছে। আজ বার্ন ইউনিট-ফায়ার সার্ভিস কোন কিছুরই প্রয়োজন হতো না আমরা যদি সচেতন হতাম। আমরা যদি একটু কম লোভী হতাম। আমরাই তো কয়েকটা টাকা বেশি ভাড়া পাবো বলে কয়েকশ প্রাণের সওদা করে ফেলছি ৫০০টাকার ষ্ট্যাম্প পেপারে। এই আমরাই তো ব্যাবসায়িক খরচ কমাতে বাড়িওয়ালাদের লোভ দেখাচ্ছি বেশী টাকার, আর একেকটা গোডাউন এর আড়ালে বানিয়ে রাখছি জীবন্ত টাইম বম্ব। আমরা নিজেরা সচেতন না হলে সরকার একা কখনই এই সমস্যার সমাধান করতে পারবে না।

বাতাসে পোড়া লাশের গন্ধ, বার্ন ইউনিটে দগ্ধ মানুষের আহাজারি। টিভিতে ভেসে বেড়াচ্ছে হাজারো প্রিয়জনের কান্না। নিমতলি আমাদের কিছু শিখায়নি, চকবাজারের শোকেরও একই পরিণতি না হোক।

লেখক: পরিচালক, রেডিও ঢোল